জীবপ্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ইশ্বর। স্বামী বিবেকানন্দের এই বাণী আরও অনেকের মতো উদ্বুদ্ধ করেছিল কাঁথির এক স্কুল শিক্ষক ব্রজগোপাল সাউকে। বলতে গেলে প্রায় সারা জীবন তিনি মানুষেরই সেবা করে কাটিয়ে দিয়েছেন। প্রাথমিক শিক্ষক ব্রজগোপালবাবুর অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৯৮২ সালে পূর্ব মেদিনীপুরে পথ চলা শুরু করে বিবেকানন্দ লোকশিক্ষা নিকেতন। বর্তমানে এই এনজিওর পূর্ব মেদিনীপুর জুড়ে ৪টে ক্যাম্পাস। সব মিলিয়ে ২৮টি প্রজেক্ট। প্রায় ৩৩ বছর ধরে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু, অসহায় বৃদ্ধা, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তাদের জন্য কাজ করে চলছে নিভৃতে।

৮০ সাল নাগাদ নরেন্দ্রপুর লোকশিক্ষা পরিষদের সঙ্গে কাজ করতেন ব্রজগোপালবাবু। বিবেকানন্দর ভাবধারায় অনুপ্রাণীত হয়ে রক্তদান শিবির সহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে এনজিও গড়ার ভাবনা। প্রথমে নরেন্দ্রপুর লোকশিক্ষা পরিষদের শাখা হিসেবে কাজ করত ব্রজগোপালবাবুর হাতে গড়া কাঁথির বিবেকানন্দ লোকশিক্ষা নিকেতন। ৮২ সাল থেকে স্বশাসিত সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

এনজিও-এর মূল ক্যাম্পাসটি ফরিদপুরে। কাছেই আরও একটি ক্যাম্পাস রয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ ক্যাম্পাস হল কাঁথি ও দীঘায়। মূল ক্যাম্পাসে আছে একটি বৃদ্ধাবাস। ৬০ এর ওপরে যাদের বয়েস এমন ২৫ জন বৃদ্ধা বিনা খরচে থাকতে পারেন এই আবাসে। ৫ একর জমির উপর এই ক্যাম্পাসে আইসিডিএস(ইন্টিগ্রটেড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস)এর অফিসও রয়েছে। ফরিদপুরের অন্য ক্যাম্পাসে অন্ধ এবং মানসিক প্রতিবন্ধীদের স্কুল চলে। ৪ থেকে ১৮ বছর বয়সের শিক্ষার্থীদের আবাসিক স্কুল এটি। সংস্থার সাধারণ সম্পাদক গৌতম শাসমল জানান, ‘রাজ্য সরকারের জনশিক্ষা প্রসার অনুদানে চলে প্রকল্পটি। পড়াশোনার পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের নানা রকম হাতের কাজ যেমন, ধূপবাতি, মোমবাতি তৈরি, পাট দিয়ে জিনিসপত্র তৈরি, কুটিরশিল্পের কাজ শেখানো হয়। পড়াশোনার পর প্রতিবন্ধী এই ছেলেমেয়েগুলি যাতে স্বনির্ভর হতে পারে তারই প্রশিক্ষণ দেন অভিজ্ঞ শিক্ষক-শিক্ষিকারা’। এই মুহূর্তে ১১২ জন প্রতিবন্ধী আবাসিক রয়েছে এই এনজিওয়।

এনজিও-এর আরেকটি প্রজেক্ট হল জুভেনাইল জাস্টিস হোম। মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেদের জন্য এই হোম। ৬ থেকে ১৮ বছরের ছেলেদের রাখা হয় এখানে। নিয়মিত চিকিৎসা চলে। আবাসিকদের ডাক্তাররা এসে দেখে যান, ওষুধের ব্যবস্থা করা হয় এনজিওর তরফে। মানসিক প্রতিবন্ধী হলেও এদের মধ্যে যারা পড়াশোনা করতে পারে তাদের হোমের কাছে স্কুলে পাঠানো হয়। বাকিদের প্রশিক্ষণ হোমের স্কুলেই, জানান গৌতমবাবু। এই প্রকল্পের জন্য কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের আর্থিক সাহায্য মেলে। প্রত্যেকের জন্য সরকারি বরাদ্দ মাসে ২ হাজার টাকা।

স্পেশালাইজড এডপটেশন এজেন্সি বা এসএসএ নামে আরও একটি প্রকল্প রয়েছে বিবেকানন্দ লোকশিক্ষা নিকেতনের। মূলত হারিয়ে যাওয়া বা রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া বাচ্চাদের তুলে এনে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির কাছে দেওয়া হয়। কমিটিই সেই বাচ্চাগুলিকে হোমে পাঠায়।তাদের লালন পালন চলে এনজিওর তত্ত্বাবধানেই। কেউ যদি দত্তক নিতে চান তাহলে অনলাইনে বা সরাসরি আবেদন করতে পারেন। সব যাচাই করে তবেই দত্তক নিতে ইচ্ছুক বাবা-মায়ের হাতে শিশু তুলে দেওয়া হয়। গৌতম শাসমল জানান, ‘অনেক প্রতিবন্ধী শিশুদেরও রাস্তা থেকে তুলে আনি আমরা। তাদের দত্তক নেওয়ার জন্য তেমন একটা আগ্রহী কাউকে পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে হোমেই বড় হয় ওই শিশুগুলি’। এই মুহূর্তে এমন১২টি শিশু রয়েছে হোমে।

অবিবাহিত, বিধবা অথবা স্বামী পরিত্যক্তাদের জন্যও হোমের ব্যবস্থা আছে। এনজিও-এর যে তাঁত প্রকল্প রয়েছে তাতে প্রশিক্ষকের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ওই মহিলাদের। প্রশিক্ষণের পর এনজিও-এরই তাঁতকল অথবা বাইরেও কাজ করে স্বনির্ভর হতে পারেন মহিলারা। শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত বা স্বামী পরিত্যক্তাদের অন্তত তিন বছর হোমে রেখে আইনি সাহায্যও দেয় এই এনজিও। এই ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের আর্থিক সাহায্য মেলে। ৫০ জন মহিলাকে আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

নানা প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং হোমে রাখা ছাড়াও রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, পয়লা বৈশাখ এমন নানা উপলক্ষে বছরভর নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেয় হোমের প্রতিবন্ধীরাই। নাচ, গান, আবৃত্তি, ছবি আঁকা-বাদ যায় না কিছুই। অন্ধ ছাত্রছাত্রীদের পাতার পর পাতা কবিতা আবৃত্তি মুগ্ধ করে দেয়।এনজিও-এর তত্ত্বাবধানে নানা প্রশিক্ষণে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটে সমাজের কাছে প্রায় ব্রাত্য হয়ে যওয়া এই অংশের।

এনজিওর পরিচালন কমিটিতে রয়েছেন ১৬ জন। প্রতিষ্ঠাতা ব্রজগোপাল সাউয়ের বয়েস হলেও এখনও যথেষ্ঠ সক্রিয়। সংস্থা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরবর্তী প্রজন্ম যাতে এখন থেকেই তৈরি হতে পারে, তার জন্য পরিচালনার মূল দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন সাধারণ সম্পাদক গৌতম শাসমলের কাঁধে। যে স্বপ্ন ব্রজগোপালবাবু দেখেছিলেন তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিরাট দায়িত্ব অক্লান্তভাবে সামলে চলেছেন গৌতমবাবু। জানান, মানুষের সচেতনতার অভাবে কাজে বেগ পেতে হয়। আইনি সমস্যায়ও পড়তে হয় মাঝে মাঝে। আরও বড় সমস্যা হল ফান্ডিং। কেন্দ্র এবং রাজ্যের কাছ থেকে যা আর্থিক সাহায্য মেলে তা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় মানুষ সাহায্যে এগিয়ে আসেন। স্থানীয়দের কাছ থেকে টাকা তুলে ঘাটতি মেটে। কিন্তু এভাবে চেয়েচিন্তে আর কদিনই বা চলে। তাই সরকারি সাহায্য আরও বাড়ার দিকে তাকিয়ে বিবেকানন্দ লোকশিক্ষা নিকেতন।