OraStays এর নমিতার সামনে এখন পনের কোটির মাইলস্টোন

1

কলকাতার স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে অনেক মহিলা উদ্যোগপতিই দুর্দান্ত ব্যবসা করছেন। সাফল্য পাচ্ছেন। শূন্য থেকে শুরু করে আজ কয়েকশ কোটি টাকার ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন কেবলমাত্র নিজের প্রয়াসে, এমন মহিলা উদ্যোগপতিদের অভাব নেই। আবার এমন অনেকে আছেন যারা চেষ্টা করছেন মাথা তোলার। অসম লড়াইয়ে ভীষণ লড়ছেন। কেউ কেউ আছেন সিরিয়াল আন্ত্রেপ্রেনিওর। একটা ব্যবসা দাঁড় করিয়েই থেমে থাকেন না। নতুন কোনও ব্যবসায় মন দেন। নতুন দিগন্তের দিকে ছোটেন। এরকম অনেক মহিলা উদ্যোগপতিই আমাদের চোখে পড়ছে। আজ তেমনই একজন মহিলার কথা বলব। যিনি শুরু করেছিলেন গৃহবধূ হিসেবে। তারপর একটু একটু করে মেলে ধরেছেন তার প্রতিভা। তিনি নমিতা নায়েক। জন্মসূত্রে ওড়িশার মেয়ে। বিয়ে হয় কলকাতায় তথ্য প্রযুক্তি সংস্থার এক কর্মীর সঙ্গে। ২০১১ সালে।

ছোটবেলা থেকেই নমিতা চেয়েছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে। ভুবনেশ্বরের মেয়েটি পড়াশুনোয় বেশ ভালো। পড়েছেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। ছোট ভাই আর বাবা মা। এটুকুই শৈশব ছিল। বাবা চাকুরীজীবী ছিলেন। ফলে চাকুরীজীবীর জীবন ওঁর দেখা। সরস্বতীর আরাধনা করতে করতেই বাবা মেয়েকে শিখিয়েছিলেন লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু লক্ষ্মীর আরাধনার পথটাই বরাবর টেনেছে নমিতাকে। তাই ব্যবসা। 

২০০৯ সাল নাগাদ শুরু করেন টেলিকম সংস্থার হয়ে প্রথম ব্যবসা। জিএসএম টাওয়ারের অ্যান্টেনা লাগানোর কাজ। ইউনিনর সংস্থার হাত ধরে ব্যবসা শুরু। বছর দেড়েক ওড়িশার বিভিন্ন ছোটবড় শহরে চুটিয়ে ব্যবসা করেন নমিতা। সেই সময় ব্যবসার মূল মন্ত্র যে মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার সেটা দ্রুত শিখে ফেলেন। জনসংযোগ করতেও দারুণ ভালোবাসতেন। ২০১১ সালে বিয়ের আগেই ইউনিনর সংস্থা ব্যাকফুটে চলে যায়। আর ব্যবসাতেও ইতি টানতে বাধ্য হন নমিতা নায়েক। কলকাতায় আসার পর নতুন করে আবার ভাবতে থাকেন। এই ব্যস্ত শহরের সমস্যাগুলো বুঝতে শুরু করেন। দেখেন এত মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে আসছেন কলকাতায় কাজের সন্ধানে। কিন্তু থাকার জন্যে কোনও নির্দিষ্ট বন্দোবস্ত নেই। কোনও সুস্থির ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে আইটি সেক্টরে যারা কাজ করেন, কিংবা লেখাপড়া করতে যারা জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কলকাতায় আসেন তাদের অবস্থা বেশ খারাপ। যে যার মত বাড়ি ভাড়া খুঁজছেন। একটা ফ্ল্যাটে চারটে বন্ধু একসঙ্গে থাকার জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। থাকার ব্যবস্থা না হয় হল কিন্তু বাকিটা! খাওয়া! লন্ড্রি! বিছানা পত্র সব নতুন করে ব্যবস্থা করা মানে নতুন করে সংসার পেতে বসা। এই অসুবিধের কথা মাথায় আসতেই সমাধানের ছকটাও ভেসে ওঠে। 

মাত্র তিনটে ঘর আর আটজন কাস্টমার নিয়ে শুরু হয় হোমস্টের বিজনেস। এই কলকাতায়। ২০১৩ সাল। প্রথম থেকেই নমিতার দাদা বিজয় সিনহা ওর সঙ্গে ছিলেন। স্বামীর সহযোগিতাও পেয়েছেন নমিতা। সব মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়াটা সোজা হয়েছে। প্রথম দিকে এই স্টার্টআপটির নাম ছিল সিনহাস হোম।

শুরু থেকেই ওদের মাথায় ছিল কাস্টমারদের সুযোগ সুবিধে দেওয়ার বিষয়টা। যেমন ধরুন, ওয়াইফাই, টিভি, ওয়াশিংমেশিন এবং রেফ্রিজারেটর, ঠিকঠাক পরিচ্ছন্ন বিছানা আর সাজানো গুছনো স্বাস্থ্যকর ঘর। পরিচ্ছন্নতার খেয়াল বেশি করেই রাখতেন ওরা। কাস্টমারদের জন্যে রেটটাও অন্যান্যদের তুলনায় কম রাখতেন। এক এক করে বাড়তে থাকে কাস্টমার। বাড়তে থাকে কলকাতায় ওদের প্রপার্টি। ব্যবসাও বাড়ে। ছড়িয়ে পড়তে থাকে একটি শহর থেকে অন্য শহরে। এখন এই চার বছরে কোম্পানির ভোলই বদলে গিয়েছে। সিনহাস হোম নামটাও এখন বদলে হয়েছে OraStays, নমিতা বলছিলেন এই বদলের মাইলস্টোনগুলো। 

বলছিলেন শুরুতে খুব বেশি টাকার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু যখন ব্যবসা বাড়তে থাকে তখন ২০১৪ সালে গিয়ে একটি আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে ওরা প্রথম ধার নেন। তাও মাত্র নব্বই হাজার টাকা। আর এখন ব্যবসা রীতিমত ফুলে ফেঁপে কলাগাছ। বার্ষিক টার্ন ওভার দেড় কোটি টাকা। 

দেড়শরও বেশি ঘর ম্যানেজ করেন ওরা। গোটা দেশে ওদের পরিষেবা ব্যবহার করেছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ। বিজয় নিজে দীর্ঘদিন দেশে বিদেশে কাজ করেছেন হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিতে। বিদেশি ক্রুজের হসপিটালিটি সামলেছেন। সেই অভিজ্ঞতাটাও কাজে লেগে গেছে ওরা স্টের ক্ষেত্রে। এখন তো সুন্দরবনেও কাশ্মীরি সিকারার মতো নৌকোয় থাকার ব্যবস্থা করছেন নমিতারা। তাছাড়া আপনি যেখানেই বেড়াতে যান না কেন সেখানেই ওরাস্টের ঘর পেতে পারেন। যেমন ধরুন দীঘা, তাজপুর, মন্দারমণি কিংবা শান্তিনিকেতন। পরিচ্ছন্ন আধুনিক এবং সমস্ত পরিষেবা পাবেন ওদের এই ওরাস্টেতে। ওদের অ্যাপ আছে। খুব শিগগিরই আরও আধুনিক হচ্ছে সেই ওয়েব অ্যাপ। সেখানেই আপনি বুক করতে পারবেন আপনার পছন্দ সই ঘর। অনলাইনেই বুক হয়ে যাবে অপরিচিত শহরে আপনার নিশ্চিন্তের আস্তানা। কলকাতা ছাড়া মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, দিল্লি সর্বত্রই প্রায় ওদের উজ্জ্বল উপস্থিতি রয়েছে। ক্রমাগত বাড়ছে ওদের পরিধি। 

এখন আধুনিক টেকনোলজি ব্যবহার করে ব্যবসাকে দশগুণ বাড়াতে মরিয়া নমিতা আর তাঁর ভাই বিজয়। প্রযুক্তির দিকটা দেখছে কলকাতারই আরও এক কৃতী স্টার্টআপ মায়াবিয়াস গ্রুপ। মায়াবিয়াসের কর্ণধার অখিল বন্ধু পাল বলছিলেন, ওরাস্টের জন্যে ওয়ানটাচ সলিউশন নিয়ে আসছেন ওঁরা। ফলে শুধু উপভোক্তা নন, যার ফাঁকা জায়গা রয়েছে তিনিও চাইলে ওরাস্টের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। ঘর ভাড়া দিতে পারবেন। কেন্দ্রীয় সরকারি স্টার্টআপ ইন্ডিয়া স্কিমে ওরাস্টে একটি নথিভুক্ত স্টার্টআপ। 

আত্মবিশ্বাসী নমিতার সাফ কথা নতুন প্রযুক্তি ওদের আরও শক্তিশালী করছে। ফলে ২০১৮ সালের মধ্যে এক লক্ষ রুম, পনের হাজার ঠিকানা লিস্ট করতে চান ওরা। দেড় কোটির টার্ন ওভার বাড়িয়ে পনের কোটিতে নিয়ে যেতে চান এই মহিলা উদ্যোগপতি।