টার্ম শিট নয়, শেয়ারহোল্ডিং এগ্রিমেন্টই আসল

0

ভারতীয় তরুণদের মধ্যে স্টার্টআপ বা শুরুয়াতি ব্যবসার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা অবশ্যই ইতিবাচক একটা দিক। কেউ-কেউ বড় মাপের সাফল্য পেয়েছেন, কেউ লড়াই চালাচ্ছেন। আবার একদল আছেন যারা শুরুয়াতি ব্যবসায় নামার কথা ভাবছেন। আইডিয়াকে কীভাবে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায় তা নিয়ে তারা অনেকের সঙ্গে কথা বলছেন। শুরুয়াতি ব্যবসার খুঁটিনাটি জানার ও বোঝার চেষ্টা করছেন। শুরুয়াতি ব্যবসা যেমনই হোক, ছোট বা বড়, একটা জিনিস কিন্তু লাগবেই। পুঁজি বা ক্যাপিটাল। নিজের পকেটের জোরে ব্যবসা বহু ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। তখন দরকার পড়ে একজন ইনভেস্টর বা বিনিয়োগকারীর। একজন বিনিয়োগকারী তখনই লগ্নিতে রাজি হবেন, যখন আপনার আইডিয়া তাঁর মনে ধরবে। এরপর লগ্নিতে রাজি হলে তিনি লিখিত বোঝাপড়া করবেন। এ প্রসঙ্গে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের কিছু জিনিস মাথায় রাখা উচিত।

প্রথমেই দুটো শব্দ মাথায় রাখুন। Term Sheet ও Shareholding Agreement. আপনি যখন একটি টার্ম শিটে সই করছেন সেই মুহূর্ত থেকে বিনিয়োগকারীর সঙ্গে আপনার সমঝোতা হয়ে গেল। যদিও সেই সমঝোতা বা বোঝাপড়া তখনই পরিপূর্ণরূপে কার্যকর হবে যখন আপনি শেয়ারহোল্ডিং এগ্রিমেন্টে সই করবেন। সহজ কথায় বললে বিষয়টা বাগদান থেকে বিবাহ পর্বের সঙ্গে তুলনা করা যায়। বাগদান মানেই কিন্তু বিয়ে নয়, এটা মাথায় রাখা উচিত। ঠিক একইভাবে টার্ম শিট থেকে শেয়ারহোল্ডিং এগ্রিমেন্ট, এই পথে terms and conditions-এ বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটতে পারে।ঠিক এই জায়গাটাতেই বহু স্টার্টআপ বিভ্রান্ত হয়ে যায়। আসলে তারা ভেবে বসেন টার্ম শিটের ক্লজগুলিই চূড়ান্ত এবং তা মানতে দু'পক্ষ বাধ্য। পরবর্তীসময়ে তারা যখন অন্য রকম ক্লজে শেয়ারহোল্ডিং এগ্রিমেন্ট পান, বাস্তবিকই তারা দিশাহারা হয়ে পড়েন। তখন শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি। এই ভুল বোঝাবুঝি থেকে বহু ক্ষেত্রে পাকা লগ্নি কেঁচে যায়।

Term Sheet ও Shareholding Agreement হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের দুটি ডকুমেন্ট।এই প্রবন্ধে আমরা চেষ্টা করব দুটি ডকুমেন্টে কোথায় পার্থক্য রয়েছে তা তুলে ধরতে।

Term Sheet কী?

টার্ম শিট হচ্ছে এমন একটি চুক্তি যাতে বেসিক terms and conditions থাকে এবং যার ওপর ভিত্তি করেই কেউ বিনিয়োগ করছেন। কিন্তু এই চুক্তি non-binding অর্থাৎ বাধ্যবাধকতাহীন। আরও সহজ করে বললে টার্ম শিট হচ্ছে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে লগ্নির প্রস্তাব।

Shareholding Agreement কী?

শেয়ারহোল্ডিং এগ্রিমেন্ট হচ্ছে চূড়ান্ত নথিপত্র বা ডকুমেন্ট। যা আইনত মানতে বাধ্য থাকবে চুক্তিকারীরা (it is definitive and legally binding)। এটা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে লিখিত চুক্তি। যাতে কোম্পানি কীভাবে চলবে, শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার ও দায়িত্ব কী থাকবে তা স্পষ্টভাবে লেখা থাকে।

উপরের দুটো সংজ্ঞা থেকেই পরিষ্কার, দুটি ডকুমেন্ট মূলগত পৃথক। বহু ক্ষেত্রেই টার্ম শিটের ক্লজগুলি পরিবর্তিত হয় শেয়ারহোল্ডিং এগ্রিমেন্টে। এর মূলত দুটি কারণ রয়েছে। একটি বিনিয়োগকারীর দৃষ্টিভঙ্গীতে এবং অন্যটি উদ্যোগপতির দৃষ্টিভঙ্গীতে। যা নিচে তুলে ধরা হল।

The Investor Viewpoint

টার্ম শিটে সই হওয়ার পরেই বিনিয়োগকারীর Due Diligence প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এটা উদ্যোগপতির জন্য লিটমাস টেস্ট বলা যেতে পারে। বিনিয়োগকারীর সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি যে সব দাবি করেছিলেন এ যেন তারই পরীক্ষা। যদি কোথাও কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়ে, তথ্যগত অস্পষ্টতা থাকে, তবে জানবেন ফাইনাল ডকুমেন্টে বড়সড় পরিবর্তন হতে চলেছে।

ঘটনা হল ভারতীয় স্টার্টআপ শাসন করছে মূলত তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা নন-ফাইন্যান্স ব্যাকগ্রাউন্ডের ছেলেমেয়েরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়গুলি সম্পর্কে ততটা জানে না। এর ফলে তারা পরবর্তীকালে অসুবিধায় পড়ে। সেক্ষেত্রে টার্ম শিটের ক্লজগুলি নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে বাধ্য হন বিনিয়োগকারীও। সেই সব ক্লজের মধ্যে রয়েছে -

  • সেক্রেটারিয়াল প্র্যাকটিস ঠিকঠাক না মানা
  • বিধিবদ্ধ রেজিস্ট্রার, মিনিটস, প্রস্তাবনা বা রেজোলিউশনস ঠিকমতো ও সময়ে রেকর্ড না করা
  • Intellectual Property সংক্রান্ত মালিকানা
  • রাজ্য ভিত্তিক লাইসেন্স ও পারমিটের ব্যবস্থা না করা
  • শেয়ারহোল্ডার বা ডিরেক্টরদের মধ্যে চুক্তির অস্পষ্টতা
  • সরকারি দফতরে অতিরিক্ত ফি বা পেনাল্টি দিয়ে নথি জমা
  • বার্ষিক কর জমা না দেওয়া

এ ব্যাপারে আরও নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। তবে এগুলিই হল সবচেয়ে চর্চিত বিষয়। যে সব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিষয়গুলির দিকে নজর দিতে হবে।

The Startup Viewpoint

অধিকাংশ বিনিয়োগকারীই টার্ম শিটকে সিনেমার ট্রেলারের মতো দেখেন। তাদের কাছে এটা শুধুমাত্র একটা ডকুমেন্ট, এর বেশি কিছু নয়। তাদের কাছে আসল নথি হল shareholding agreement. সেটা নিয়েই তারা বেশি ভাবেন বা গুরুত্ব দেন। কিন্তু টার্ম শিটের ভিত্তিতেই অনেকটা সময় ও অর্থ খরচ করে ফেলে স্টার্টআপ সংস্থাগুলি। ফলে ফাইনাল ডকুমেন্টের সময় তারা বিনিয়োগকারীর অনেক শর্ত মানতে বাধ্যই হন। অন্যসময় হলে হয়তো তারা তাতে রাজি হতেন না।

এর সম্ভাব্য একটা সমাধান হতে পারে যে বিনিয়োগকারীর ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে ভালোভাবে জানা। যাতে সংশ্লিষ্ট স্টার্টআপ সঠিক লগ্নিকারীকেই বেছে নিতে পারে। একইসঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ হল লগ্নির সময়টা বোঝা। মানে ঠিক কখন আপনার ব্যবসায় টাকাটা ঢালবেন। সেই হিসাবেই তহবিলের ব্যবস্থাটা রাখতে হবে। আসলে সমস্যাটা তখনই দেখা দেয় যখন কোনও স্টার্টআপ প্রিম্যাচিওর ফান্ডিংয়ের পথে যায়। সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী বাড়তি সুবিধা পেয়ে যান। একটা উদারণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝানো যাক। ধরা যাক, একটি স্টার্টআপ আইডিয়াকে কাজে রূপ দিতে সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে লগ্নি খুঁজছে। অন্যদিকে অন্য একটি স্টার্টআপ শুধুমাত্র আইডিয়ার ওপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথমটিই কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক দৃষ্টিতে লগ্নি পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে।

শেষের কথা

উপসংহারে একথাই বলব shareholding agreement হচ্ছে সেই ভিত্তিপ্রস্তর যার ওপর startup-investor সম্পর্কটা তৈরি হয়। আর টার্মশিট হচ্ছে সেই ভিত্তির মালমশলা। তাই স্টার্টআপকে শেয়ারহোল্ডিং এগ্রিমেন্ট সই করার সময় সবদিকে নজর রাখতে হবে, ঠিক যেভাবে তারা সময় দিয়ে থাকেন টার্মশিটে।