Art for Livelihood নিয়ে অমিতাভ ভট্টাচার্যর সাংস্কৃতিক বিপ্লব

0

আসুন, আজ আলাপ করা যাক খড়গপুর আইআইটি'র প্রাক্তনী অমিতাভ ভট্টাচার্যর সঙ্গে। ১৯৯৯ সালে মার্কিন মুলুকের চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন অমিতাভ। চোখে উন্নত ভারত গড়ার স্বপ্ন। ২০০০ সালে গড়ে তুললেন সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা বাংলানাটক ডট কম। সংস্কৃতি ও উন্নয়ন, এই দুইকে নিয়েই কাজ। গ্রামীণ ছোট ছোট গোষ্ঠী, সংস্থা ও সামাজিক উন্নয়নে লোকশিল্প বড় সহায়ক হতে পারে বলেই বিশ্বাস করেন অমিতাভ। এ জন্য দরকার সেই শিল্প ও শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানো।

২০০৪ সালে বাংলানাটক ডট কমের ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্ট হিসাবে অমিতাভ গড়ে তোলেন ‘আর্ট ফর লাইভলিহুড’ (Art for Livelihood বা AFL)। পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জেলায় ছড়িয়ে থাকা ৬টি ঐতিহ্যশালী শিল্প এবং সেই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ৩২০০ জন শিল্পীকে নিয়ে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। একসময় এইসব শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষ সমাদর পেতেন। কিন্তু আধুনিক সমাজে তেমন কদর ছিল না। শিল্পীরাও তাই হারিয়ে যেতে বসেছিলেন। আর ঐতিহ্য মুখ লুকিয়েছিল বইয়ের পাতায়। সেই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে, শিল্প ও শিল্পীকে বাঁচাতেই ওই উদ্যোগ নেন অমিতাভ। প্রশিক্ষণ, প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের রক্ষা। এটাই ছিল ‘আর্ট ফর লাইভলিহুড’-এর লক্ষ্য। একদিকে পারফর্মিং আর্ট (যাত্রা, ছৌ নাচ ইত্যাদি), অন্যদিকে হস্তশিল্প (মাটির পুতুল তৈরি, মাদুর তৈরি ইত্যাদি)। "আমাদের মোটো ‘To preserve art, let the artists survive’, একদিকে গ্রামীণ সংস্কৃতির রক্ষা, অন্যদিকে সামাজিক উন্নয়ন", বললেন অমিতাভ।


শুরুর দিন থেকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, পঞ্জাব, রাজস্থান ও ওড়িশার ১৪ হাজারেরও বেশি লোকশিল্পীর জীবনে পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট হয়েছে ‘আর্ট ফর লাইভলিহুড’। আর এখন AFL পৌঁছে গিয়েছে দেশ-বিদেশের লক্ষ-লক্ষ মানুষের কাছে, তৈরি হয়েছে নতুন দর্শক, মিলেছে সংবাদমাধ্যমের সহায়তা, বেড়েছে বাজার। এর ফলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে গ্রামীণ শিল্পীদের আর্থ-সামাজিক জীবনে। উন্নয়নের এই মডেল এখন জাতীয় স্তরেও স্বীকৃত। এই মেথডলজির প্রশংসা করেছে ইউনেস্কোও। শুধু প্রশংসা নয়, Intangible Heritage committee, 2010-কে পরামর্শ সহায়তা দিতে স্বীকৃতি পায় বাংলানাটক ডট কম।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কীভাবে কোনও জনগোষ্ঠী বা এলাকার উন্নয়ন ঘটাতে পারে? অমিতাভ বললেন,"সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে লগ্নি হলে মাইক্রো ইকনমির উন্নয়ন ঘটার সম্ভাবনা থাকেই। অদক্ষ শ্রমিকদের শিল্পী হিসাবে কাজের সুযোগ তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে সামাজিক উন্নয়নে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা ভারতে বিশেষ কোনও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীতে বিনিয়োগের হার খুবই কম এবং তাও মাত্র কয়েকটি ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। দু'একটা অ্যাড হক ডকুমেন্টেশন কিংবা কোনও উৎসবে অংশগ্রহণের ডাক। আসলে সংস্কৃতিকে কখনই উন্নয়নের একটা মাধ্যম হিসাবে মনে করা হয়নি। তার ওপর আন্তর্জাতিক মন্দা বিষয়টিকে সবচেয়ে কম প্রয়োজনীয়র ব্র্যাকেটে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি কমিউনিটি ভিত্তিক দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নে অনুঘটকের কাজ করতে পারে সংস্কৃতি। শুধু তাই নয়, কোনও গোষ্ঠী যদি দেখে যে এর ফলে রোজগার হচ্ছে, স্বীকৃতি মিলছে তখন তারাও সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে সচেষ্ট হবে। এই ব্যাপারটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের পলিসি মেকারদেরও ভাবতে হবে।"

পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে Cultural Tourism বা সাংস্কৃতিক পর্যটনকেও হাতিয়ার করেছে ‘আর্ট ফর লাইভলিহুড’। শিল্পীদের গ্রামে-গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে ফোক আর্ট সেন্টার। যা শিল্পীদের সঙ্গে পর্যটকদের যোগসূত্র হিসাবে কাজ করছে। স্থানীয় মানুষ তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরছেন আর পর্যটক পাচ্ছেন মানব ইতিহাসের একটা অধ্যায়ের পরিচয়। লোকশিল্পীদের নিয়ে ওয়ার্কশপের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্যের লোকগান শিল্পীরা তাদের সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য তুলে ধরছেন পর্যটকদের সামনে। লোক চিত্রশিল্পীদের থেকে পর্যটকরা জানতে পারছেন রঙের উৎস। গ্রামে-গ্রামে আয়োজন করা হচ্ছে লোক উৎসবের। সেখানে ডাক পাচ্ছেন প্রতিষ্ঠিত ও নবীন শিল্পীরা। মেলে ধরতে পারছেন তাদের প্রতিভা। ফলে সেইসব গ্রাম পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারছে। যেমন বিহারের মধুবনী চিত্রশিল্পী, বাংলার পটশিল্প কিংবা সুফি সঙ্গীত। বৃহৎ এই কর্মকাণ্ডের ফলে শিল্পীদের রোজগারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে পরোক্ষভাবে ঘটছে উন্নয়ন।

"সাবঅল্টার্ন সংস্কৃতি ও জীবনশৈলী নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে আমরা শহরেও উৎসবের আয়োজন করে থাকি। যে মঞ্চে শহর ও গ্রামের শিল্পীদের মধ্যে ভাবের আদানপ্রদান হয়। ২০১১ সাল থেকে আমাদের বাৎসরিক সুফিসূত্র উৎসব হয়ে এসেছে কলকাতা, গোয়া, দিল্লি ও বিহারে। আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সঙ্গে একই মঞ্চ ভাগ করে নেন বাংলার লোকগান শিল্পীরা। ইতিমধ্যে আমাদের এই উৎসবে যোগ দিয়েছেন ২৭টি দেশের শিল্পীরা। এক কথায় বলতে গেলে এটা এখন একটা ওয়ার্ল্ড মিউটিক কনসার্ট", বললেন অমিতাভ। ‘আর্ট ফর লাইভলিহুড’-এর এইসব উদ্যোগে শিল্পীদের জীবনে পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। অনেকেই এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকস্তরে পরিচিত ও সমাদৃত। বেড়েছে রোজগারও।তথ্য তুলে ধরে অমিতাভ জানালেন, আগে শিল্পীদের মাসিক গড় রোজগার ছিল ৮ ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় বড়জোর ৫০০ টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৬০ ডলার বা কমবেশি সাড়ে তিনহাজার টাকা। ৪০ শতাংশ শিল্পীর কাছে এটাই এখন রোজগারের প্রধান উৎস। আরও ৪০ শতাংশের কাছে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ রোজগারের উৎস। এমন ১০ শতাংশ শিল্পী রয়েছেন যাদের গড় মাসিক রোজগার বেড়ে হয়েছে ২৫০ ডলার বা ১৫০০০ টাকা। এর পরোক্ষ প্রভাব লক্ষ্য করা গিয়েছে সমাজজীবনেও। শিল্পীদের গ্রামগুলিতে স্যানিটেশন (শৌচাগার নির্মাণ ইত্যাদি) ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮০ শতাংশ। সুবিধাভোগীরা (অধিকাংশই নিরক্ষর) তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন। গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রবণতাও কমেছে। লোকশিল্পীদের গড় বয়স ৪১ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২৮। তরুণ ও মহিলারাও নিজেদের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে এগিয়ে আসছেন।

বর্তমানে বাংলার দশটি গ্রামে কাজ করছেন অমিতাভ। এইসব গ্রামে রয়েছে ঐতিহ্যশালী নিজস্ব শিল্পসম্ভার। এর মধ্যে রয়েছে টেরাকোটা, ডোকরা, কাঁথা স্টিচ, কাঠের পুতুল, মুখোশ, মাদুরকাঠি, শীতলপাটি, পটচিত্র, ছৌ মুখোশ এবং মাটির পুতুল। অমিতাভ জানালেন,"বাংলায় হস্তশিল্পের একটা বিরাট ঐতিহ্য রয়েছে। এইসব শিল্পের সঙ্গে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ যুক্ত রয়েছেন বলে ধরা হয়। সুন্দর এই শিল্পসম্ভার জাতীয় ও আন্তর্জাতিকস্তরে স্বীকৃত। কিন্তু কর্মসংস্থান, রফতানি, বৃদ্ধি ইত্যাদি ব্যাপারে সেরকম নজরই দেওয়া হয়নি।সবচেয়ে নিচের তলার শিল্পীরা খুব সামান্য মজুরি পান। এই কম রোজগারের জন্য তরুণরা পারিবারিক পেশা ছেড়ে দিনমজুরির কাজ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি বদলাতে পারে দুটো জিনিস। এন্টারপ্রাইজ ও রেকগনিশন। এন্টারপ্রাইজ বা সংস্থা আর্থিক লাভালাভের বিষয়টিতে সাহায্য করবে। আর রেকগনিশন বা স্বীকৃতি শিল্পীদের মধ্যে অনুপ্রেরণা ও গর্বের সহায়ক হবে। Art for Life, এই মডেল আমরা দশটি গ্রামীণ হাবে কাজে লাগিয়েছি। সেখানে সহায়তা মিলেছে কেন্দ্রীয় সরকারের Micro and Small Scale Enterprise & Textiles (MSSE&T)-এর MSSE Department-এর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং ইউনেসকো।"

বাংলানাটক ডট কমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অমিতাভর স্ত্রী এবং কো-ডিরেক্টর অনন্যা ভট্টাচার্যও। অনন্যা জানালেন,"কলকাতা, ভুবনেশ্বর ও গোয়ার হেরিটেজকে তুলে ধরতে সেখানকার তরুণদের নিয়ে ‘CamEra: Our City, Our Angle’ চালাচ্ছি আমরা। ওইসব তরুণরা তাদের শহরকে ক্যামেরাবন্দি করছেন। আমরা সেইসব ছবি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনী করি।" AFL মডেলকে তুলে ধরতে ইউরোপ ও এশিয়ার বহু জায়গায় সেমিনারে যোগ দিয়েছেন অমিতাভ। সেই কাজেও তিনি সফল। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা লোকশিল্পীদের কাছেও পৌঁছতে চান অমিতাভ। আপাতত তাই নিয়েই মেতে রয়েছেন বাংলার এই ছেলে।