'রিথিঙ্ক'-এর মাধ্যমে সাইবার বুলিইং রুখতে চান ১৫ বছরের তৃষা

0

২০১৩ সালের কথা - স্কুল থেকে ফিরেই খবরের কাগজে এক মর্মান্তিক ঘটনার কথা পড়ল তৃষা প্রভু। সাইবার বুলিইং সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে ১১ বছরের এক বালিকা। "যাও তুমি মরে যাও। কেন তুমি এখনও বেঁচে আছ? তুমি অত্যন্ত কুৎসিত।" সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা এমনই কয়েকটি বাক্য কেড়ে নিয়েছিল এগারো বছরের রেবেকা সেডউইক-এর প্রাণ। "আমি খবরটি পড়ে দুঃখ পেয়েছিলাম, মর্মাহত হয়েছিলাম। আমার খুব রাগ হয়েছিল। আমার থেকেও ছোট একটি মেয়েকে কীভাবে কেউ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারল? তখন থেকেই আমি ভাবতে শুরু করলাম, এমন কী করা যায় যাতে এধরণের ঘটনা আর না ঘটে," জানালেন তৃষা।

http://cdn2.yourstory.com/wp-content/uploads/2015/11/Rebecca-Sedwick.jpg

এই ঘটনার ঠিক পাঁচ বছর আগে, তাঁর জীবনেও এরকমই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল।"আমার যখন দশ বছর বয়স সেইসময় এক পথ দুর্ঘটনায় আমার মাসির মৃত্যু হয়। গাড়ি চালাতে চালাতে অমনযোগী হয়ে পড়ার ফলেই দুর্ঘটনা ঘটেছিল," বললেন তৃষা। শিশুমন অনেক সময় দুঃখ ভুলে থাকার জন্য দারুণ সব সৃজনশীল পদ্ধতি বেছে নেয়। তৃষা বেছে নিয়েছিল রিসার্চ-কে। "মানুষের ব্রেনের কাজ করার পদ্ধতি আমাকে অভিভূত করত। আমি স্কুলের একটি প্রজেক্টে এমন এক সফ্টওয়্যার তৈরী করেছিলাম, যা কোনও মানুষ মনযোগী এবং অমনযোগী - এই দুই অবস্থায়প্রতিক্রিয়া দিতে কত সময় নেয় তা ধরতে পারে।"

বেশ কিছু বছর পর ওই মেয়েটির আত্মহত্যার খবর পড়ে এবিষয়ে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ামাত্র অতীতের সেই পন্থাই আবার অবলম্বন করলেন তৃষা। তিনি জানালেন, "মানুষের মস্তিষ্কের গোপন কথা জানতে চাওয়ার ইচ্ছে থেকেই আমি 'রিথিঙ্ক' সফ্টওয়্যারটি বানানোর পরিকল্পনা করি। এই সফ্টওয়্যার সাইবার বুলিং এর মতো ঘটনা, যা গোটা বিশ্বজুড়ে ঘটে চলেছে, তার মোকাবিলা করতে সক্ষম।"

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকা এই সমস্যার মোকাবিলা করতে নেমে বিষয়টি নিয়ে পড়াশুনো শুরু করেন তৃষা। "এভাবে ইন্টারনেটে অপদস্থ হওয়া এবং তা থেকে অব্যাহতি পেতে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত - বিষয়টি জানার পরই আমার মাথায় প্রথম যে প্রশ্নটি উঁকি দিতে থাকে তা হল, ঠিক কোন কারণে অল্পবয়সী এই ছেলেমেয়েরা একে অপরের বিরুদ্ধে ইন্টারনেটে কুরুচিকর মন্তব্য করছে? ওইবছর স্কুলের বিজ্ঞানমেলায় আমি প্রাথমিকভাবে একটি প্রজেক্ট তৈরী করি। প্রজেক্টের বিষয় ছিল, ইন্টারনেটে কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্য করে মেসেজ পোস্ট করার বিষয়টি কি আসলে মানুষের বয়সের উপর নির্ভর করে? এই প্রকল্পের ফলাফল আমাকে অবাক করেনি।প্রজেক্টে প্রমাণ হয়ে যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই প্রবণতা অন্তত ৫০ শতাংশ বেশি।"

এই বিষয়ে রিসার্চ করতে গিয়ে একটি বিষয় তৃষার নজরে পড়ে। "মানুষের মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ (প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স)-এর গঠন সম্পূর্ণ হতে ২৫ বছর সময় লাগে। এবং আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এই বিশেষ অংশের উপরই নির্ভর করে। এই জায়গাতেই খটকা লাগে তৃষার। তাহলে কি এই কারণেই অল্পবয়সীরা খুব বেশি ভাবনাচিন্তা না করেই যেকোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন? ইন্টারনেটে দুঃখজনক মেসেজ পোস্ট করার কারনও কি এটাই?" সাইবার বুলিইং এর মোকাবিলা করতে এই প্রশ্নটিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা ভাবতে শুরু করলেন তৃষা।

টিনএজ ব্রেনের এই অস্থিরতার বিষয়টির কথা মাথায় রেখেই বানানো হয়েছে 'রিথিঙ্ক' সফ্টওয়্যার। ভাবনাচিন্তা না করেই কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা এবং তার ফলে চরম কোনও পরিণতি - এই বিষয়টি আটকাতে চায় এই সফ্টওয়্যার। তৃষার রিসার্চ বলছে, অন্তত ৯৩ শতাংশ ক্ষেত্রে যদি টিনএজাররা তাঁদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আরও একবার ভেবে দেখার সুযোগ পেতেন তাহলে তা বদল করতেন। 'রিথিঙ্ক' এই ৯৩ শতাংশকে বাস্তবে পরিণত করতে চায়। 

কিন্তু টিনএজার-রা তাদের মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারে হঠাৎ 'রিথিঙ্ক'-এর মতো সফ্টওয়্যার ইনস্টল করতে চাইবেন কেন? তৃষার মতে, 'রিথিঙ্ক' কেবলমাত্র একটি অ্যাপ নয়। এটি একটি মুভমেন্ট। যে মুভমেন্টে সামিল হয়েছেন শিক্ষক এবং অভিভাবকরা।‌

https://youtu.be/YkzwHuf6C2U

রেবেকা নামের সেই বছর এগারোর মেয়েটি, যার আত্মহত্যা থেকে জন্ম এই উদ্যোগের - নিজের শহরের ওয়াটার টাওয়ার থেকে ঝাঁপ দেওয়ার আগে দেড় বছর ধরে নানাভাবে উত্যক্ত এবং অপদস্থ করা হয়েছিল তাকে। অস্থিরচিত্তে নিয়ে ফেলা কোনও হঠকারী সিদ্ধান্ত আটকাতে চায় 'রিথিঙ্ক'। কিন্তু দেড় বছর ধরে যখন এধরণের কোনও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটতে থাকে তখন তা আর যাই হোক, হঠাৎ করে ঘটে না। সেক্ষেত্রে 'রিথিঙ্ক' কীভাবে এর সমাধান করবে?

তৃষা জানেন যে সব সাইবারবুলিং-এর প্রতিটি ক্ষেত্রই হঠাৎ করে করে ফেলা কোনও পদক্ষেপ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পরিকল্পনামাফিক কাউকে হেনস্থা করা হয়ে থাকে। মানুষের অসৎ প্রবৃত্তি ঠেকাতে একটি সফ্টওয়্যার হয়তো কোনওভাবেই কার্যকরী হবে না। কিন্তু মানুষের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছনোর কাজে তা নিশ্চয় ব্যবহার করা যেতে পারে। 'রিথিঙ্ক' ব্যবহারে পরিবর্তনের একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। নিজেদের বিবেকের দংশন অনুভব করলে অনেক অন্যায়কারীই সেই অন্যায় করা থেকে নিজেকে বিরত করার চেষ্টা করে, অথবা অন্যায় করার আগে অন্তত একবার ভেবে দেখে।

কিন্তু এক্ষেত্রেও একটা বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কেন কোনও অপরাধী 'রিথিঙ্ক' ব্যবহার করে নিজের অপরাধ শোধরানোর পথে হাঁটবেন? তৃষা বলছেন, 'রিথিঙ্ক' এর মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির মূল লক্ষ্যই হলেন অবিভাবক এবং শিক্ষক বা শিক্ষাবিদরা। "আমরা চাই শিশুরা তাদের বন্ধুদের পাশে দাঁড়াতে, তাদের জন্য লড়াই করতে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শিখুক। কিন্তু চাইলেই তো সব সম্ভব হয় না। প্রাথমিকভাবে আমরা অভিভাবক এবং শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে পেরেন্টাল কন্ট্রোলের পরিবর্ত হিসেবে 'রিথিঙ্ক' ব্যবহার করার পরামর্শ দিই। রাতে লুকিয়ে আপনার বাচ্চার ফোন দেখা, বা সে সোশ্যাল মিডিয়ায় কী করছে সে বিষয়ে আদৌ মাথা না ঘামানো কোনও কাজের কথা নয়। ভালো ব্যবহার, ভাবনাচিন্তায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি শিশু কী করছে বা করছে না অর্থাৎ তার অ্যাকাউন্টেবিলিটির বিষয়টিও লক্ষ্য রাখে 'রিথিঙ্ক'।"

নিজের রিসার্চের কাজ এবং 'রিথিঙ্ক' এর সিইও হওয়ার পাশাপাশি ইতিমধ্যেই চারটি বই লিখে ফেলেছেন তৃষা। তাঁর কাছে কম বয়স কোনও বাধাই নয়। বরং তৃষা মনে করেন, তাঁর বয়স ১৫ বলেই তিনি এভাবে ভাবতে পেরেছেন। এবিষয়ে কাজ করতে পেরেছেন। "আমার যখন সাত বছর বয়স সেই সময় জলবায়ুর পরিবর্তন এবং তার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্টের লেখা একটি বই পড়ি আমি। আমার মনে হতে থাকে, সব বরফ যদি গলে যায় তাহলে তো পাহাড়ের জন্তুরা বাঁচতে পারবে না। সঙ্গে সঙ্গে আমার শহর নেপারভিলের মেয়রকে কিয়োটো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আমি চিঠি লিখি। আমার কম বয়স কখনও কোনও কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং কোনও সমস্যার ছকে বাঁধা সমাধানের বাইরে গিয়েও সে বিষয়ে আমাকে ভাবতে শিখেয়েছে আমার এই বয়স, " বললেন তৃষা।

ছাত্রছাত্রীদের পকেট মানি জমিয়ে নিজেদের স্টার্ট আপে বিনিয়োগের বিষয়টি নতুন নয়। তৃষা প্রভু তার চেয়ে আরও একধাপ এগিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় জেতা অর্থের পুরোটাই বিনিয়োগ করেছেন নিজের 'রিথিঙ্ক' প্রজেক্টকে বাস্তবায়িত করতে। 'রিথিঙ্ক' সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রশংসিত হয়েছে। তৃষা TED-এর একজন স্পিকার এবং গুগল সায়েন্স ফোয়ারের ফাইনালিস্টও নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু এই সব স্বীকৃতিকে ছাপিয়ে তৃষার নিজের দুটি ভালোলাগার বিষয় রয়েছে: "আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকার কাছ থেকে একটি হাতে লেখা চিঠি পেয়েছিলাম। চিঠিতে তিনি জানান কীভাবে তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক সৎ মেয়ে তাঁকে সাইবার দুনিয়ায় বিভিন্নভাবে হেনস্থা করছে। তিনি লিখেছিলেন যে 'রিথিঙ্ক' শুধু ছোটদের নয়, বড়দের জন্যও সমানভাবে জরুরি। আর একবার একটি মেয়ে আমাকে ই-মেল করে ধন্যবাদ জানিয়েছিল। তার এক বান্ধবী সাইবার বুলিইং-এর শিকার হয় এবং সে নিজের হাতের শিরা কেটে ফেলার চেষ্টা করে। সাইবার বুলিইং-এর মতো সমস্যা নিয়ে সরব হওয়ার জন্য আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিল মেয়েটি, " জানালেন তৃষা।

ইংরেজীর পাশাপাশি অন্য়ান্য ভাষাতেও 'রিথিঙ্ক' প্রকাশ করার কথা ভাবছেন তৃষা। পৃথিবীর প্রত্যেক প্রান্তে কিশোর-কিশোরীদের হাতে নিখরচায় এই পরিষেবা তুলে দিতে চান তিনি। অল্প বয়সে নিজের কাজের জন্য প্রশংসা কুড়িয়েছেন, সম্মানিত হয়েছেন তৃষা। তবে প্রচারের আলোয় তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে যায়নি। বরং সুপরিকল্পিতভাবেই নিজেকে প্রচার থেকে খানিকটা দূরেই সরিয়ে রেখেছেন তিনি। 'রিথিঙ্ক'-এই তাঁর উদ্যম থেমে যায়নি। বরং তিনি সর্বক্ষণ ভেবে চলেছেন, কীভাবে এই কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, কীভাবে এর পাশাপাশি আরও নতুন কিছু করা যায়।

জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও দেখেছেন তৃষা। আর সেই কারণেই মাটি থেকে তাঁর পা সরে যায়নি। "আমি পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়াতে জানি। আমি জানি কোনও কাজ শুরু করলে তার অন্তিম পরিণতি, বা সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি ওই কাজ করতে গিয়ে নতুন করে কী কী শিখলাম, জানলাম সেই বিষয়টা।" স্কুলে তৃষার পছন্দের বিষয় ইংরেজী, ইতিহাস এবং বিজ্ঞান। তবে বড় হয়ে ঠিক কী করতে চান তা এখনও ভেবে দেখেননি তিনি। "আমার ব্রেন সায়েন্সেস পছন্দ। হয়তো কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সেস নিয়ে পড়াশুনো করব। কিন্তু আমার চারপাশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারাটাই আমার কাছে মূল বিষয়। একজন চেঞ্জ এজেন্ট এবং সোশ্যাল অন্ত্রেপ্রেনিওর হিসেবে যদি আমি এই পৃথিবীতে ছোট,বড় কোনওরকম পরিবর্তন আনতে পারি তাহলে বুঝব আমি সঠিক পথে এগোচ্ছি," বলছেন তৃষা।

ছোট, বড় সকলের জন্যই তৃষার বার্তা, "নতুন কিছু ভাবার জন্য সাদা ল্যাবকোট পরা বা অ্যালবার্ট আইনস্টাইন হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। নিজের চারপাশে দেখুন, এমন কোনও সমস্যা খুঁজে বের করুন, যার আপনি সত্যিই সমাধান করতে চান। লক্ষ্য স্থির রেখে কঠোর পরিশ্রম করুন - দেখবেন, আপনার সাফল্য আপনাকে নিজেকেই অবাক করবে।"

লেখা - রাখী চক্রবর্তী

অনুবাদ - বিদিশা ব্যানার্জী