সবুজের দাবিতে মেয়েটি লড়ছে, ওর নাম কেকাশান

1

পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০০৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান কিনিয়ার লড়াকু নারী ওয়াঙ্গারি মাথাই। তখন কেকাশানের বয়স মাত্র চার বছর। কস্মিনকালেও দেখা হয়নি এই ছোট্ট বাঙালি মেয়েটার সঙ্গে ওয়াঙ্গারির। তবু একটা বীজ ওয়াঙ্গারি বুনে রেখে গেছেন তাঁর কাজ দিয়ে। গাছ লাগিয়ে দুনিয়ার দূষণ রোখার যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন নাইরোবির এই বিপ্লবী, সেই একই কাজে অনুপ্রাণিত হয়েছে এই ছোট্ট বাঙালি চারা গাছটি। ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসেই জন্ম কেকাশানের।

কেকাশান বাসু। দুবাইয়ে থাকে। বয়স এখন সতের। জন্মদিনের মাহাত্ম বুঝতে গিয়ে খুব অল্প বয়সেই বুঝে ফেলেছে দুনিয়ার সব থেকে বড় সত্যটা। এই প্রাণ চঞ্চল শস্য শ্যামল ধরিত্রী আসলে বিপন্ন একটি উপত্যকা। নীল আকাশের নীচে যে অপরূপ ঐশ্বর্যের সম্ভার তা আসলে বিষাক্ত। বাতাসে বিষ। জলে দূষণ। ক্রমেই আগুনের গ্রাসে চলে যাচ্ছে পৃথিবী। প্রতি নিয়ত শিশুদের ফুসফুসে ঢুকছে ক্ষয়ের অসুখ। মৃত্যুর এই মিছিল রুখে দিতে সবুজের সন্ধানই একমাত্র পথ। ছোট্ট মেয়েটা এই সব বুঝে গিয়েছিল খুব ছোটবেলায়।

বাবার কাজের সুবাদে দুবাইয়ে থাকলেও মন পড়ে থাকত কলকাতায় দিদিমার খোলা ছাদের টবে মাথা দোলানো নয়ন তারায়। মাত্র আট বছর বয়স থেকেই তাই শুরু করে দিয়েছিল গাছ লাগানোর কাজ। ওকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছে ওর এলাকার বন্ধুরা। তারাও কেকাশানের হাতে হাত দিয়ে গাছ লাগিয়েছে, বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের কাজ করেছে, সমুদ্রতট ও ম্যানগ্রোভ পরিষ্কার করেছে, সচেতনতা শিবিরের আয়োজন করেছে। এভাবেই গড়ে উঠেছে ওর দল। এদিকে ২০১১ সালে প্রয়াত হলেন ওয়াঙ্গারি। ১১ বছরের কেকাশান সেবছরই আমন্ত্রণ পেল ইন্দোনেশিয়ায় TUNZA Children and Youth Conference এ। পরের বছর সর্বকনিষ্ঠ বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ আসে United Nations Conference on Sustainable Development (Rio+20) এ। সুন্দর পৃথিবী গড়তে শিশুদের অবদান নিয়ে কেকাশানের আবেগ মাখা বক্তৃতা মন ছুঁয়ে যায় গোটা বিশ্বের। জন্মস্থান দুবাই ফিরেই প্রথম কাজ ছিল নিজের সংস্থা Green Hope গড়ে তোলা। কবিতা, গান, নাচের মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতার পাঠ দেয় Green Hope। বিশ্বের প্রায় ৩০০০ হাজার স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের কাছে পৌঁছে গিয়েছে কেকাশান অ্যান্ড কোম্পানির পরিবেশের পাঠ। যে সংস্থা একা একটি ১২ বছরের মেয়ের হাত ধরে শুরু হয়েছিল। শুধুমাত্র আরব আমির-শাহিতেই এখন সদস্য সংখ্যা সাড়ে তিনশো। সংস্থার পরিচালনভার সম্পূর্ণভাবে বাচ্চাদের হাতে। নানা কর্মসূচির খরচ নিজেদের পকেট-মানি থেকেই ম্যানেজ করে ওরা।

সমীক্ষা বলছে, প্রতি বছর পাঁচ বছরের নিচে প্রায় ৩০ লক্ষ শিশুর মৃত্যু হয় পরিবেশ দূষণের কারণে। এবং লক্ষ লক্ষ শিশুর জীবন বিপন্ন। ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়ায় প্রতিদিন ৬০০০ শিশু মারা যায়। ফলে শিশু অধিকার রক্ষার জন্য সুস্থ পরিবেশই যে অনেকগুলির মধ্যের একটি পূর্বশর্ত এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। দূষণ এবং তার ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে Green Hope স্থানীয়ভাবে প্রচুর কাজ করে। কিন্তু কেকাশান চেয়েছিল তাদের এই বিপ্লব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে। বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিয়ে বক্তৃতা পেশ করেছে সে। ১২ বছর বয়সে Major Group for Children and Youth of the United Nations Environmental Programme এর সর্বকনিষ্ঠ গ্লোবাল কো—অর্ডিনেটর নির্বাচিত হয়। শিশুদের অধিকারের প্রশ্নে সরব হয় কেকাশান। তাঁকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে নেপাল, ভারত, কলম্বিয়া, কানাডা, শ্রীলঙ্কা, ফ্রান্স, আমেরিকা, মেক্সিকো, ওমান এবং বাহারিনের শিশুরাও Green Hope এ সামিল হয় তারা।

শিশুদের পরিবেশ রক্ষার পাঠ দেওয়া থেকে কীভাবে হাতে কলমে কাজ শেখায় ওর সংস্থা। The Tree of Hope নামে একটি বইও লিখে ফেলেছে ছোট্ট মেয়েটি। Green Hope ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে পাঁচ হাজার গাছ লাগিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে গাছ লাগানো সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকরী উপায়, বলে মনে করে কেকাশান। "যেভাবে পৃথিবীকে চান সেটা পেতে গেলে একটু বেশি রাস্তাই হাঁটতে হবে। সময় নেই। তাই তাড়াতাড়ি করুন। নয়তো পাম গাছের তলায় শ্বেত ভালুকের দেখা পেতে পারেন আপনি’, এভাবেই সতর্ক করছে বছর সতেরোর মেয়েটি। পরিবেশ বাঁচাতে তার অবদান হিসেবে কিশোরীর হাতে উঠে গিয়েছে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার। ঝুলিতে রয়েছে ২০১৪ সালের NRI of the year award, ক্যাম্পেইনর হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য ২০১৫ সালে Diana Award এবং পরিবেশের প্রচারক হিসেবে পেয়েছে GESS Award। তবে পুরস্কার বা স্বীকৃতিতে নয়, ভারতীয় এই কন্যার এক এবং একমাত্র লক্ষ্য ‘সবুজ পৃথিবী’।

পরিবেশ রক্ষায় বাঙালি কিশোরীর অবদানকে সম্মান জানিয়েছে বিশ্ব বিখ্যাত ব্রিটিশ ব্যান্ড U2। তাদের সৌজন্যে মিশেল ওবামা, মালাইলা ইউসুফজাই, ওপরা উইনফ্রেদের সঙ্গে এক পঙক্তিতে চলে এসেছেন কেকাশান বাসুও। 

গত জুনে U2 এর এক কনসার্টে বিশ্বের সেরা মহিলাদের সম্মান জানানো হয় মঞ্চে। এই সেরা মহিলাদের একজন ছিল কেকাশান বাসু। আমন্ত্রণ পাওয়াটাই বেশ মজাদার ঘটনা ছিল কেকাশানের কাছে। প্রিয় ব্যান্ডের কনসার্ট লাইভ উপভোগ করতে চেয়ে টিকিটের খোঁজ করে। দেখা যায় সব টিকিট মাস খানেক আগেই সোল্ড আউট। হতাশ কেকাশানের জন্য হঠাৎ একটা ফোন এলো। রীতিমতো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। ব্যান্ডের ইভেন্ট ম্যানেজার ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান ব্যান্ডের একটা গানে ও থাকছে, কোন গান সেটা অবশ্য জানায়নি ইভেন্ট ম্যানেজার। পুরো অনুষ্ঠান দেখার জন্য ২টি ভিআইপি টিকিট পাঠানো হয়, খুশিতে তখনও ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে সেলেব্রিটি কিশোরীর চোখ। নির্দিষ্ট দিনে বাবার সঙ্গে দর্শকাসনে হাজির কেকাশান। কোন গানে তাকে দেখানো হবে ভাবতে ভাবতে সাসপেন্স আরও বাড়ছিল। শোয়ের একেবারে শেষে বানো (ব্যান্ডের সঙ্গীত শিল্পী এবং সমাজকর্মী) যখন বললেন গানটা মহিলা শক্তির জন্য উৎসর্গ করছেন, মনে মনে প্রার্থনা করছিলো মেয়েটা ওই গানের যাতে অংশ হতে পারে সে। ৫০,০০০ দর্শককে বানো বলছিলেন সেই গান তিনি তাঁদের জন্য উৎসর্গ করছেন যারা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করছেন, এক নিশ্বাসে বলে চলে U2 এর অন্ধ ভক্তটি। গানের সঙ্গে ব্যাক-ড্রপে ছবি ভেসে উঠতেই দেখা গেল সেই হাসিমুখ যার প্রতীক্ষায় প্রায় দম আটকে বসেছিল এই বাঙালি কিশোরী। আরও এক বাঙালি মহীয়সী নারী ছিলেন সেই তালিকায়। তিনি হলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। ‌গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে কেকাশানের। সে আজ বিশ্বাস করে শান্তির বার্তা ছড়াতে এবং পরিবেশ যোদ্ধা হতেই পৃথিবীতে তার আসা। একটা সবুজ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে ছোট্ট মেয়েটি।