পূজার দৌলতে ভারতে এল ম্যাকারুন

0

ম্যাকারুন। বাংলায় ‌বলতে গেলে বাদামের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি গোল গোল বিস্কুট। থুরি কুকি। তবে শুধু বাদামের গুঁড়োই নয়, তার সঙ্গে থাকে নারকেল, চিনি, ডিম, চকোলেটের কোটিং। মুম্বইয়ের পেস্ট্রি শিল্পে এই ম্যাকারুনকে ‌যুক্ত করে এর বাজারই বদলে দিয়েছিলেন পূজা ধিঙ্গরা। পূজার কেক বা বিস্কুট বানানোয় হাতে খড়ি তাঁর কাকিমার কাছে। যখন মাত্র ছ‘বছর বয়স তখন কাকিমার কাছে ব্রাউনি বানাতে শেখেন পূজা। স্কুলের বন্ধুদের জন্য নিজেই বিভিন্ন ধরণের গুডিস বানাতেন। সেগুলো করে নিয়ে গিয়ে স্কুলের বন্ধুদের খাওয়াতেন। কিন্তু সেসব ছিল নেহাতই ছেলেমানুষি। কেক পেস্ট্রিই যে তাঁকে জীবনে প্রতিষ্ঠা দিতে চলেছে তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি মুম্বইয়ের এই মেয়ে। মুম্বইয়ের স্কটিশ স্কুলে পড়া শেষ করে জয় হিন্দ কলেজে ২ বছর পড়েন তিনি। সেইসময়ে তাঁর মনে হয় তিনি আইনজীবী হবেন। ভর্তি হন ল’কলেজে। কিন্তু মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যেই বুঝতে পারেন আইন তাঁর কাপ অফ টি নয়। ফলে আইন পড়া ছেড়ে পূজা পাড়ি দেন সুইৎজারল্যান্ডে। সেখানে সিজার রিজ কলেজে হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়া শুরু করেন। সুইৎজারল্যান্ডে পড়াকালীনই তাঁর মনে হয় আসলে তাঁর প্রকৃত ভালবাসার জায়গা পেস্ট্রি কিচেন। ফলে আর দেরি না করে সুইৎজারল্যান্ডের পাট চুকিয়ে ফ্রান্সে চলে যান পূজা। প্যারিসের ‘লে কোঁদো বিউ’ প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্রেঞ্চ পেস্ট্রির ওপর ডিপ্লোমা করেছেন তিনি।

প্যারিসে পড়াশোনার সময় পূজা পেস্ট্রির একটি ভাগ হিসাবে ‘পূজাতো’ বলে একটি গোলাকৃতি খাবারের সঙ্গে পরিচিত হন। এটাই ম্যাকারুন। ‌যা জীবনে প্রথম প্যারিসেই দেখেন তিনি। ভারতে এ জিনিস তিনি কখনও চোখে দেখেননি। অথচ এমন একটি সুস্বাদু খাবার কেন তখনও ভারতে পরিচিত ছিল না তা এখনও বুঝতে পারেন না পূজা। এসময়েই পূজা ঠিক করে নেন ভারতে ফিরে তিনি ম্যাকারুন বানানো শুরু করবেন।

দেশে ফিরে অন্যান্য পেস্ট্রির সঙ্গে বাড়িতেই ম্যাকারুন বানানো শুরু করলেন পূজা। তবে প্রথম দিকে ভুল ত্রুটি যে হচ্ছিল না তা নয়। বিভিন্ন রন্ধন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে ম্যাকারুনকে আরও সঠিক করার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যান পূজা। এই বন্ধুদের সহযোগিতাতেই পূজা মুম্বইতে গড়ে তোলেন নিজের একটি পেস্ট্রির রান্নাঘর। যার হাত ধরে মুম্বই অচিরেই ম্যাকারুন নামে এক সুস্বাদু বিস্কুটের সঙ্গে পরিচিত হলেন। আর বাজারে আসতেই কেল্লাফতে। হুহু করে বিক্রি হতে থাকে এই আপাত নতুন খাবার।

তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৩ বছর। পুঁজি বলতে বিস্তর পড়াশোনা আর হার না মানা একটা মন। যে মন হারতে জানে না। জানে শুধু লক্ষ্য ছোঁয়ার দিকে একাগ্র চিত্তে ছুটে চলতে। শুরু শুরুতে পুরুষ প্রধান পেস্ট্রি শিল্পের জগতে পা রাখতে একরাশ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয় পূজাকে। সাপ্লায়ার থেকে রিয়েল এস্টেট এজেন্টদের সঙ্গে এত কম বয়সে এঁটে ওঠা সহজ হচ্ছিল না। কিন্তু ‌যত দিন এগোলো চ্যালেঞ্জগুলো পরিবর্তিত হতে থাকল। ক্রমশ ব্যবসার খুঁটিনাটি বুঝতে থাকলেন মুম্বইয়ের এই তরুণী শিল্পোদ্যোগী। পূজার হাত ধরে একদিন জন্ম নিল ‘লে ১৫’। তাঁর স্বপ্নের পেস্ট্রি শপ। যেখানকার বিশেষত্বই হল ক্যামারুন। এই মুহুর্তে মুম্বইতে লে ১৫-র চারটি দোকান রয়েছে। আগামী দিনে তা আরও বাড়বে বলেই জানালেন পূজা।

ব্যবসা করতে গিয়ে পূজার অভিজ্ঞতা কিছুটা মধুর আবার কিছুটা তিক্ত। তিক্ত কারণ এখানে দক্ষ কারিগররা কথায় কথায় অন্যত্র চলে যান। ব্যবসা করতে গেলে অনেক সরকারি কাগজপত্রের ছাড়পত্র পেতে হয়। যা সহজে হয়না। অন্যদিকে মধুর অভিজ্ঞতা হল এখানকার বিশাল বাজার, বিপুল চাহিদা। ফলে যে কোনও শিল্পোদ্যোগীর ব্যক্তিগত আয় দ্রুত বাড়ার সুযোগ রয়েছে। যা তাদের উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে ভারতে একজন শিল্পোদ্যোগী হওয়া আর একজন মহিলা শিল্পোদ্যোগী হওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে বলে মনে করেন পূজা। তাঁর মনে হয় ব্যবসা করতে নেমে মহিলাদের অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়।

পেস্ট্রি রান্নার পাশাপাশি পূজা ঘুরতে ভালবাসেন। ব্যস্ত সময়সূচি থেকে সময় বার করে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান পূজা। সেখান থেকে নতুন নতুন আইডিয়াও পান তিনি। যেমন জাপানে ঘুরতে গিয়ে গ্রিন টির বিশাল সংগ্রহ তিনি তাঁর লে ১৫ এ চালু করেছেন। নিউইয়ের্ক ঘুরে আসার পর লে ১৫ এ ‘চিজকেক সপ্তাহ’ পালন করেন তিনি।

এইমুহুর্তে ভারতের অন্যতম পেস্ট্রি সেফের নাম পূজা ধিঙ্গরা। বলিউডের অফিসিয়াল বেকারির নাম লে ১৫। শুধু পেস্ট্রি তৈরিই নয়, তার ওপর বইও লেখেন পূজা। তাঁর লেখা ‘দ্যা বিগ বুক অফ ট্রিটস’ ওয়ার্ল্ড গোরমান্ড কুকবুক অ্যাওয়ার্ডে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে সকলকে চমকে দিয়েছে। বর্তমানে আরও দুটি বই লিখছেন পূজা। যা খুব দ্রুত প্রকাশিত হবে। পাশাপাশি ‘স্টুডিও ফিফটিন’ নামে রন্ধন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও চালু করেছেন পূজা। ‌যেখানে শুধু মুম্বই নয়, ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসছেন।