আমসত্বে মর্যাদার স্বাদ পেলেন মালদহের মহিলারা

0

হাতের কাছেই ছিল এগিয়ে যাওয়ার সিঁড়ি। ছিল স্বপ্ন ছোঁয়ার সোপান। উত্তরণের পথ খুঁজে নিতে দেরি করেননি যোগমায়া দাস, কৃষ্ণা বিশ্বাস, ফারহানা রহমানরা। মালদহের এইসব গৃহবধূরা মিলে তৈরি করেছিলেন স্বনির্ভর গোষ্ঠী। পাশে পেয়েছিলেন প্রশাসনকে। আম থেকে নানা সামগ্রী বিক্রি করে এঁরা নিজের পাড়়ে দাঁড়িয়ে দারিদ্র নামের অসম্মানকে হেলায় হারিয়েছেন। তাদের হাত ধরে রাজ্যের নানা প্রদর্শনীতে পৌঁছে যাচ্ছে মালদার নিজস্ব স্বাদ।

রাজ্যের আম বিলাসের ঠিকানা মালদহ। সেখানে মে মাস থেকে আমসত্ব তৈরির ধুম পড়ে। জেলার কোতুয়ালি, আড়াপুর জোত, টিপাজানি, কাজিগ্রাম, রায়গ্রাম, ঢাকুনার ঘ‌রে ঘরে আমসত্ব তৈরির ধূম লেগে যায়। আর কমবেশি জেলার বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হয় মালদহের নিজস্ব এই পদ। গোপালভোগ আম পাকার সময় সবথেকে বেশি তাড়াহুড়ো থাকে। কারণ বাজারে এর আমসত্বের চাহিদা তুঙ্গে। গোপালভোগের পর হাত দেওয়া হয় হিমসাগর এবং সবশেষে ফজলি আমে। হাতের কাছে কাজের খনি থাকলে পরিশ্রমীরা কেন ঘরে বসে থাকবেন।

কোতুয়ালি এলাকায় বছর দশেক আগে স্থানীয় মহিলারা স্বাবলম্বী হতে তৈরি করেন ‘আনন্দময়ী মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী’। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে কোতুয়ালির আনাচে-কানাচে। 

ধীরে ধীরে এলাকায় অনেকগুলি স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি হয়। এসবের পিছনে অন্যতম ভূমিকা ছিল কোতুয়ালির কল্যাণপুরের বাসিন্দা যোগমায়া দাসের। যোগমায়াদেবীর কাছে প্রতিবেশী মহিলারা তাদের সাংসারিক অসুবিধার কথা শোনাতেন। যোগমায়াদেবীর বুঝতে অসুবিধা হয়নি যাবতীয় অশান্তির মূলে আর্থিক অনটন। মেয়েরা আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হলে সমস্যা যে অনেকটাই কমে যাবে। কথাটা পড়ে ফেলেন তিনি। সেজন্য গোষ্ঠীর মেয়েদের নিয়ে পূর্ণ উদ্যমে নেমে পড়েন। সময়টা ছিল ২০০৫ সাল। এই দশ বছরে আমসত্বের গণ্ডীতে আটকে থাকা নয়, আমসি, আমের আঁচার, পাঁপড়, বিভিন্ন ধরনের ডাল তৈরি করেন এরা। তাঁদের সারা বছর কাজ।

বেশ যত্ন নিয়ে তৈরি করতে হয় আমসত্ব। পাকা নয়, বাগান থেকে আগে কাঁচা আম কিনতে হয়। সেই আম বাড়িতে রেখে পাকাতে হয়। এরপর নেটের ওপর আম ঘষে রস বার করতে হয়। বাঁশের তৈরি ডালায় বসাতে হয় পরিষ্কার কাপড়। সেই কাপড়ের ওপর প্রথমে হালকা করে আমের আস্তরণ দিতে হয়। দিনে কয়েক বার এই আমের রসের প্রলেপ দিতে হয়। সেই প্রলেপ কয়েক দিন ধরে দেওয়ার পর তৈরি হয় আমসত্ব। এরজন্য প্রয়োজন হয় চড়া রোদের। কিন্তু সেই সময় আবহাওয়া বিরূপ হলে যোগমায়াদেবীরা বেজায় সমস্যায় পড়েন। কারণ ফ্যান চালিয়ে শুকোলে আমসত্ব রসিয়ে যেতে পারে। এতসব ঝক্কি সামলে তৈরি হয় আমসত্ব। ওই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর তৈরি গোপালভোগের আমসত্ব ১২০০ টাকা, হিমসাগর ৭০০-৮০০ এবং ফজলির ৪০০ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি হয়। এক মণ আম দিয়ে প্রায় আড়াই কেজি আমসত্ব হলে এমন দাম তো পড়বেই। এখানকার আমসত্ব এতটাই খাঁটি যে দুধ দিলে গলে যাবে। তেতো হবে না। রং-ও উজ্জ্বল থাকবে। এক বছর পর্যন্ত স্বাদে একদম ঠিক থাকবে আমসত্বের।

‘সরস’ মেলা থেকে ‘আহারে বাংলা’ বা বিশ্ব বাংলা কাউন্টার। যেখানেই ‘আনন্দময়ী মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী’-র আমসত্ব পৌঁছেছে, সেখানেই দারুণ সাড়া মিলেছে। এমনই জানাচ্ছেন গোষ্ঠীর সম্পাদক যোগমায়া দাস। তাঁর কথায়, ‘আহারে বাংলা’-য় তিন দিনে প্রায় ৭০ হাজার টাকার বিক্রি হয়। আমসত্ব ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেকেই খোঁজ নিয়ে খালি হাতে ফিরে গিয়েছেন। আর সেটা যাতে না হয় তার জন্য আমরা কলকাতা ও অন্যান্য শহরগুলিতে আরও বেশি সামগ্রী নিয়ে যাব।’ শুরুর দিকে হাতে গোনা কয়েকজন থাকলেও এখন এই গোষ্ঠীর সদস্যা প্রায় ১২০০। আমসত্বর মরসুম শেষ হলে আমসি, কাসুন্দি, আঁচারের পাশাপাশি বড়ি, নানারকম ডাল, পাঁপড় তৈরি করেন তাঁরা। যাদের থেকে শুরুর দিকে উৎসাহ মিলেছিল সেই ডিআরডিসি দফতরের পাশাপাশি হর্টিকালচার এবং খাদি দফতর থেকেও এই গোষ্ঠী নানা ধরনের কাজের ডাক পাচ্ছে।

হেঁশেল সামলে অচেনা পথে যখন এই মহিলারা নেমেছিলেন তখন পরিবার থেকেও অনেক কথা শুনতে হয়েছিল। আর এখন। মেলা, প্রদর্শনীর জন্য রাজ্যজুড়ে চরকির মতো কাটেন যোগমায়াদেবীরা। সংসার ফেলে বেরিয়ে পড়লেও আর চিন্তা নেই। বাড়ির লোকজনই সব সেরে ফেলেন। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সুব্রতা দাস, রিনা বেগমরা আয়ের নতুন পথে পেয়ে বেজায় খুশি। সংসারে যেমন তাঁরা অবদান রাখতে পারছেন, তেমন ছেলেমেয়েদেরও লেখাপড়া শেখাতে পারছেন। ওরা বুঝতে পেরেছেন স্বনির্ভরতাই জীবনের পথ।

Related Stories