ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের জন্য ৬.৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ ১৭ বছরের যুবকের

0

১৭ বছর, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখার সময়, স্বপ্ন দেখার সময়, সমাজের জন্য কিছু করার স্বপ্ন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন, স্বপ্ন আকাশটাকে ছুঁয়ে ফেলার। শীল সোনেজি, বেঙ্গালুরুর সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ এই যুবকের স্বপ্নগুলিও মিলে যায় সমবয়েসী আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের সঙ্গে, কিন্তু সে আলাদা, আলাদা কারণ তার স্বপ্নগুলি দাঁড়িয়ে বাস্তবের শক্ত জমির ওপর, আবেগের সঙ্গে সেখানে মিলেছে বুদ্ধি, পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়। যে অধ্যাবসায়কে সঙ্গী করে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের পড়াশোনার জন্য ৬.৫ লক্ষ টাকা তুলে ফেলেছ সে।

ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময় International Baccalaureate এর শিক্ষাক্রম অনুযায়ী বাধা ধরা পড়াশোনার পাশাপাশি নানা ধরণের কাজে যুক্ত হতে হয় ছাত্রদের। শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবেই ইলেভেনের শুরুতে একটি সরকারি স্কুলে মৌখিক ইংরেজি শিক্ষার ক্লাস নিতে শুরু করে শীল ও তার সহপাঠীরা। স্থানীয় ভাষা না জানাতে সমস্যায় পড়তে হয় শীলকে, কিন্তু প্রাথমিক সেই বাধা কাটিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই ইংরেজির পাশাপাশি ফুটবল, বৈদিক অঙ্ক, অরিগ্যামি, নাচ ইত্যাদির মতো নানা বিষয় নিয়ে বাচ্চাদের সঙ্গে জমে ওঠে আড্ডা। কাজটা এতোটাই পছন্দ হয়ে যায় যে নিজের ছুটির সময়টাও এই কাজটা চালিয়ে যেতে চায় শীল, কিন্তু স্কুলটি নির্বাচন-কেন্দ্র হওয়ায় তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই ধরণের কাজ করে এরকম এনজিও-এর খোঁজ চালাতে থাকে শীল, ইন্টারনেটে পেয়ে যায় বেশ কিছু যোগাযোগ, তার মধ্যে থেকেই সমীক্ষা ফাউন্ডেশনকে বেছে নেয় সে, কাজ, কিদওয়াই মেমোরিয়াল হাসপাতাল, বেঙ্গালুরুতে চিকিত্সাধীন ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের ইংরেজি শিক্ষাদান। এই অভিজ্ঞতাই মোড় ঘুরিয়ে দেয় শীলের জীবনের।

“ওদের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় অদ্ভুত একটা বন্ধন টের পেতাম, ভিতর থেকে গড়ে ওঠা এক বন্ধন, ওদের জন্য কিছু একটা করার ইচ্ছেটা জোরালো হয়,” বললেন শীল। শুরু করে দেয় পরিকল্পনা, ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের পড়াশোনার জন্য অর্থ সংগ্রহ বেঙ্গালুরুর প্লে অ্যারেনাতে একটি বড় মাপের চ্যারিটি ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ফেলে শীল।

স্কুলে পড়া বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ও রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের শিক্ষা কাজে লাগায়ে শীল। “বিভিন্ন নামী কোম্পানির এইচআর দের লিঙ্কডইন-এ অনুরোধ পাঠাই, বন্ধুদের কিছু দায়িত্ব দিই, আমি আর বন্ধুরা মিলে কলোনির বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনুদান সংগ্রহ করি, মূলত চেকের মাধ্যমে, পরিবর্তে তাঁদের ৮০জি সার্টিফিকেট দেওয়া হয়,” শীল জানাল।

কোনও রকম সমস্যা এড়াতে, টুর্নামেন্টের জন্য UEFA অনুমোদিত কোচকে রেফারি হিসেবে নিয়োগ করে শীল। খেলোয়াড়দের সুরক্ষার বিষয়টিতে সবোর্চ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, চিকিত্সা পরিষেবার সহযোগী হিসেবে থাকে সাকরা ওয়ার্ল্ড হসপিটাল। প্লে অ্যারেনার তরফ থেকে ছাড় ও অন্যান্য সুবিধা দেয় শীলদের। চ্যারিটি টুর্নামেন্টের জন্য টিমগুলি রেজিস্ট্রেশন শুরু করলে বিভিন্ন কর্পোরেট হাউসের কাছে অনুদানের জন্য আবেদন করে শীল।

সর্বোচ্চ অনুদান সংগ্রহের জন্য সবরকমের চেষ্টা চালানো হয়। প্লে-অ্যারেনার ফুটবল টুর্নামেন্ট ও ফ্যামিলি ডে ইভেন্ট, কর্পোরেট অনুদান ও বাড়ি বাড়ি ঘুরে সংগ্রহ করা চাঁদা সব মিলিয়েই ৬.৫ লক্ষ টাকা তুলতে সমর্থ্য হয় তারা।

SportsKeeda এর প্রতিষ্ঠাতা পোরুষ বললেন, “লিঙ্কডইন-এ আমাকে ২-৩ টে মেল পাঠিয়েছিল শীল। প্রতিদিনই স্পনসরশিপ চেয়ে এরকম শয়ে শয়ে মেল আসে, কিন্তু শীলের মেলটা ছিল অন্যকরম। একজন ১৭ বছরের ছেলে কী অসম্ভব নৈপুণ্যের সঙ্গে পুরোটা পরিকল্পনা করেছে। প্রতিটা ছোট ছোট বিষয় মাথায় রেখেছে, অ্যাম্বুলেন্স, মেডিক্যাল পার্টনার সব। বড়রাও এই ধরণের পরিণত পরিকল্পনা করতে পারে না। অনুদান দিতে পারব কি না আমি নিশ্চিত ছিলাম না, কিন্তু ঠিক করে ফেলি ওকে নিয়ে খবর করব। “Keedology” সিরিজে শীলকে নিয়ে খবর করে SportsKeeda, দেখতে এই লিঙ্কে যান।

http://www.sportskeeda.com/football/video-how-teenager-football-raise-rs-6-5-lakhs-cancer-foundation-children

২০১৪ এর নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ফর্ম ফিলআপ করছিল শীল। স্কলারশিপের জন্য ফিন্যানশিয়াল স্টেবিলিটির জায়গায় ছাত্র নিজে কত টাকা দিতে পারবে তা লেখার জায়গা ছিল। “আমার সেখানে কিছু লেখার ছিল না, জায়গাটা ফাঁকাই রেখে দিতে হয়,” বলল শীল। মে, ২০১৫ তে একদিন ব্যাঙ্কে গিয়ে শীল দেখে বাবা-মায়েরা সন্তানের পড়াশোনার জন্য ছাত্রঋণ চাইতে গিয়েছেন ম্যানেজারের কাছে। “আমি বাবাকে বললাম, আমি একটা কাজে যখন টাকা তুলতে পেরেছি তাহলে অন্য কাজে কেন পারব না? নিজের কাছে শপথ করলাম, আমার উচ্চ শিক্ষার জন্য খরচের একটা অংশ আমি নিজে দেব,” জানাল শীল। লক্ষ্যটা ছিল আর একটু বড়, নিজের পায়ে দাঁড়াও, দায়িত্ব নিতে শেখো। “যথেষ্ট পরিমাণ টাকা সংগ্রহ প্রয়োজন ছিল, আমার এই উদ্যোগ যদি আরও কয়েকজনকে উদ্বুদ্ধ করে, তাহলেই এই উদ্যোগ সফল,” বলল শীল। সবকিছু বাদ দিয়ে ১.১ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করতে পারে সে। প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি থেকে স্টার্টআপ সকলেই এই উদ্যোগে অংশ নেয়। ফ্লিপকার্ট, ব্রোকেড, ব্রিসা, সতি, বিলঙ, চিসেল ফিটনেস, গোল্ড’স জিম ইত্যাদি কোম্পানি টাকা দেয়।

বর্তমানে কানাডার ভ্যানকুয়্যারে সিমন ফ্রাসার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে শীল। তবে কী তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের এক উদ্যোগপতি? শীলের উত্তর, “এই সব অভিজ্ঞতাগুলি থেকে আমি শিখছি, আরও বড় পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে। একটি ইভেন্ট অর্গানাইসিং ও ম্যানেজমেন্ট ফার্ম খোলার ইচ্ছে আছে. ভ্যানকুয়্যারে ইভেন্টের আয়োজন করতে পারে সেই কোম্পানি”।

ডেটা অ্যানালিটিকসেও ইন্টার্নশিপ করেছে শীল, শংসাপত্র পেয়েছে ডেল অ্যানালিটিকসের কর্ণধার, ডেকাথেলন ইন্ডিয়ার সিইও এবং ব্রিসার কর্ণধারের থেকে। “ডেটা অ্যানালিটিকসের একটি কোম্পানিও খুলব খুব তাড়াতাড়ি। আগামী দিনে আমি তরুণদের ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করতে চাই, যা সমাজ ও তাদের ব্যক্তিগত জীবনে কাজে লাগে। আমি এমন কাজ করতে চাই যা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বাড়তে সাহায্য করবে এবং অন্যদের উদ্বুদ্ধ করবে,” বলল আত্মপ্রত্যয়ী তরুণ।

Related Stories