তৃতীয় লিঙ্গ থেকে অ্যালবিনো-প্রান্তিক মানুষদের পাশে জীবন ট্রাস্ট

0

সুরক্ষিত হয়েছ আইনি অধিকার, শিক্ষায় - চাকরিতে মিলেছে সংরক্ষণ, গঠন হচ্ছে ওয়েলফেয়ার বোর্ড, তবুও সমাজে আজও ব্রাত্য রূপান্তরকামী মানুষেরা। রাস্তাঘাটে, ট্রেনে-বাসে, ঘরের ভিতরে ও বাইরে রয়েছে শুধুই উপেক্ষা, পরিহাস আর লাঞ্ছনা। শুধুমাত্র লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে সমাজের মূলস্রোত থেকে এখনও বহুযোজন দূরে তাঁরা।

এই রূপান্তরকামী মানুষদের প্রতিভা প্রদর্শনের একটি ছোট্ট উদ্যোগ সঙস অফ আ ক্যারাভান। ভারতের ৯ টি প্রদেশের, ৯ জন তৃতীয় লিঙ্গের ৯ টি ভাষায় গাওয়া ৫ টি ঘরানার ১৩ টি গান থাকছে সঙস অফ আ ক্যারাভানে। উদ্যোগ অনুভব গুপ্তা ও তাঁর সংস্থা জীবন ট্রাস্টের। সম্পূর্ণ প্রকল্পটিতে কাজ করেছেন ৬ জন সঙ্গীতকার, এবং কাজ শেষ হতে সময় লেগেছে ১৭ মাস ও অ্যালবাম রিলিজের টাকা জোগাড় করতে ২৪ মাস। প্রকল্পটিতে টাকা দিয়েছে ইউএনডিপি,ইন্ডিয়া ও প্ল্যানেট রোমিও ফাউন্ডেশন, নেদারল্যান্ডস।

“বাড়িতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হিজড়ারা গাইতে আসতেন। গানগুলি কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মের কাছে যায় সেটা ভেবে অবাক হতাম, ভাবতাম অন্তত কিছু গান যদি রেকর্ড করে সংরক্ষণ করে রাখা যায়। ওই দলের অনেকেরই অসাধারণ গানের গলা, এবং গানকেই নিজেদের পেশা করতে চান। সেখান থেকেই জন্ম এই অ্যালবামের,” বললেন অনুভব।

সঙস অফ আ ক্যারাভান রূপান্তরকামীদের গাওয়া ভারতের সর্বপ্রথম অ্যালবাম। সমাজে একটা সাধারণ ধারণা রয়েছে, রূপান্তরকামীরা ভাল গাইতে পারেন না, বা বলিউডে যেমন দেখানো হয় সেরকম একটি নির্দিষ্ট ঢঙেই কেবল গাইতে পারেন, এই ধারণা ভাঙ্গাও অন্যতম উদ্দেশ্য অনুভবের। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬ জনের সঙ্গীতে ডিগ্রি রয়েছে।

৪০ বছরের অঙ্কুরা (ভরত) পাতিল, ভাদোদরার বাসিন্দা, মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিন্দুস্তানি রাগ সঙ্গীতে ডিপ্লোমা করেছেন অঙ্কুরা। রূপান্তরকামী অঙ্কুরা এই অ্যালবামের অন্যতম গায়িকা। “ভারতে প্রথমবার এরকম কোনও উদ্যোগ নেওয়া হল, আমরাও আরও পাঁচজনের মতই মানুষ, সঙ্গীতের কোনও লিঙ্গ হয় না। এই প্রথমবার আমার দক্ষতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস পেলাম আমি,” বললেন অঙ্কুরা।

জীবন ট্রাস্টের শুরু

গণমাধ্যমে উল্লেখযোগ্য কেরিয়ার ছিল ৩২ বছরের অনুভব গুপ্তার। গণমাধ্যম ছেড়ে সামাজিক উন্নয়ন ক্ষেত্রে কাজ করতে আসেন অনুভব। যোগ দেন পিভিআর সিনেমার কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি বিভাগ পিভিআর নেস্ট-এ। প্রাকৃতিক বিষয় ছাত্রছাত্রীদের সচেতন প্রকল্পের দায়িত্ব ছিল তাঁর। এছাড়াও কাজ করেন এইচআইভি আক্রান্ত রোগীদের অধিকার রক্ষায়।


দুটি অভিজ্ঞতাই সমৃদ্ধ করে অনুভবকে। গণমাধ্যম ও সামাজিক ক্ষেত্র এই দুই অভিজ্ঞতাকে মেলাতেই ২০১০ সালে জীবন ট্রাস্ট শুরু করেন তিনি। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া ও সামাজিক ইস্যুগুলির মধ্যেকার দূরত্ব মেটাতেই শুরু জীবন ট্রাস্ট ও তার জন্য একটি ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। লক্ষ্য, বিষয়টিকে শুধু সম্যক কভার করাই নয়, সে বিষয় সচেতনতা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ সংগ্রহ করে তাকে মূলস্রোতে নিয়ে আসা।

জীবন ট্রাস্টের দ্বিতীয় প্রকল্প সঙস্ অফ ক্যারাভান, এর আগে অ্যালবিনিসম নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করেছে জীবন ট্রাস্ট।

অ্যালবিনিসম ও শ্বেতী এক নয়

“ভারতে অ্যালবিনিসম সম্পর্কে জানা বোঝা খুবই কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শ্বেতীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয় একে। অ্যালবিনিসম একটি জিন ঘটিত রোগ, যাতে চোখ ও শরীরের পিগমেন্ট হারায়। অ্যালবিনোদের দৃষ্টি শক্তিও হয় ক্ষীণ। চাকরির ক্ষেত্র থেকে শুরু করে সর্বত্র বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাঁদের, অনেকে আবার মনে করেন এটি ছোঁয়াচে এবং অ্যালবিনোরা কম বুদ্ধির অধিকারী,” বললেন অনুভব।

এই বিষয় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন স্কুলে কর্মশালার আয়োজন করে জীবন ট্রাস্ট, ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক শিক্ষিকাদের মধ্যে যে ভুল ধারণা রয়েছে তা দূর করে অ্যালবিনো শিশুদের জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলাই ছিল লক্ষ্য। মিডিয়া ইন্সটিটিউটগুলোতেও করা হয় কর্মশালা, যাতে তারা বিষয়টি সম্পর্কে তথ্য সমৃদ্ধ হয়ে সম্পূর্ণভাবে কভার করতে পারেন।

এছাড়াও জীবন ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সভার আয়োজন করে ত্বকের যত্ন, ক্ষীণ দৃষ্টি, সরকারি স্কিম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। অ্যালবিনো সন্তানের জন্ম দেওয়া মা বাবাদের কাউন্সেলিং ও অ্যালবিনিসম রয়েছে এমন দরিদ্র মানুষদের সাহায্যও করা হয়।

অ্যালবিনোদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সহায়তাকারী দল তৈরি করতেও সমর্থ হয়েছে জীবন ট্রাস্ট। গণমাধ্যমে কাজ করেন ভক্তি তালাতি, তিনি নিজে একজন অ্যালবিনো। খেলাধুলো আগ্রহের বিষয়, কলামও লেখেন ভক্তি। “আমি যখন রাস্তা দিয়ে যাই, শুধু ছোটরা না, বড়রাও ঘুরে ঘুরে তাকায়। এখন আর কোনও সমস্যা হয় না, অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু সমস্যা হল অ্যালবিনিসম নিয়ে কোনও ধারণাই নেই মানুষের। অ্যালবিনোরা যেসব সমস্যায় পড়তে পারে তা কি ভাবে সামলাবে সে বিষয় সাহায্য করেছে জীবন ট্রাস্ট। আমি সেভাবে কোনও কঠিন সমস্যায় কখনও পড়িনি, কিন্তু অন্যদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি শুধুমাত্র অ্যালবিনো হওয়ার জন্য কত সমস্যায় পড়তে হয় মানুষকে,” বললেন ভক্তি।


বর্তমানে অ্যালবিনিসমের শিকার ৩০০ জনের সঙ্গে কাজ করে জীবন ট্রাস্ট। অনুভব জানালেন, জুন ১৩ কে বিশ্ব অ্যালবিনিসম দিন হিসেবে ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ, রাষ্ট্রপুঞ্জের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে জীবন ট্রাস্ট। জনসাধারণের জন্য অ্যালবিনো সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য দিয়ে একটি হ্যান্ড বুক প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ও পরবর্তী প্রকল্প

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ টাকা জোগাড় করা। সঙস অফ ক্যারাভান প্রকল্পটিতেও অনেক বেশি সময় লেগেছে টাকা জোগাড় না হওয়ায়। যাদের কাছেই অনুভব গেছেন, তাঁরা প্রশংসা করেছেন কিন্তু আর্থিক সাহায্য করেননি কেউ। শেষ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডের এলজিবিটি সম্প্রদায়কে নিয়ে কাজ করা সংগঠন প্ল্যানেট রোমিওর থেকে মেলে ৫০০০ ইউরো। সাহায্য করে ইউএনডিপিও। ক্রাউডফান্ডিং থেকে ওঠে ২৬,০০০ টাকা। অনুভব জানালেন, তাঁর বাবার সাহায্য না পেলে জীবন ট্রাস্টের কাজ চালানো অসম্ভব হত। “টাকা পয়সা ঠিক মতো পেলে আমরা কাজের সুযোগ ও পরিধি আরও বাড়াতে পারব। খুব কম টাকায় আমরা কাজ চালাই কারণ আমরা প্রত্যেকেই পূর্ণ সময়ের অন্য চাকরি করি,” বললেন অনুভব।

অনুভব জানালেন তাঁর শক্তির জায়গা তাঁর টিম। জীবন ট্রাস্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট সমীর গর্গ নিজে একজন অ্যালবিনো। “একটি মলে আমার সঙ্গে সমীরের দেখা হয়। একমাত্র ওঁর জন্য আমাদের অ্যালবিনো সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ সম্ভব হয়েছে। ও আমার ডান হাত ও বাঁ হাত। সমীর খুবই পরিশ্রমী ও কাজটার ব্যাপারে অসম্ভব প্যাশনেট”, বললেন অনুভব। সমীর একটি সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। আগামী দিনে মাস্ক্যুলার ডিস্ট্রোফি, অ্যাসপেরগেস ইত্যাদির মতো জিন-ঘটিত রোগগুলি নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করতে চায় জীবন ট্রাস্ট। অনুভবের লক্ষ্য বিষয়গুলি সম্পর্কে তথ্য সম্বলিত বই প্রকাশ। তিনি মনে করেন তাঁর কাজ জনসাধারণ ও সরকারের মানসিকতা বদলাতে সাহায্য করবে।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পথে নামছেন সল্টলেকের মানুষ,বিপদটা আজ ঘরে এসে পড়েছে, খুবই ভাল উদ্যোগ সন্দেহ নেই. কিন্তু মিছিল হবে অরাজনৈতিক. নির্বাচনের নামে নির্বিচার সন্ত্রাস, প্রায় ঘরে ঢুকে এসে পেটাল সাধারণ মানুষকে,তার প্রতিবাদ মিছিল অরাজনৈতিক. আমরা আর কবে বুঝব রাজনীতিটা তৃণমূল-বিজেপি-সিপিএম এর বাপের সম্পত্তি নয়.