একটা সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছেন অরব খান

টাকার অভাবে ক্লাস এইটের পর আর পড়তে পারেননি। উদ্যোগপতি হওয়ার স্বপ্নে ব্রেক কষে পিওনের চাকরি করতে কাতারে ছুটতে হয়েছে। ফিরে এসে কলকাতার কেএফসিতে অর্ডার বয়ের কাজ করেছেন। কিন্তু কোনও পরিস্থিতিই তাঁকে দমাতে পারেনি। তাই সাফল্যের পথে একটা ইনস্ট্যান্ট রাইডের স্বপ্ন দেখছেন অরব খান।

1

ভদ্রলোকের নাম অরব খান। বেঁটে। ফর্সা। মাঝারি গড়ন। ওঁকে চেনার একমাত্র উপায় ওঁর মুখে সব সময়ের জন্যে লেগে থাকা হাসি। কখনও কোনও বিষয়ে না বলেন না। সবসময় কিছু না কিছু নতুন করার কথা ভাবছেন। সমাজ সেবার মন আছে। বাইক চালকদের ক্লাব চালান। ড্রোন ওড়ানোর এক্সপার্ট এডুরেডের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে কলকাতার নিউটাউনে সামাজিক ইভেন্ট করতে মেতে ওঠেন। সারাক্ষণই ফুটছেন। কলকাতার স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে অরবকে সবাই চেনেন। অরবও চেনেন সবাইকেই। সকলের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক। সবাই ওঁকে ভালোবাসেন।

এই পজিটিভ মানুষটির সঙ্গে প্ৰথম আলাপ হয়েছিল কলকাতার আইডিয়া কাফেতে। আই পি মলের কর্ণধার অশ্রুজিত বসুরা একটি স্টার্টআপ মিটের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে। প্রথম আলাপে সব সময় একটা মজা থাকে। যতক্ষণ না কথা হচ্ছে কাউকে দেখে একরকম ধারণা তৈরি করে ফেলি আমি। তারপর যখন কথা এগোয় ততক্ষণে আগের মানুষটা কোথায় উধাও হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রেও সেরকমই হল। চোখ দিয়ে মন পর্যন্ত পৌঁছনো যায়, এতটাই স্বচ্ছ একটি মানুষ অরব। ভীষণ মিসুকে। কিন্তু কথা এগোতেই বেরিয়ে এলেন আরেকটা মানুষ। যিনি একা অগুনতি মানুষের প্রেরণা হতে পারেন। আমরা শুনব সেই কাহিনি তার আগে আসুন আমরা আলাপ করি অরব খানের ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে।

কলকাতার জন্যে ওঁর আইডিয়াটাও খুব ইউনিক। ইনস্ট্যান্ট রাইড। শুধু বাস, ট্রাম, ট্রেন, ট্যাক্সি, উবের, ওলা নয়... অরবের ইনস্ট্যান্ট রাইড দেবে বাইক বা স্কুটিতে করে নিরাপদে সস্তায় গন্তব্যে পৌঁছনোর একটি সলিউশন।

কলকাতা এখনও সেভাবে দেখেনি। কিন্তু গুরগাঁও, বেঙ্গালুরু মতো শহরে বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। এমনকি বেঙ্গালুরুতে এই ব্যবসায় রে রে করে ঢুকে পড়ছে উবের এবং ওলা। সেদিক থেকে দেখতে গেলে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে কলকাতা। এখনও সরকারি ছাড়পত্রের জন্যে জদ্দ-জাহেদ চলছে। তারওপর সংস্থাকে দাঁড় করাতে গেলে প্রয়োজন ফান্ডিং। ইতিমধ্যেই মাস খানেকের পাইলটও চলেছে কলকাতায়। এবং চুপি চুপি বলে রাখি দারুণ সাড়াও পেয়েছেন অরব খান।

অরবের জন্ম নেপালের একটা ছোট্ট গ্রামে। বাবা ছিলেন বড় মাপের কাঠের ব্যবসায়ী। তিন তিনটে কারখানা ছিল। প্রায় শখানেক লোক কাজ করতেন ওদের কারখানায়। নেপালে রাজনৈতিক সমস্যার জেরে সব খুইয়ে বসলেন অরবের বাবা। গাড়ি, বাড়ি, বিষয় সম্পত্তি সব ব্যাঙ্ক কেড়ে নিলো। অর্থের অভাবে লেখা পড়ায় ইতি টানতে বাধ্য হলেন অরব। তখন সবে ক্লাস এইট। তিন মাসের কম্পিউটারের ক্র্যাশ কোর্স করে সোজা চলে এলেন দোহা, কাতার। ষোলো সতের বছরের ছেলেটা ওখানে অফিস অ্যাসিসটেন্টের কাজ করতেন। সেখানে হাড়ভাঙা খাটুনি। সীমাহীন দুর্ব্যবহার। বেশি দিন চালিয়ে যেতে পারলেন না। দুবছরের আগেই ফিরে এলেন নেপালে। তার কিছুদিন পর ফিরলেন কলকাতা। ২০০৪ সালে কাজের সন্ধানে সেই প্রথম কলকাতা আসা। এখানে আসার পর রীতিমত বেঁচে থাকার লড়াইটা করতে হয়েছিল। কাজের সন্ধানে তোলপাড় করে ফেলছিলেন শহর কলকাতা। সব জানালায় নো ভ্যাকান্সির প্ল্যাকার্ড ঝুলছে। কয়েকটা বিপিও-তে কাজ পান। শেষমেশ কেএফসি তে কাজ করেন। মাস ছয়েক কাজ করার পর চাকরি পান একটি শিপিং কোম্পানিতে। এরপর অরবের কেরিয়ার গ্রাফ তরতর করে এগোয়। ২০০৬ এর ফেব্রুয়ারিতে শুরু করেছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ারের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। সেখান থেকে এগিয়েছেন এইভাবে, সার্ভিস কো অর্ডিনেটর,সার্ভিস টেকনিশিয়ান, সার্ভিস ইঞ্জিনিয়র, টেকনিকাল ম্যানেজার, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার এবং ২০১৪ সালে শেষতম পদ ছিল নাইজেরিয়ায় সার্ভিস বিভাগের ম্যানেজার।

এই শিপিংয়ের চাকরি করতে করতেই জাপানে একটি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোর্সও করেন। প্রথাগত শিক্ষায় অষ্টম পাস ছেলেটি জীবনের শিক্ষায়, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। এখন কোনও ইঞ্জিনিয়ারের থেকে কোনও অংশে কম নন। আর উদ্যোগপতি হওয়ার ইচ্ছেটা ওর রক্তে রয়েছে। জীবনের কঠিন সময় গুলোতেও ও নতুন নতুন উদ্ভাবনী ব্যবসার স্বপ্ন দেখেছেন। টাকার অভাবে করতে পারেননি। সময় গুনেছেন দুবছর চার বছর পর অন্য লোকেরা যখন ওর আইডিয়ার কাছাকাছি কোনও ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে তখন হাত কামড়েছেন।

টাকার অভাবে জীবনে বহু বাস মিস করেছেন। তবু বার বার বাস-স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়েছেন অরব। শুধু এটুকু নিজেকে বলার জন্য যে ওঁর একটা গন্তব্য আছে। ওঁর একটা গন্তব্য ছিল। কিন্তু টাকা না থাকায় বাসে চড়া হল না।

Instant Ride সেরকমই একটি উদ্যোগ যা থমকে আছে সরকারি লাল ফিতের গিটে। বাইক রাইড এখনও কলকাতায় বাণিজ্যিকভাবে করা যায় না। আইনি বাধা আছে। তাই রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট অফিসের সবুজ সংকেতের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন অরব। কিন্তু ওর এবং সরকারের নাকের ডগা দিয়ে হাজার একটা বাণিজ্যিক কাজ চলছে বাইকে চেপেই। ই-কমার্সের পার্সেল আসছে বাড়িতে, রেস্তরাঁর খাবার ঘরে পৌঁছ দিচ্ছে বাণিজ্যিক সংস্থার বাইকই। কিন্তু কোনও বাইকেরই কমার্শিয়াল লাইসেন্স নেই। এই সোনার পাথরবাটির সিস্টেমে আটকে গেছেন নেপাল থেকে আসা কলকাতার বাস্তুতন্ত্রে মিশে যাওয়া অরব খান।

জিজ্ঞেস করলাম, "যদি এই বাসটাও মিস হয়ে যায় তাহলে কী করবেন?" হাসি মুখে সপাটে উত্তর "বাসটা ধরার চেষ্টা করব at least, কিন্তু নিয়ম ভেঙে কখনওই নয়।" আশাবাদী অরব খুব শিগগিরই চলে আসবে ছাড়পত্র। কলকাতায় কমার্শিয়াল লাইসেন্স পেয়ে যাবে কমার্শিয়াল বাইক। তখন আর কেউ ওঁকে আটকাতে পারবে না। 

Related Stories