প্রজাপতির মতো খোলস ছেড়ে বেরিয়েছে Sood

0

বছর দুয়েকের বেশি হয়ে গেল একটা ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে কলকাতায়। একটা নতুন ব্র্যান্ড। পুরনো খোলস ছাড়িয়ে যেমন করে প্রজাপতি বেরয় তেমনি। ব্র্যান্ডটি কলকাতার ফ্যাশন দুনিয়ায় ভাসছে। কিন্তু খোলসের একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। খোলসের নাম বার্লিংটনস। আর প্রজাপতির নাম সুদ। এটা ওদের পদবী। দেশভাগেরও আগে বৃটিশ সাহেবদের জন্যে লাহোরে তৈরি হয়েছিল সুদদের পোশাক নির্মান বিপণি। দেশভাগের পর ওরা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। ততদিনে বার্লিংটন একটা ব্র্যান্ড হয়ে গিয়েছে। কলকাতাতেও খোলা হয় বার্লিংটনের দোকান। থেকে যান পরিবারের একটা বড় অংশ এই কলকাতায়। ১৯৬৮ সাল থেকে এই ২০১৫ পর্যন্ত সেই বার্লিংটনের লেগাসি চলে। কিন্তু নবীন প্রজন্ম চাইলেন নতুন পরিচিতি। ডানা মেলবার জন্যে নতুন আকাশ। তৈরি হল সুদ। বাবা হরিওম সুদের ছেলে রাতুল সুদ, মূলত বদলে দিলেন খোলনলচে। পার্ক স্ট্রিটের কাছেই সুদের স্যুটিং শার্টিংয়ের দোকানের দরজা ঠেলে ঢুকলেই টের পাবেন আন্তর্জাতিক কলকাতার ছবিটা। শেকড়ের সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান কোনও ভাবেই কাটেনি।

গিলে করা পাঞ্জাবী, সুগন্ধী আতর, কোঁচা মারা ধুতি, ফিটন গাড়ির কলকাতার বাবুয়ানাকেই যেন উসকে দিচ্ছে এযুগের সুদ। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পোশাকের অভিনবত্বেও তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন এই ডিজাইনার। 

কলকাতা ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে ফ্যাশন দুনিয়ার ডেস্টিনেশন। দেশের ফ্যাশন ক্যাপিটাল। ইওরস্টোরি বাংলার পাতায় অন্যান্য স্টার্টআপের পাশাপাশি গুরুত্বের সঙ্গেই প্রকাশিত হচ্ছে কলকাতার ফ্যাশন স্টার্টআপের কাহিনি।

বাইলুম, উইভার্স স্টুডিও কিংবা নয়না জৈনের কাহিনি আপনারা পড়েছেন। পড়ে ফেলেছেন আরও অগুনতি ফ্যাশন ডিজাইনারের জীবন নিয়ে এক্সপেরিমেন্টের কাহিনি। এবার রাতুল সুদের গল্পটাও জেনে রাখুন।

অত্যন্ত ব্যস্ত ডিজাইনার আজ কলকাতা তো কাল ইটালি পরশু নিউইয়র্ক উড়ে বেড়াচ্ছেন। কলকাতায় থাকলে নিয়মিত সুদের স্টোরে আসেন। সেভাবেই দেখা হয়েছিল রাতুলের সঙ্গে। বিদেশের ফ্যাশন উইকে ব়্যাম্প মাতানোর জন্যে তোড়জোড় চলছিল। খুব অল্প আলাপেই বুঝিয়ে দিলেন তাঁর ভাবনার ধার। তিনি চান কলকাতা হোক এমন একটি শহর যেখানে ফ্যাশন দুরস্ত মানুষ আসুক। পোশাক বানাতে। আজকাল ট্রেন্ড হয়েছে, হংকং সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাঙ্কক গেলে বাঙালি স্যুট বানিয়ে আনে। এই ট্রেন্ডের উল্টো ছবিটাই দেখতে চান এই তরুণ ডিজাইনার। চান বাইরে থেকে পর্যটক এলে কলকাতা থেকে বানিয়ে নিয়ে যাক পছন্দের পোশাক। আর তাই সুদ-এর স্টোরে যেকোনও ধরণের কাস্টমাইজড স্যুট বানানোর ব্যবস্থা আছে। ডিজাইনের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ খোলা মনে গ্রহণ করতে চান রাতুল। নিখুঁত ফিটিংস, কাট এবং হাল ফ্যাশন এই ছিল ওদের পুরনো ব্র্যান্ড Burlingtons এর ইউএসপি।

রাতুল নিজেকে অবশ্য‍ ডিজাইনারের থেকে স্টাইলিশ ভাবতে ভালোবাসেন ফ্যাশনে ওর হাতেখড়ি বাড়িতেই। পড়াশুনোর সূত্রে ছোটবেলা কেটেছে দার্জিলিং সেন্ট পলসে। কলেজ সেন্ট জেভিয়ার্স পার্কস্ট্রিট। পারিবারিক ব্যবসা Burlingtons-ই তাঁর মধ্যে প্রথম ফ্যাশনের বীজটি বুনে দেয়। ফ্যাশনে আগ্রহ নিয়েই বড় হয়েছেন। কলেজের পাট চুকিয়ে প্যারিস যান। কাজ করেন Pierre Cardin এর সঙ্গে। ফ্যাশনের খুঁটিনাটি নিয়ে হাতেকলমে শিখে ফেলেন সেখানেই। ৯০ সাল নাগাদ দেশে ফিরেই Burlingtons এর দায়িত্ব সামলান। পুরুষদের পোশাক ডিজাইনের বাজার তুলনামুলক ভাবে ফাঁকা ছিল। রাতুল ঠিক করলেন পুরুষদের পোশাকই ডিজাইন করবেন। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে টের পান আরও বেশি সাহসী হতে হবে। রাতুলের তারুণ্য আর উদ্যম কয়েক দশক পুরনো পারিবারিক ব্যবসাকে নতুন চেহারা দিয়ে দেয়। পাঁচ দশকের পুরনো ব্যবসা, Burlingtons ব্র্যান্ডের নামটাই পাল্টে ফেলেন।

বলছিলেন দেশ ভাগের সময় ওর বড় দাদু লাহোর থেকে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। Burlingtons প্রথমে ওখানেই শুরু হয়। ওখানকার বৃটিশদের কাছে Burlingtons বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই সময়ও টার্গেট কাস্টমার তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে ওরা কলকাতা, বম্বে, দিল্লি ঘুরতে থাকেন। কিন্তু নাম থেকে যায় এক। পরিবারের এক এক জন সদস্য ব্যবসার এক একটা দিক দেখতেন। যদিও নতুন প্রজন্মের সদস্যদের নানা মত। সেই সব ঝামেলা এড়াতে সবার সহমতের ভিত্তিতে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছেন ওরা। তৈরি করেছেন নিজের ব্র্যান্ড Sood। কিন্তু যারা ওদের চেনেন তারা সুদকে পুরনো Burlingtons হিসেবেই দেখেন। বরং ব্র্যান্ডে আনকোরা ইংরেজি নাম ব্যবহারের থেকে নিজেদের পদবী ব্যববহার করলে কিছু ভ্যালু অ্যাড হয় বলে মনে করেন রাতুল। Canali একটা পারিবারিক নাম। Gucci ও তাই। যারা‍ ব্যবসাটাকে গুরুত্ব দেন নিজেদের নাম ব্যবসার সঙ্গে ব্যরবহার করেন। ওরাও সেই পথ অনুসরণ করেছেন।

আর দেখতে গেলে Burlingtons শুধু একটা দোকান ছিল মাত্র। Sood শুধু স্যুট সেলাইয়ের দোকান নয় স্টাইল, ফ্যাব্রিক এবং ক্লোদিংয়ের ওপর সম্পূর্ণ ডিজাইনার ইনপুট দেয়। রাতুল মনে করেন এই নাম বদলটা বছর কুড়ি আগে হলে এতদিনে Burlingtons এর থেকেও আরও নামী ব্র্যান্ড হতে পারত Sood। তার মতে ক্রেতারা আসেন রাতুলের বাবা হরিওম সুদের জন্য কিংবা রাতুলের জন্য। কারণ প্রত্যেক কাস্টমারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করায় বিশ্বাস করেন রাতুল সুদ।

বলছিলেন, ধুমধাম করে নয়, বাজারে এসে প্রায় চুপিসারে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে Armani, Dolce & Gabbana এবং Prada এর মতো বিশ্বের নামজাদা ব্র্যান্ড। এই ব্র্যান্ডগুলিই ওকে প্রেরণা যোগায়। রাতুল মনে করেন পোশাকে ফিটিংসই আসল। “Sood” ইটালিয়ান ফিটের সঙ্গে ভারতীয় ছোঁয়া জুড়ে দিয়ে অন্য ব্র্যান্ড থেকে নিজেকে আলাদা করে নিতে পেরেছেন। তার ওপর স্যুটের ফ্যাব্রিকস আনা হত ইটালির বিখ্যাত ফ্যাশন হাউজ Loro Piana, Vitale Barberis Canonico, Reda, Dormeuil থেকে। জার্মানি থেকে পোশাকের অন্যান্য জিনিসপত্র আনা হলেও এমব্রয়েডারি একেবারের বাংলার শিল্পীদের হাতের। কাশ্মীর থেকে বাংলা সব শিল্পীদের হাতের কাজ পাওয়া যাবে Sood এর পোশাকে।

ইতিমধ্যে তরুণ ডিজাইনার বহু তারকার সঙ্গেও কাজ করে ফেলেছেন। কেকেআর টিম, শাহরুখ খান, শশী থারুর, জয় মেহতা, মনোজ তিওয়ারি এবং আরও অনেকে রয়েছেন তাঁর ক্লায়েন্টের তালিকায়। বাজার বদলাচ্ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিতে সবসময় এক পায়ে খাড়া এই তারুণ্যে ভরা ডিজাইনার।