বাংলায় চাই আরও বেশি Impact Investment

1

বাংলার উদ্যোগের মানচিত্রে যদি তাকান আপনি দেখতে পাবেন, প্রযুক্তি নির্ভর উদ্যোগ যেমন নতুন করে মাথা তুলছে তেমনি দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়গুলি নিয়েও মাথা তুলছে একের পর এক উদ্যোগ। বাংলার ইতিহাসের ধুয়ো টেনে, সংস্কৃতির সঙ্গে দুধে জলে মিশে যায় এমন অনেক স্টার্টআপ ভারতের পূর্বাঞ্চলে উঁকি মারছে। কেউ ফেলে দেওয়া মাটির খুঁড়িতে ছবি এঁকে বিক্রি করছেন। শিল্পের সঙ্গে আধুনিকতাকে মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে একের পর এক সংস্থা। বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে থাকা শিল্পসামগ্রীর বিপুল চাহিদা রয়েছে দেশের একটি শ্রেণির মধ্যে আর বিদেশের বাজারে। যেমন শঙ্খ রায়ের crafts nation, কিংবা গো বেঙ্গলের মত স্টার্টআপ যারা ব্র্যান্ডিং করতে চাইছেন বাংলাকে তারা বেশ রমরমিয়ে ব্যবসা করছেন। বাংলার শিল্প তো আছেই পাশাপাশি বাংলার প্রাকৃতিক সম্পদকেও বিশ্বের বাজারে তুলে ধরতে গিয়ে মা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের খোঁজ পাচ্ছেন। বাংলাকে ব্র্যান্ড করে, সেই ব্র্যান্ডকে নগদে রূপান্তর করার দৌড়ে খোদ রাজ্য সরকারও পিছিয়ে নেই। ফলে প্রতিযোগিতা আছে আর সম্ভাবনাও প্রচুর। কিন্তু বিনিয়োগ সেভাবে এখনও চোখে পড়ছে না।

যেমন ধরুন তরুণ উদ্যোগপতি রণদীপ সাহার Rare Planet, কিংবা চান্দ্রেয়ী মুখোপাধ্যায়দের Kreativ, সোমঋতা গুহর PaperCup। কেউ তৈরি করছেন ফেলে দেওয়া কাগজ দিয়ে গয়নাগাটি। কেউ শিল্পের জন্যে শিল্পকে কিংবা জীবনের জন্যে শিল্পকে ব্যবহার করে সাফল্যের সন্ধান করছেন। সবই যেন বাংলার রূপ লাবণ্য সৌন্দর্য সংস্কৃতির পরিপূরক। শিল্প নির্ভর অসংখ্য স্টার্টআপ। হাতের কাজ, মাটির কাজ, সেলাইয়ের কাজ, পাটি, মাদুর। হস্তশিল্পের বিপুল সম্ভার দেশের এই প্রান্তে দারুণ ব্যবসা করছে। পাশাপাশি সামাজিক বদলের কাজটাও চলছে তালে তাল মিলিয়ে। 

আর তাই স্টার্টআপদের তালিকায় এদের সংখ্যাই সব থেকে বেশি। গত একবছরে ১০ জন স্টার্টআপের মধ্যে ইওরস্টোরির হিসেব অনুযায়ী সাড়ে পাঁচজনই শিল্প সংস্কৃতি নির্ভর স্টার্টআপ শুরু করেছেন। এবং সুখের কথা সকলেই কমবেশি ভালো ব্যবসা করছেন। কেউ কেউ এই ব্যবসার সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছেন প্রযুক্তিকে। রণদীপ নতুন একটি আউট লেট খুলেছেন অক্সফোর্ড বুক গ্যালারির ভিতর। একটি খুলছেন এলগিন রোডের স্টোরিতে। 

আমি নিজে গিয়েছিলাম রণদীপের সেই দোকানে। রণদীপের ব্র্যান্ড রেয়ার প্ল্যানেট। এতদিন ওয়েবে বিক্রি হত ওর প্রোডাক্ট। এখন শহরের বুকে একাধিক দোকান। রণদীপ বলছিলেন, গ্রোথ রেট ১৫০ শতাংশেরও বেশি। তারমানে স্পষ্ট, ব্যবসাটায় দম আছে। পাশাপাশি রেয়ার প্ল্যানেটের রণদীপ তথ্যপ্রযুক্তির ছাত্র। তার ফলে প্রোডাক্টে তথ্যপ্রযুক্তির ছায়া এসে পড়েছে। আরও আধুনিক হয়েছে বিপণন শৈলি। যেমন ধরুন ওর দোকানে পাওয়া যায় এমন যেকোনও মৃৎপাত্রের বিবরণ, নির্মাণের ইতিবৃত্ত ও তুলে রেখেছে ওয়েব সাইটে। কিউ আর কোড লাগানো আছে সবগুলি প্রোডাক্টের গায়ে। সেই কোড স্ক্যান করলেই ঢুকে পরা যাবে সেই কাহিনির ভিতর। প্রোডাক্টটি কেবল মাত্র একটি মৃৎপাত্রের সামান্য চায়ের পেয়ালা তখন আর থাকে না, হয়ে যায় নিত্য নতুন কাহিনির ভিতর ঢুকে পড়ার প্রবেশাধিকার। তরুণ প্রজন্মের নবীন ক্রেতার কাছে এই কিউ আর কোডের চাবিকাঠি দারুণ মনোগ্রাহী।

ফেডারেশন অব স্টার্টআপ ফাউন্ডার্সের একটি আলোচনায় অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে আলাপ হয়েছে অশেষ সেনগুপ্তর সঙ্গে। একটি সংস্থা চালান। অর্থনীতির কৃতি ছাত্র অশেষ এবং ঋতুপর্ণা খুলে ফেলেছেন রাজ্যের গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে থাকা শিল্পীদের হাতের কাজকে দুনিয়ার দরবারে সঠিক মূল্য দেওয়ার স্টার্টআপ। শুনে মনে হচ্ছে এ আর এমন কী! এরকম কাজ তো কত মানুষই করেন। কিন্তু অশেষ, ঋতুপর্ণাদের কাজের সঙ্গে আর পাঁচটা কাজের একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। ওদের সংস্থার নাম কলকাতা কমনস সেন্টার ফর ইন্টারডিসিপ্লিনারি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইটিকস। বেশ বড় নাম। অবজেকটিভস টাও নাম থেকেই স্পষ্ট। শুনতে এবং বুঝতে এনজিও। 

ওরা লড়াই করছেন সাফল্যের জন্যে। একটি ব্যবসার সব থেকে বেশি সুবিধেটা প্রান্তিক শিল্পীকে পৌঁছে দেওয়ার লড়াই। সামাজিক দায় এবং ব্যবসায়িক বদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে অবশেষ এবং ঋতুপর্ণা চাইছেন এমন একটি সংস্থা তৈরি করতে যেখানে বাংলার তাঁতের উৎকর্ষ বাজারে ন্যায্যমূল্য পাক। শিল্পিত কারুকার্যের একটি উপযুক্ত বাজার তৈরি হোক। পাশাপাশি ওদের সংস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তৈরি হোক একটি তর্কের আঙিনা। গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যায় যে তর্ক। সমাজকে মেরুদণ্ডী করে তোলে যে তর্ক সেই তর্কের ইন্ধন জোগাতে চায় ওদের কলকাতা কমনস।

একে আপনি কী ধরণের স্টার্টআপ বলবেন? প্রোডাক্ট আছে। মার্কেট আছে। ক্রেতা বিক্রেতা সব আছে। দোকানদারিত্বও আছে। তবু নিজস্বতায় ভরপুর এই সব স্টার্টআপরাই এই ইকোসিস্টেমে দারুণ সাফল্য পাচ্ছে। বাংলায় স্টার্টআপ মানে শুধুই Tech নয়, IOT নয়, Robotics নয়। বৃহত্তর ইকোসিস্টেম থেকে সেগুলি চরিত্রেই ভিন্ন। অভিনবত্বে অনন্য।

অশেষদের ডি ডব্লিউ স্টুডিওতে গিয়ে দেখলাম সেখানে অডিও ভিজুয়াল ডকুমেন্টারি তৈরির কাজ চলছে। ওদের গবেষণার বিষয় প্রত্যন্ত গ্রাম বাংলার নিহিত সমস্যা এবং সমাধানের সুলুক। একদিকে সরকারি ব্যবস্থা যেমন ওদের এই গবেষণার সম্ভাব্য গ্রাহক তেমনি বড় বড় বহুজাতিক সংস্থাগুলির মারফতও ব্যবসা করতে চান অশেষ ঋতুপর্ণা। কিন্তু এই সামাজিক উদ্যোগে বিনিয়োগের জন্যে যে ইকোসিস্টেম প্রয়োজন এখনও সেটা পূর্বাঞ্চলে তৈরি হয়নি।

ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টের জন্যে যে সংস্থাগুলি গোটা ভারতে কাজ করছে তারা পশ্চিমবঙ্গে অনুপস্থিত। হাতে গোণা দুএকটি সংস্থা পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু যে গতিতে সামাজিক উদ্যোগের সুযোগ বিস্তৃত হচ্ছে সেই পরিমাণ ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টের ইকোসিস্টেমই তৈরি হয়ে ওঠেনি। আর এখানেই বিনিয়োগকারীদের জন্যে স্টার্টআপ সংস্থাগুলির দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন স্টার্টফেড এর চিফ মেন্টর কল্লোল দত্ত।