কলকাতার পার্কে রাতেও সূর্যের আলো

0

কবি বলেছিলেন কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে। আর বর্তমান রাজ্য সরকার চায় কলকাতাকে লন্ডন বানাতে। এ সবের আগেই দেশের প্রথম শহর হিসাবে কলকাতার পার্কগুলি স্বয়ংক্রিয় কার্বনহীন সৌর আলোয় ভাসতে চলেছে। বাতাসে কমবে কার্বনের মাত্রা, সাশ্রয় হবে ইলেকট্রিক বিলেও। সম্প্রতি পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে প্রথম এই সৌর আলো বসানো হয়েছে দেশপ্রিয় পার্কে।পরবর্তী সময়ে কলকাতা পুরসভার আওতায় থাকা আরও ২৮টি পার্কে এই সৌর আলো লাগানো হবে।


এই প্রযুক্তি যিনি বানিয়েছেন সেই শক্তিপদ গণ চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরেই renewable energy নিয়ে কাজ করছেন। সৌর বিদ্যুতের প্রসার ও প্রচারে আত্মনিমগ্ন শক্তিপদবাবু বললেন," এই সোলার লাইটিং সিস্টেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এটি ব্যাটারিবিহীন এবং পাওয়ার গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত। এতে রয়েছে একটি অটোমেটিক কন্ট্রোল সিস্টেম। যার সাহায্যে বিকেল হলে নিজে থেকেই পার্কে আলো জ্বলে উঠবে, আবার ভোর হওয়ার সঙ্গেই আলো নিভে যাবে। আবার মাঝরাতে যখন আলোর ততটা প্রয়োজন থাকবে না, তখন আলোর তেজ নিজে থেকেই কমে যাবে"। কলকাতা পুরসভার উদ্যান বিভাগের মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার এ প্রসঙ্গে জানালেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া টাকাতেই প্রকল্পের কাজে হাতে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ এক বছরের মধ্যে শেষ হবে বলেও আশাপ্রকাশ করেছেন দেবাশিসবাবু।


কীভাবে কাজ করবে এই carbon-neutrality manager (এমনই নাম দিয়েছেন শক্তিপদবাবু)? কেন ব্যাটারি লাগবে না? বিষয়টি ব্যাখ্যা করে শক্তিপদবাবু জানালেন, একটি মাইক্রো-ইনভার্টারের সাহায্যে দিনের বেলায় সূর্যালোককে মেন ইলেকট্রিসিটি গ্রিডে ধরা হবে। ফলে কোনও ব্যাটারি লাগবে না। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে যে পরিমাণ সৌর বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে তা একটি ইলেকট্রিক মিটারে রেকর্ড হবে। এটা কার্বন-নিউট্রাল এই কারণেই যে ঠিক ততটাই বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে যতটা সৌরশক্তির ব্যবহার হবে"। শক্তিপদবাবুর দাবি, বিশ্বে এর আগে কেউ এমন carbon-neutrality manager উদ্ভাবন করতে পারেনি।

পাইলট প্রজেক্ট হিসাবে পার্ক আলোকিত করার কাজ শুরু হয়েছে দেশপ্রিয় পার্ক দিয়ে। সেখানে বসানো হয়েছে ৫০টি সোলার ইলেকট্রিক পোস্ট। প্রত্যেক পোস্টে রয়েছে ১৮০ ওয়াট সোলার প্যানেলযুক্ত এলইডি বাল্ব। সাফল্যের কথা জানাতে গিয়ে শক্তিপদবাবু বললেন,"আগে প্রতি মাসে এই পার্কে যেখানে ১৭ হাজার টাকার বিল আসত, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ হাজার টাকা। অর্থাৎ সঞ্চয় প্রায় ৯০ শতাংশ"। এই প্রযুক্তির সাহায্যে পার্কগুলিকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্বন-নিউট্রাল করা সম্ভব বলেই জানাচ্ছেন তিনি। এই প্রকল্পের আওতায় পরবর্তীকালে কলকাতার যে সব পার্কে সৌর আলো বসবে তার মধ্যে রয়েছে মহম্মদ আলি পার্ক, কলেজ স্কোয়ার, ম্যাডক্স স্কোয়ার ও সুভাষ সরোবর পার্ক। এই সব জায়গায় প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হলে ইলেকট্রিক বিলে লক্ষ-লক্ষ টাকার সাশ্রয় হবে বলে মনে করছেন দেবাশিসবাবুও। জওহরলাল নেহরু ন্যাশনাল সোলার মিশন (JNNSM)-এ একই ধরনের কাজকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ভারতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট। ২০২২ সালের মধ্যে তা বাড়িয়ে এক লক্ষ মেগাওয়াট করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে।

তবে ভারতে ব্যাটারি চালিত সোলার লাইটিংয়ের যে মডেল চালু রয়েছে তার কিছু অসুবিধা রয়েছে। ব্যাটারির ক্যাপাসিটি বা ধারণ ক্ষমতা একটা বড় ব্যাপার। এখন যে ধরনের ব্যাটারি ব্যবহৃত হয় তার ধারণ ক্ষমতা ৭৫ ওয়াট। যা পর্যাপ্ত নয়। শক্তিপদবাবুর দাবি তিনি যে ব্যাটারিহীন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন তাতে ৩০০ ওয়াট প্রডিউস করা যায়। ব্যাটারির ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় হচ্ছে এর মেইনটিন্যান্সের খরচ। ব্যাটারি না থাকলে সেই খরচও নেই।

সূর্যের আরেক নাম অর্ক। শক্তিপদবাবু যে সংস্থা চালান তার নামও তাই Arka Ignou Community College of Renewable Energy. শুধু পার্ক নয়, স্ট্রিট লাইটিংয়েও একই পদ্ধতিতে বদলে আনতে চান তিনি। এ জন্য বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলির সঙ্গে কথা চালাচ্ছেন তিনি। আপাতত তাঁর লক্ষ্য অন্তত তিন হাজার স্ট্রিট লাইটকে সোলার লাইটিংয়ের আওতায় আনা। দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাড়াও মিলতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে বিষয়টিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন।