মদ্যপানে ছুৎমার্গ কেন ?

0

এক চার্চ ভর্তি সন্তের চেয়ে এক পিপে মদ বিলকুল কামাল!-এক ইতালীয় পুরনো প্রবাদ। মদ ঘিরে এমনই কতশত পৌরাণিক কথা প্রচলিত। তাদেরই একটা হল, মদ্যপান বন্ধ করা হোক।

১৯৯০ সাল। সবে সাংবাদিকতা শুরু করেছি। রিপোর্টার হিসেবে শ্রীনগর গিয়েছিলাম। সন্ত্রাসবাদ তখনই মাথা চাড়া দিয়ে দিয়েছে। অশান্তির আঁচে কাশ্মীর যেন ফুটছিল। যাইহোক, ডাল লেকে পৌঁছে সেনচুর হোটেলে ঢুকে পড়ি। ওই অত ভোরে হোটেলে ঢুকে দেখি রিসেপশন ম্যানেজার কাঁপছেন, এইবুঝি দাঁতকপাটি লাগে। অন্যদের জিজ্ঞাসা করে জানতে চাই কী হয়েছে? যারা ওখানে ছিলেন বললেন, একটু আগে পর্যটকের বেশে এক জঙ্গি ঢুকে এক বোতল মদ চেয়ে বারবার বিরক্ত করছিল। যখন বুঝতে পারল মদ পাওয়া যাবে না, তখন পিস্তল বের করে ম্যানেজারের আংরাখায় ঢুকিয়ে মজা করে বলল, ‘বেঁচে গেলে। যদি একটা বোতলও বের হতো, এতক্ষণে প্রাণ পাখি উড়ে যেত তোমার’।

আর দাঁড়ানো নিরাপদ মনে হয়নি। আমি এক ঝটকায় সেই হোটেল থেকে বেরিয়ে আরেকটু বড় হোটেলে যাই। তখন বয়েসটাও কম। মনে মনে ভাবছিলাম কোনও ক্রস ফায়ারের মধ্যে পড়ে না আমারই ইহকালের যবনিকাপাত হয়। অন্য হোটেলটা শহরের একেবারে কেন্দ্রে, কিন্তু আরও বেশি রক্ষণশীল। কাজ শেষ করে যখন অন্ধকার নামল, আমি আমার ঘরে ফিরি। হঠাৎ দরজায় টোকার আওয়াজ। দেখি রিসেপশনের ছেলেটা দাঁড়িয়ে। জানতে চাইল কোনও বোতল লাগবে কি না। আমি তো ভয়ে কাঠ। ভাবলাম আমাকে প্রলোভন দেখানোর ফাঁদ হবে নিশ্চয়ই। সঙ্গে সঙ্গে না বলে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিই। কিছুক্ষণ পর আবারও টোকা। একজন বরিষ্ঠ সাংবাদিকও ছিলেন ওখানে। সঙ্গ পাবেন এমন কাউকে খুঁজছিলেন। ভেতরে ঢোকাতেই জানতে চাইলেন, ‘মদ খাও’? আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই কাউকে ডেকে পাঠালেন। আমাদের ঘরে একটা বোতল চল এল। অমঙ্গলের আশঙ্কায় আমি ভয় পাচ্ছিলাম। বৃদ্ধ সাংবাদিক অভয় দিয়ে বললেন, ‘ভয় পেও না। সন্ত্রাসবাদীরা শুধু কাশ্মিরীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু সব জায়গায় মদ পাওয়া যায়। কেউ তোমাকে ছুঁতেও পারবে না’।

এরপর যতবারই কাশ্মীর গিয়েছি, বোতল পেতে কোনও সমস্যাই হয়নি। সব ব্র্যান্ডই পাওয়া যায়। কাজের সূত্রে গুজরাতেও যাই। এই রাজ্যে মদ নিষিদ্ধ। যে কাউকে জিজ্ঞেস করুন বলে দেবে, কত ভালো ভালো ব্র্যান্ডের মদ পাওয়া যায় এখানে, কত লক্ষ মানুষের সমান্তরাল ব্যবসা চলছে তাকে ঘিরে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমেরিকা সফর থেকে সবে ফিরেছেন। দিল্লিতে একটা বিতর্ক, ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে, মদ্যপানের বয়স কি ২৫ থেকে ১৮-য় নামিয়ে আনা উচিত? এটা জেনে অবাক হয়ে যাই যে, যারা ভোট দেন এবং যাদের ব্যালটের মাধ্যমে দেশের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার দেওয়া হয় তাদের এক দু পাত্তর মদিরা চড়ানোর অধিকার নেই! এটা আমার কাছে সত্যিই একটা খবরের মতো যে, ২৫ বছরের আগে মদ্যপান বারণ।

ছোটবেলায় এমন পরিবেশে বড় হয়েছি যেখানে মদ খাওয়া বিরাট অপরাধ। আমার বাবা কালেভদ্রে মদ্যপান করতেন। অনেকে জানতই না বা বাবাও চাইতেন না কেউ জানুক। বছরে এক কি দুবার মদ খেতেন। যখন জওহরলাল ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসি আমি এক অন্য পরিস্থিতির সম্মুখীন হই। এখানে মদ নিয়ে ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই। মদ্যপান এখানে মোটেই পাপ নয়। এমনকি এও দেখেছি,দারুণ দারুণ মেধাবীরা, সভ্য পড়ুয়ারা অথবা অধ্যাপকরাও খুল্লামখুল্লা মদ্যপানে অভ্যস্ত। মেয়েদের মধ্যেই এত ‘ভালো’ একটা জিনিস নিয়ে কোনও লুকোছাপা নেই। ছোট ছোট অছিলায় মদ্যপান নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আমারও বেশ লোভ লাগত। কিন্তু তথাকথিত ভালো ছেলে ছিলাম। পুরনো বাঁধা ছক আর রক্ষণশীল বেড়ে ওঠার পরিবেশের আড়মোড়া ভাঙেনি তখনও। বুঝতে পারছিলাম, এতে কোনও অপরাধ নেই। আমার দুই পৃথিবীর মধ্যে সংঘাতের একটা সহজ সমাধান বের করে এনেছিলাম। ঠিক করে নিয়েছিলাম,বাবার টাকায় কোনও দিন মদ খাব না। যে দিন নিজের উপার্জনের ৩০০ টাকার চেক পেলাম সেদিন এক বন্ধুর সঙ্গে মদের স্বাদ নিই। আগল ভেঙে গিয়েছিল, কিন্তু কানে কোনও সুর বাজছিল না।বুঝতে পারছিলাম না কেন বিখ্যাত মার্কিন ঔপন্যাসিক রেমন্ড চ্যান্ডলার বলতেন, ‘মদ ভালোবাসার মতো। প্রথম চুম্বনে যাদু, দ্বিতীয় চুম্বনে ঘনিষ্ঠতা, তৃতীয়টি অভ্যেস এবং তারপর তাকে (মেয়েটিকে) নগ্ন করার রাস্তা খোলা’।

মদের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেকটা অভ্যেসের মতো ছিল। খুব ভালো ঘুম হল। পরদিন ঘুম থেকে যখন উঠি বেশ ঝড়ঝড়ে লাগছিল। এতটুকু লজ্জা লাগছিল না। আর বুঝতে পারছিলাম না ধর্মে কেন মদ্যপানকে পাপ বলা হচ্ছে। মনে রাশি রাশি প্রশ্ন জমা হচ্ছিল, কেন মদ্যপানের নামে সমাজে এত ছিঃ ছিক্কার? কেন সমাজ অথবা ব্যক্তিত্বের মধ্যে নীতির রেখা টেনে দেওয়া হয়? 

কয়েক ফোঁটার বিস্বাদ তরল কিছু মুহূর্তের জন্য এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। একটা পুরনো কাহাবত মনে পড়ে যায়- মুল্লা শরাব পিনে দে মসজিদ মে বৈঠকার, ইয়া বো জাগা বাতা জাহা খুদা নেহি হ্যায় (মোল্লা মসজিদে বসে আমায় মদ খেতে দাও, নয়তো এমন জায়গা দেখাও যেখানে খোদা নেই)।

কোনও লজ্জা, দ্বিধা না রেখে আমি এখন আমার পরিবারের সঙ্গে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে নিয়মিত পান করি। যখন টেলিভিশন চ্যনেলগুলিতে দেখি মদ খাওয়ার জন্য বয়সের সীমা ১৮তে নামিয়ে আনা যায় কিনা তা নিয়ে সরকার আলোচনার আহ্বান জানাচ্ছে তখন মনে হয়, এতে সমাজে আরও অপরাধ বাড়বে। সমাজের সেই যাজকদের প্রতি আমার করুণা হয়, যারা ন্যায় নীতির কথা বলেন। দিল্লিতে তরুণ তরুনীদের মদ্যপানের জন্য কোনও আইনের দরকার পড়ে না। নতুন প্রজন্ম এমনিতেই অনেক এগিয়ে। তারা বেশ বুদ্ধিমান এবং আত্মবিশ্বাসী। তারা পান করতে ভালোবাসে এবং তাতে কোনও বাধাও নেই। দিল্লিতে যদি সিলিকন ভ্যালি থাকত, তবে যারা অ্যাপল বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তাঁরা আজ জেলে পঁচতেন এবং সারা বিশ্ব এতবড় প্রযুক্তির বিপ্লব থেকে বঞ্চিত হত। কারণ যারা এই বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তাঁদের মদের সঙ্গে কোনও না কোনও সম্পর্ক রয়েছে।

বন্ধু, সবটাই তোমার নিজের নিয়ন্ত্রণের ওপর। নিয়ন্ত্রণ হারালেই সমস্যা। সমাজের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। ডাক্তারের পরামর্শ মতো নিলে মদ একরকম ওষুধই বটে। কিন্তু তখনই মদ নরক এবং পাপ হয়ে ওঠে যখন সে তোমাকে খেয়ে নিতে শুরু করে। মদের নেশায় পঞ্জাবে একটা পুরও প্রজন্ম নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সিলিকন ভ্যালিতে ঘটে গিয়েছিল আস্ত বিপ্লব। এবার কী করণীয়, তোমার মর্জি।

(লেখক প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং এএপি নেতা আশুতোষ। লেখকের নিজস্ব মতামত।)