কোথায় গড়ে তুলবেন আপনার স্টার্ট আপ?

0

সুলভ কাঁচামাল, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আর দক্ষ শ্রমিক। সেই দক্ষ শ্রমিক যদি সস্তায় মেলে তা হলে তো কথাই নেই। বড় কারখানা গড়তে এতদিন এগুলোই ছিল শিল্পপতিদের অগ্রাধিকারের তালিকায়। অষ্টাদশ-উনবিংশ-বিংশ শতককে পিছনে ফেলে বিশ্বায়নের ঘোড়া এখন দৌড়চ্ছে একবিংশ শতকে। প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে এখন বিশ্বের সব প্রান্তেই শাখাপ্রশাখা মেলে দিয়েছে শিল্প। কোথাও কোথাও গড়ে উঠেছে হাব। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের প্রাণকেন্দ্র বলতে সারা বিশ্ব এক ডাকে সিলিকন ভ্যালিকেই জানে। এখন আপনি যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক কোনও শুরুয়াতি সংস্থা (স্টার্টআপ) গড়ে তুলতে চান, আপনার উচিত হবে তা স্যান্ড হিল রোডের ওপর গড়ে তোলা। এখানেই কেন? কোনও ব্যবসায়িক সমস্যা দেখা দিলে তার সমাধান খুঁজতে আপনার সহ-প্রতিষ্ঠাতাকে যে এখানেই পাবেন।

সিলিকন ভ্যালির এটাই মজা। আইডিয়া অসাধারণ হলে ফান্ডিং করতে মুখিয়ে রয়েছে গুচ্ছ-গুচ্ছ সংস্থা। একই ক্ষেত্রে কাজ করছে হাজার-হাজার স্টার্টআপ। ফান্ডিং থেকে উন্নত পরিকাঠামো। সহজ কথায় স্টার্টআপের জন্য একটা দুর্দান্ত ইকোসিস্টেম। সহজ বোধ্য কারণে যাঁরা প্রথমবার কোনও উদ্যোগে নামতে চলেছেন তাঁদের কাছে সিলিকন ভ্যালির আকর্ষণই আলাদা। কিন্তু কিছুটা সময়ের পরে ছবিটা যদি একটু বেরং হতে শুরু করে? এমন কিছু খরচ এসে পড়ে যা অনেকের মাথাতেই থাকে না। ফলে উজ্জ্বল রং ফিঁকে হয়ে পড়ে। তখন অধিকাংশ তরুণ উদ্যোগপতিই ভাবেন, কাজের জায়গা হিসাবে এর থেকেও ভালো বিকল্প ছিল। সার্চলাইটে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ায় তাঁরা সে দিকে নজর দিতে ভুলে গিয়েছেন। কথাটা কিন্তু ভুল নয়।

সিলিকন ভ্যালি বাস্তবিকই ব্যয়বহুল। ফান্ডিং সহজে মিললেও আপনার ইকুইটির ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ছাড়তে হতে পারে। এ ছাড়া থাকা, খাওয়া, জীবনযাপন সবকিছুর জন্যই চড়া দাম দিতে হয়। আর ব্যবসায়িক পরিবেশের কথা বলতে গেলে ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতামূলক। সিলিকন ভ্যালিতে ব্যবসা করা মানে সেরাদের সঙ্গে টক্কর। বুঝতেই পারছেন টিকে থাকার একটাই মন্ত্র হতে পারে। তা হল সেরাদেরকেও পিছনে ফেলা। এখন কথা হল, সেটা আপনি কত তাড়াতাড়ি করতে পারবেন। কারণ সেখানেও তো প্রতিযোগিতা। আপনার মতোই দৌড়চ্ছে অন্যসব স্টার্টআপ। তাদেরও যে টিকে থাকার লড়াই। আর পুঁজি ফুরিয়ে গেলে? আপনার খেল খতম।

সিলিকন ভ্যালিতে খেল খতম মানেই কি সব শেষ? একদমই নয়। আপনাকে বিকল্পের কথা ভাবতে হবে। কী হতে পারে সেই বিকল্প? নিরাশ হবেন না। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরে নয়, বাইরেও এমন কয়েকটি জায়গা রয়েছে যেখানে আপনি স্বাগত। আপনার উদ্যোগ পুঁজির অর্ধেকটা খরচ না করেই যেখানে আপনি মূল দৌড়ে নামতে পারবেন। নিচে এমনই পাঁচটা বিকল্প আপনার জন্য।

1. সান্তিয়াগো, চিলি

আধুনিক একটা শহর। ব্যবসায়িক উদ্যোগের জন্য সহজেই মেলে রেসিডেন্স ভিসা। যে ভিসার নাম স্টার্ট-আপ চিলি। স্টার্স্ট-আপ চিলির ডিরেক্টর সেবাস্তিয়ান ভিদালের কথায়, ভিনদেশি উদ্যোগীরা ইকুইটি-ফ্রি গ্র্যান্টস হিসাবে পেয়ে থাকেন ৪০ হাজার ডলার। সান্তিয়াগোর বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলের মূল কথাই হল পারস্পরিক বিশ্বাস। অর্থাৎ স্বচ্ছতা। লাতিন আমেরিকার বাকি দেশের তুলনায় বাণিজ্যিক চুক্তিতে সেই স্বচ্ছতারই প্রতিফলন মেলে।

2. বোল্ডার, কলোরাডো

গুগল ও মাইক্রোসফ্‌টের মতো বেশ কয়েকটি আইটি জায়েন্ট বোল্ডারে স্টার্টআপ বেস গড়ে তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই শহরের পরিকাঠামো ও কাজের পরিবেশ দেখার মতো। রয়েছে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে শুরুয়াতি সংস্থাগুলি সহজেই সেখান থেকে প্রতিভাশালী যোগ্য কর্মী তুলে আনতে পারবে।

3. দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী

স্টার্টআপ শহরগুলির মধ্যে দ্রুত এগিয়ে চলা অন্যতম শহর দুবাই। মধ্য প্রাচ্য তথা উত্তর-আফ্রিকা রিজিয়নে গুগলের প্রথম আইটি হাব গড়ে উঠেছে এই শহরেই। বিশেষ করে মহিলা উদ্যোগপতিদের জন্য এই শহর আদর্শ বলা যায়। তথ্যপ্রযুক্তিতে মহিলা আন্ত্রেপ্রেনারের সংখ্যা এখানে প্রথম সারিতে। বিশ্বের গড় যেখানে ১০%, এই শহরে তা ৩৫%। সংস্থা এবং ব্যক্তিগত করের হার বেশ কম হওয়ার কারণে স্টার্টআপের জন্য এই শহর লোভনীয়।

4. ওমাহা, নেব্রাস্কা

এখানে রয়েছে Fortune 500-এর তালিকাভুক্ত বহু কোম্পানি। জীবনযাপনের খরচখরচা অপেক্ষাকৃত বেশ কম। এ সব মিলিয়েই নামডাক রয়েছে ওমাহার। সেই সুনাম এতটাই যে CNN Money এর নাম দিয়েছে 'সিলিকন প্রেইরি' (Silicon Prairie)। ছোট ব্যবসা শুরু করার জন্য এই শহরকে ভাবা যেতেই পারে। সঙ্গে মিলবে নেব্রাস্কা অ্যাডভান্টেজ ট্যাক্স ইনসেনটিভ। মেন্টরদের সহায়তাও সহজে মেলে। কে বলতে পারে আপনার মেন্টর হিসাবে পেয়ে গেলেন ওয়ারেন বাফেটকে!

5. বেঙ্গালুরু, ভারত

বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনসংখ্যা। একশো পঁচিশ কোটির মতো বাসিন্দা। মধ্যবিত্তের একটি বিশাল বাজার। এটাই আজ ও আগামীর ভারত। আগামী দশকগুলিতে যে বাজার তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির কাছে বিরাট সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। রয়েছে মেধা সম্পদ। তাও মেলে কম খরচে। এ ছাড়াও রয়েছে Sequoia কিংবা Accel-এর মতো আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টের আঞ্চলিক দফতর। এ সব কারণেই স্টার্টআপের জন্য যোগ্য বিকল্প হতেই পারে বেঙ্গালুরু।

সিলিকন ভ্যালির তুলনায় এইসব ডেস্টিনেশন আপনাকে আরও অনেক কিছু দেবে। আগামী পাঁচ বছর এখানে আপনি ধীরে-ধীরে আপনার ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। সহকর্মীদের নিয়ে গড়ে তুলতে পারবেন ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক। যে সুযোগ হয়তো আপনি কলেজে পাননি।

লেখা - রাজ দুলাল মুখোপাধ্যায়