‘সোশ্যাল অন্ত্রেপ্রেনিওর’ সুদীপের হাত ধরে বায়ো টয়লেটের যাত্রা শুরু রেলে

0

ভারতীয় রেলের সঙ্গে কয়েক দশকের পুরানো সম্পর্ক স্টোন ইন্ডিয়া লিমিটেডের। লোকোমোটিভ, ব্রেক সিস্টেম, প্যান্টোগ্রাফ সহ রেলের বহু মেকানিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী সরবরাহ করে আশি বছরেরও বেশি পুরানো এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বছর পাঁচেক আগে রেল মন্ত্রক অবশ্য অন্যরকম সমস্যা নিয়ে স্টোন ইন্ডিয়ার দ্বারস্থ হয়েছিল। রেলের শৌচাগারের সমস্যা। কীভাবে রেলের শৌচ পরিষেবার উন্নতি করা যায় তাই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন সরকারের। সমস্যার সমাধান খুঁজতে স্টোন ইন্ডিয়ার এনভায়রনমেন্ট ডিভিশনের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট সুদীপ সেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মূলত তাঁর হাত ধরেই পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে বায়ো টয়লেট –এর অবতারণা ভারতীয় রেলে।

২০১৫-র রেল বাজেটেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ঘোষণা করেছিলেন রেলে গ্রিন টয়লেট বা বায়ো টয়লেট ব্যবস্থা চালু করা হবে। গত সেপ্টেম্বরে রেল ঘোষণা করে, নিউদিল্লি-ডিব্রুগড় রাজধানী এক্সপ্রেসে পরীক্ষামূলকভাবে বায়ো টয়লেট বসানো হয়েছে। ফ্লাশ টয়লেটে যেখানে প্রতি ফ্লাশে ১০-১৫ লিটার জল লাগে, সেখানে বায়ো টয়লেটে লাগে বড়জোর ৫০০ মিলি. জল। এভাবে জলের মতো মহার্ঘ প্রাকৃতিক সম্পদেরও অপচয় রোখা ‌যায় বলে দাবি সুদীপ সেনের।

বায়ো টয়লেট কী ?

মনুষ্য বর্জ্যকে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় জলে পরিণত করাই বায়ো টয়লেটের কাজ। অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে ব্যাকটিরিয়া কালচারের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই তরল ভূগর্ভস্থ জল বা মাটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এরজন্য কোনও শৌচ ব্যবস্থারও প্রয়োজন নেই।


৩০ বছরের পেশা জীবন। বর্তমান টাটা মোটরস অধুনা টেলকোয় কর্মজীবন শুরু করেন সুদীপ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। এরপর মুম্বইয়ের এনআইটিআইই থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর। পড়াশোনা শেষে একাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সংস্থায় কাজ করেছেন। তখন থেকেই বিদেশি প্র‌ষযুক্তিকে দেশীয় ছাঁচে ঢেলে উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন সুদীপ। মাল্টিওয়াল পেপার স্যাকস, ডায়মন্ড কাটিং টুলস, জুয়েলারি সার্টিফিকেশন, রুফটপ সোলার পাওয়ার সিস্টেম হুইথ মাইক্রোইনভার্টার- এসবই সুদীপ সেনের সেই সব প্রচেষ্টারই ফলশ্রুতি। মার্কিন সংস্থা লিডারশিপ ম্যানেজমেন্ট ইন্টারন্যাশনালের ফেসিলিটেটর হিসেবে কাজ করার সময় অ্যাটিচুডিনাল ট্রান্সফরমেশন বা আচরণমূলক রূপান্তর সম্পর্কে সম্যক ধারণা হয় তাঁর। ৫১ বছর বয়সে স্টোন ইন্ডিয়ার এনভায়রনমেন্ট ডিভিশনের ভিপি হন। পরে সিনিয়র ভিপি নিযুক্ত হন।

স্টোন ইন্ডিয়ার সাফল্যের দিশারী সুদীপ

সুদীপের হাত ধরেই স্টোন ইন্ডিয়া আজ দেশের সবথেকে বড় বায়োটয়লেট উৎপাদনকারী সংস্থা। খোদ বিজ্ঞান ও প্র‌যুক্তি মন্ত্রক একে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমান মোদী সরকারের নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের স্বচ্ছ ভারত অভিযানের অন্যতম সঙ্গী স্টোন ইন্ডিয়া। গঙ্গা সাফাই অভি‌যানে বারাণসীর ঘাটগুলিতে স্টোন ইন্ডিয়াকে তাদের প্র‌যুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দেশের সমস্ত পুরনিগমে এরোবিক টেকনোলজি প্রণয়নে নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের সঙ্গে মউ স্বাক্ষর করেছে স্টোন ইন্ডিয়া। ভবিষ্যতে মায়ানমারে রফতানির বরাত মিলেছে। বাংলাদেশ রেলওয়েতে পাইলট রানের বরাত পেয়েছে স্টোন ইন্ডিয়া। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ, মায়ানমার, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনামে ব্যবসার আরও প্রসার ঘটিয়ে আয় বাড়াতে চায় সুদীপ সেনের সংস্থা। বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে এই পাইলট প্রজেক্ট প্রণয়নে সহায়তা করছে। এছাড়া বম্বে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন সহ দেশের বহু পুরনিগমের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ স্টোন ইন্ডিয়া। উত্তর পূর্ব ভারতে পোর্টেবল বায়ো টয়লেট প্রজেক্ট চলছে জোরকদমে।


এই রাজ্যেও কাজ চলছে জোরকদমে। দীঘা-শঙ্করপুর ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন বায়ো টয়লেটের বরাত দিয়েছে। মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারি সহ রাজ্যের একাধিক প‌র্যটন কেন্দ্রের বরাত পেয়েছে স্টোন ইন্ডিয়া। সুদীপ সেনের দাবি, ‘যেখানে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হয়েছে, সেখানে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, জলবাহিত রোগের প্রকোপও তলানিতে ঠেকেছে।’

রোটারি ক্লাবের প্রেসিডেন্ট সুদীপ সেন ভালবাসেন গলফ্ আর টেনিস খেলতে। ইন্ডাস্ট্রিতে আসা স্টার্টআপদের তাঁর পরামর্শ, আরও বেশি করে সচেতনতার প্রসার ঘটাতে হবে। মানুষের ভাবনাচিন্তায় পরিবর্তন আনাই সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি।

ভারতীয় বাজারের মানসিকতাই সমস্যা

সুদীপ মনে করেন, ‘ভারতের সমস্যা হল এখানে গুণগত মানের ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব রয়েছে। খরচকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।’ তবে তাঁর দাবি, বায়ো টয়লেট আগে একটা ধারণা ছিল, এখন বিষয়টি সচেতনতার প‌র্যায় পৌঁছেছে। অদূর ভবিষ্যতে গ্রিন ইন্ডিয়া তৈরির লক্ষ্যে অবিচল এই ‘সোশ্যাল অন্ত্রেপ্রেনিওর’।