২৭ কোটি টার্ন ওভার, পাল্টে যাচ্ছে যৌনকর্মীদের মন

0
যৌনকর্মীদের সমবায়ের ২৭ কোটি টাকা টার্নওভার। ১৯৯৫ সালের ২১ জুন ৩০ হাজার টাকা পুঁজিতে গঠিত হয়েছিল এশিয়ায় এপর্যন্ত প্রথম ও একমাত্র যৌনকর্মীদের সমবায় সংস্থা ঊষা মাল্টিপার্পাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড। সেইসময় সদস্য ছিলেন মোট ১৩জন যৌনকর্মী।

এখন সারা বাংলা জুড়ে সমবায়ের সদস্য সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। কলকাতা ও দিনহাটায় সমবায়ের নিজস্ব অফিস আছে। আরও কয়েকটি অফিস খোলা হচ্ছে বসিরহাট, শেওড়াফুলি, ডোমজুড়, দুর্গাপুর, বিষ্ণুপুর ছাড়াও উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি ও ‌মালদায়। জানা গেল, শুধুমাত্র কলকাতা শহরে ১৪ হাজার মেয়ে যৌনকর্মের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাকিরা ৫১ হাজার মেয়ে ছড়িয়ে রয়েছেন সারা বাংলায়। এই মেয়েদের গত দুদশক আগেও জীবন সম্পর্কে কোনও ইতিবাচক চেতনা ছিল না। তাছাড়া, যৌ‌নকর্মীদের ছেলেমেয়েদের জীবনও বহুক্ষেত্রেই নষ্ট হয়ে যেত। উষা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভের পি আর এডুকেটররা যৌনকর্মীদের ঘরে ঘরে গিয়ে অর্থ সঞ্চয়ের সুফল সম্পর্কে তাঁদের বুঝিয়েছেন। এরপর যৌনকর্মীরা তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজেদের সমবায়ে নিয়মিতভাবে টাকা জমাচ্ছেন। ঊষার ফিনান্স ডিরেক্টর শান্তনু চ্যাটার্জি জানালেন, যৌনকর্মীরা পুরনো অভ্যাস পাল্টে ফেলেছেন। সঞ্চয়ের সুঅভ্যাস এখন ওঁদের প্রায় সবারই। যাঁরা নিয়মিত এসে টাকা জমা দিতে পারবেন না, তাঁদের কাছ থেকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে টাকা নিয়ে আসবেন কালেক্টররা। ২৮জন তরুণ-তরুণী কালেক্টরের কাজ করেন। এঁরা সকলেই যৌনকর্মীদের সন্তান।

যৌনকর্মীরা কোন খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেন, তা দেখলেই বোঝা যাবে যৌনকর্মীরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি চেতনাসম্পন্ন। প্রতি ১০০ টি ঋণের ভিতর ৪৮টির ক্ষেত্রেই যৌনকর্মীরা সমবায় থেকে ঋণ নিচ্ছেন তাঁদের ছেলেমেয়ের শিক্ষাখাতে। এছাড়া, বাড়ি মেরামতির জন্যে ২৫ শতাংশ যৌনকর্মী ঋণ নেন। ৭ শতাংশ যৌনকর্মী ঋণ নেন মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে।

অথচ, দুদশক আগেও সমবায়ের জন্মটাই আটকে যাচ্ছিল। উষার সাধারণ সম্পাদিকা ভারতী দে জানালেন, সমবায় আইনে এক্সআইভি নামে একটি রুল আছে। ওই রুল অনুযায়ী সমবায় তাঁরাই গড়তে পারবেন, যাঁরা চরিত্রবান। প্রশ্ন উঠেছিল, যৌনকর্মীদের চরিত্র বলতে কি কিছু আছে নাকি ওঁরা সকলেই চরিত্রহীনা!

এ প্রসঙ্গটিতে যৌনকর্মীরাই জয়ী হয়েছিলেন। এরপর রাজ্যের সমবায় আইনের এক্সআইভি রুলটি সংশোধন করা হয়। এর জেরে কলকাতায় এশিয়ায় মধ্যে প্রথম উষা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড হিসাবে যৌনকর্মীদের সমবায় আত্মপ্রকাশ করল।

১৩জন যৌনকর্মী সদস্য নিয়ে গঠিত হলেও এক বছর পরে ১৯৯৬ সাল থেকেই উষার ডাকে সাড়া দিতে আরম্ভ করেন কলকাতা শহরের যৌনকর্মীরা। চার বছরের ভিতর সদস্যা সংখ্যা পাঁচশো ছাড়িয়ে যায়। এখন তো জেলাগুলিতেও হু-হু করে বেড়েই চলেছে সদস্যা।

উষা মাল্টিপারপাসে যৌনকর্মীদের জন্য একাধিক সঞ্চয় প্রকল্প আছে। সমবায়ের ফিনান্স ডিরেক্টর শান্তনু জানালেন, আমাদের সদস্যারা মাসিক ১০ হাজার টাকা করেও জমান। সমবায়ে ১ লাখ টাকা একদিনের জন্য রাখলে সমবায় থেকে ৪ শতাংশ সুদ পেতে পারেন ওঁরা।

বারুইপুরে সমবায়ের নিজস্ব কৃষিজমি রয়েছে। সেখানে চাষাবাদ হয়। ধান, সব্জি চাষ করেও সমবায়ের কাছে আসে মোটা টাকা।

এভাবে সত্যিই পাল্টে যাচ্ছে যৌনকর্মীদের পুরনো ক্লেদাক্ত জীবন। বহু যৌনকর্মীই একটা বয়সের পর নিঃসহায়ভাবে ভিক্ষান্ন ভোজন করতে বাধ্য হতেন। এখন সমবায় মাথার ওপর থাকায় ওঁরা উপলব্ধি করছেন, না খেতে পেয়ে আর কখনওই মরতে হবে না।

আরও পড়ুন

  1. দেশের যৌবন শুনছে বিবেকের উপদেশ
  2. লক্ষ্য মহিলা সুরক্ষা,ছুটছে তিনকন্যার ‘সেফসিটি’
  3. মাদকের বিরুদ্ধে সোনাগাছির যৌনকর্মীদের জেহাদ

Related Stories