পুণের রাস্তায় বিক্রি হচ্ছে কলকাতার রোল

0

কলকাতার রক আর রোল দুইয়েতেই যাদু আছে। রকে বসে আড্ডা মারা আর রোল চেবানো বাঙালি কি বড়া-ছোটা-মজলি পাওয়ে খুশি হতে পারে! এমনটাই হয়েছিল কাজের সূত্রে পূনে যাওয়া একটি বাঙালি তরুণের সঙ্গে। আর সব সমস্যার সমাধানও বাঙালির মগজে সহজেই খেলে যায়। তাই ই হল। শুনুন সেই গল্প।

সিদ্ধার্থ যোশী এবং বিশ্বনাথ চক্রবর্তী
সিদ্ধার্থ যোশী এবং বিশ্বনাথ চক্রবর্তী

বাঙালির খেতে এবং খাওয়াতে ভালোবাসার গল্প সবাই জানেন। কিন্তু ব্যবসা করার গল্প কেউ কেউ জানেন। যেমন আমরা জানতে পারলাম বিশ্বনাথের ইটসাম তৈরির মজার গল্প। 

কলকাতার ছেলে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী। পেশায় মেটালার্জিকাল ইঞ্জিনিয়ার। কর্মসূত্রে পুণেতে থাকতে শুরু করেন। বিকেল হলেই ছোট্ট খিদেয় ঘুরে মরতেন। পাও ভাজি আর ইডলি ডোসা, কাটিং চা-এ একেবারে অরুচির রুটিন। মাঝেমধ্যেই মুখোরোচক তেলেভাজা আর রোলের জন্য তাঁর মন কেমন করত।

এখানেই বিশ্বনাথের সঙ্গে পরিচয় হয় সিদ্ধার্থ যোশীর। গোয়ার ব্যবসায়ী। সবথেকে বড় পরিচয় সিদ্ধার্থও দারুণ খাদ্যরসিক। ওদের পারিবারিক ব্যবসা থাকলেও তাঁর ইচ্ছে ছিল খাবারের ব্যবসা করার। বিশ্বনাথও ঝাল ঝোল রোল তেলেভাজা মিস করতেন। 

'দুজনেই খেতে ভালোবাসি। মাঝেমধ্যেই আমরা নতুন নতুন জায়গায় খেতে যেতাম। নিজেদের পছন্দের খাবার নিয়ে আলোচনাও হতো। এভাবেই নিজেদের মতো করে কিছু একটা গড়ে তোলার পরিকল্পনা মাথায় আসে। প্রথম থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল, কম খরচে মানুষকে সুস্বাদু খাবার দিতে পারা।' বললেন সিদ্ধার্থ যোশী। 

২০১২ সালে দুই বন্ধু একটি ফুড চেন খোলার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম থেকেই ঠিক করেন তাঁরা নানাধরণের রোল এবং ব়্যাপ বিক্রি করবেন। লক্ষ্য ছিল পথচলতি মানুষ যাতে যে কোনও সময় চটজলদি অল্প কিছু খেতে পারেন। সেই কারণেই ভেবে চিন্তে নাম রাখা হয় 'eatsome'। তখনও তাঁরা জানতেন না, কয়েক বছরের মধ্যেই পুণের ফেভারিট হয়ে উঠবে তাঁদের ব্র্যান্ডের রোল এবং ব়্যাপ। এখন পুণেতে ১৬টি ফুড জয়েন্ট রয়েছে 'eatsome' এর। তবে অন্যান্য সব খাবার ছাপিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে এসেছে রোল-ই।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যাঁরা রেস্তোরাঁ বা ফুড জয়েন্ট খোলার চেষ্টা করছেন, তাঁদের এধরণের জায়গায় কাজের বা ব্যবসার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে বিশ্বনাথ বা সিদ্ধার্থ কেউই এই ব্যবসা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। যদিও দুজনেই খেতে ভালোবাসেন। প্রথম ধাপে পুণে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে আটটি আউটলেট খোলার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। নিজেদের পছন্দের কথা মাথায় রেখেই দুজন মিলে মেনু ঠিক করেন। সিদ্ধার্থ বলেন, 'আমরা সবসময়ই যে খাবারে স্বচ্ছন্দবোধ করি তা-ই খেতে ভালোবাসি। গ্রাহকেরা যে তাই চাইবেন তা আমরা জানতাম। যদি এমন কোনও খাবার হয় যা আমাদের ছোটবেলার বা বাড়ির কথা মনে করিয়ে দেয় তাহলে তো কথাই নেই।মনে পড়ে গেল তাড়াহুড়োয় বেরনোর সময় মায়ের তৈরি সবজি পরোটায় মুড়ে কেচাপ দিয়ে খাওয়ার কথা। বা কখনও কখনও একইভাবে পরোটার মধ্যে ডিমভাজা দিয়ে খাওয়া।' এর থেকেই মাথায় আসে হরেকরকম রোল এবং র্যাপ তৈরির কথা। এর ফলে কম খরচে, অল্প সময়ে খাওয়ায় হয় আবার পেটও ভরে।

রোল এবং র্যাপের পাশাপাশি এখন বিরিয়ানি, পরোটা, কাবাব, কারি এবং বিভিন্ন প্রকার কম্বো পাওয়া যায়। ভাত, পরোটা অথবা র্যাপ কম্বো পাওয়া যায় ২০০ টাকার মধ্যে। বিশ্বনাথ এবং সিদ্ধার্থ দুজনেই নিজেদের ব্র্যান্ডের র্যাপ খেতে পছন্দ করেন। সপ্তাহে অন্তত একবার এখানকার কোনও রোল বা র্যাপ তাঁর খান। তবে দুজনেরই ফেভারিট কিন্তু Buttered rice combo। মাখন দেওয়া বাসমতি চালের ভাত এবং তার সঙ্গে ক্রেতার পছন্দের কোনও এক ধরণের কাবাব সার্ভ করা হয়। র্যাপেরর ক্ষেত্রে বিশ্বনাথের পছন্দ Mutton Boti Wrap। আবার সিদ্ধার্থ বেশি পছন্দ করেন Mixed Veg Wrap এবং Reshmi Kebab Wrap খেতে। জিভে জল আনা এইসব খাবার গত তিন বছরে জায়গা করে নিয়েছে পুণের মানুষের মনে।

এখন পুণেতে 'eatsome'এর ১৬টি শাখা রয়েছে। বাইরের কোনও আর্থিক সাহায্য ছাড়াই নিজেদের ব্যবসা থেকে আসা অর্থ দিয়ে পরের আটটি শাখা খুলতে পেরেছেন সিদ্ধার্থ এবং বিশ্বনাথ। তাঁদের অধিকাংশ ফুড জয়েন্টই কলেজ, হস্টেল এবং বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থার অফিসের কাছাকাছি অবস্থিত। এখন প্রতিদিন অন্তত ৭,০০০ র্যাপ বিক্রি করে 'eatsome'। অন্যান্য খাবারেরও প্রায় ৩,০০০ অর্ডার আসে।

ধীরে ধীরে পুণেবাসীর মনে যেভাবে জায়গা করে নিয়েছে এই সংস্থা তাতে এই শহরেই আরও কয়েকটি শাখা খুলতে আগ্রহী সিদ্ধার্থ যোশী এবং বিশ্বনাথ চক্রবর্তী। সম্প্রতি হায়দারাবাদেও শাখা খুলেছে 'eatsome'। ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য শহরেও পৌঁছতে চায় এই সংস্থা।

'আমরা আগে ছোট জায়গায় নিজেদের প্রমাণ করতে চাই। বড় যায়গায় এগোতে গিয়ে ভুল পদক্ষেপ করতে চাই না। এখানকার ব্যবসা থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তবেই বৃহত্তর জায়গায় এগোব। তা নাহলে উদ্যোগ সফল হবে না।' জানালেন সিদ্ধার্থ।