দুনিয়া বদলে দিতে চান IIX এর দূরীন শাহনাজ

দূরীন কোনও দূরের নক্ষত্র নন। বাংলাদেশের মেয়ে। এশিয়ার দরিদ্র মানুষের ভাগ্যলিপি বদলে দেওয়ার স্পর্ধা রাখেন এবং তাই তিনি নিজেকে বলেন Defiant Optimist...

5

অনেক মানুষের সঙ্গেই আমার দেখা হয়, বন্ধুত্ব হয় আমি অনুপ্রাণিত হই। তেমনিই অনেক মানুষ আছেন যাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। কখনও দেখা হয়নি, কিন্তু দূর থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি, দেখছি। কারণ তাঁদের কাজ, সাফল্য আমাকে অনুপ্রাণিত করছে, করে আসছে। এরকম একজন বাংলাদেশের মেয়ে দূরীন শাহনাজ। দূরীন এখন বাংলাদেশে থাকেন না। তিনি এবং তাঁর স্বামী রবার্ট ক্রেবিল থাকেন সিঙ্গাপুরে।

গোটা এশিয়ার জন্যে ওরা দুজনে একটা অসাধারণ স্টক এক্সচেঞ্জ তৈরি করেছেন। সামাজিক স্টক এক্সচেঞ্জ। যেখানে আপনি চাইলে শেয়ার কিনতে পারেন যেকোনও লাভদায়ক সামাজিক প্রকল্পের। গোটা এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে চলছে ওদের এক্সচেঞ্জে নথিভুক্ত হওয়া এমন অসংখ্য প্রকল্প। 

ওঁর এই অভিনব স্টক এক্সচেঞ্জের নাম Impact Investment Exchange Asia (IIX Asia)। বিশ্বে এধরণের স্টক এক্সচেঞ্জ এই প‌্রথম তৈরি হয়েছে। আর সেটা হয়েছে দূরীনের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের ফসল হিসেবে। 

যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখেছেন দূরীন। পরিবারের চতুর্থ কন্যা হিসেবে সমাজে মেয়েদের অবস্থানটাও টের পেয়েছেন। বাবা মা খুব করে চেয়েছিলেন মেয়ে বড় হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করুক। পড়াশুনো করে দেশের মৌলিক পরিবর্তন ঘটানোর কাজটা করুক। করেছেনও তাই। বাংলাদেশের সামাজিক বিপ্লবী হিসেবে দূরীন এখন গোটা এশিয়ার রোল মডেল। তাঁর উদ্যোগের প্রশংসায় পঞ্চমুখ গোটা দুনিয়া। সম্প্রতি এশিয়া গেম চেঞ্জার পুরস্কারও পেয়েছেন দূরীন। আজ আপনাদের এই হার না মানা Defiant Optimist-এর কাহিনি শোনাব।

আইডিয়াটা অনেক দিনের। প্রথম বলতে শুরু করেন ২০১০ সাল নাগাদ। টেডটকে পিচিং করেন দূরীন। চার মিনিটেই গোটা দুনিয়ার ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টরদের কুর্নিশ আদায় করেন। মুগ্ধ হয়ে গোটা বিশ্ব দেখে এশিয়ায় একটি সূর্যের উদয়। প্রতিস্পর্ধী সেই সূর্যোদয়ের নন্দিনী দূরীন বলছিলেন, শুধু ব্যবসা করা নয়, সামাজিক পরিবর্তনের জন্যে শিক্ষা এবং সদিচ্ছাকে যুক্ত করতে চেয়েছেন তিনি। তিনি চেয়েছেন নিরন্ন দরিদ্র এশিয়ায় সামাজিক আর্থিক এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্যে আরও বেশি বেশি করে ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট হোক। এই সেক্টরে হাফ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সম্ভব। কিন্তু নির্দিষ্ট পরিকাঠামোর অভাব ছিল। সেই পরিকাঠামোটাই তৈরি করে দিতে চেয়েছিলেন দূরীন। তিনিই প্ৰথম বাংলাদেশি নারী যিনি ওয়ার্টন স্কুল অব বিজনেসে পড়েছেন। মরগান স্ট্যানলি তে কাজ করেছেন। ওয়াল স্ট্রিটে কাজ করেছেন। তারপর গ্রামীণ ব্যাঙ্কেও কাজ করেছেন দূরীন। বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন সামাজিক উদ্যোগের নানান দিক নিয়ে। দেশের প্রান্তিক শিল্পীদের কাজ যাতে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যবসা করতে পারে তাই ওয়াননেস্ট নামে একটি সংস্থাও খোলেন দূরীন। কিন্তু ২০১০ এর আইডিয়াটা ছিল সব থেকে জোরালো। আর তাই বাস্তবায়িত হতেই নড়ে চড়ে বসেছে গোটা বিশ্ব। ২০১৪ সালে দিনের আলো দেখেছে এই স্টক এক্সচেঞ্জ। সামাজিক ও পরিবেশগত সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্যে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ক্রাউড ফান্ডিং’য়ের মাধ্যমে ফান্ড তৈরি করে তাঁর সংস্থা। সেই ফান্ড বিনিয়োগ করা হয় লাভদায়ক বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে। এতে বিনিয়োগের প্রাথমিক শর্ত বা লাভের দিকটা যেমন দেখা হয় তেমনি সামাজিক উদ্যোগটাও উৎসাহিত হয়। 

কাজটা মোটেই সোজা ছিল না। কারণ নতুন কিছু তৈরি করা মানে তার সামগ্রিক ইকো-সিস্টেমটা তৈরি করা। তাইই করেছেন। কম্বোডিয়ায় ডিজেল চালিত পাওয়ার প্ল্যান্টকে বায়োফুয়েল চালিত করেছেন। ভারতে জল পরিস্রুত করার প্ল্যান্ট তৈরি করিয়েছেন। বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন ফিলিপিন্সে।

এই পথেই ক্রমমুক্তির স্বপ্ন দেখছেন বাংলাদেশের মেয়ে দূরীন। দরিদ্র মানুষের জন্যে স্বল্পমূল্যে মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়ে দিয়েছেন, পরিবেশ বন্ধু জ্বালানি যোগানের বন্দোবস্ত করেছেন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছেন গ্রামে গ্রামে তেমনি এশিয়ার দূর দূরান্তের প্রান্তিক এলাকাতে সুলভে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছেন দূরীন। সব মিলিয়ে তার সংস্থার দ্বারা উপকৃত মানুষের সংখ্যা আজ এককোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। এর আগেও এশিয়া সোসাইটি শাহনাজকে সম্মানিত করেছিল, ২১ জন তরুণ লিডার হিসেবে সম্মান জানিয়েছিল।

দূরীন শাহনাজ মনে করেন তাঁর এই সামাজিক স্টক এক্সচেঞ্জের হাত ধরে শুধু এশিয়া নয় গোটা দুনিয়ার মানুষের ক্রমমুক্তি সম্ভব। কারণ তাঁর মতে গরিব আসলে গরিব হয়ে থাকতে চায় না। পরিবর্তন চায়। অর্থ বিত্ত সম্পত্তির বাসনা অন্য জিনিস কিন্তু ভালো করে বেঁচে থাকার জন্যেও অর্থই সেই শক্তি যা তাঁকে জীবনের লড়াইটা লড়তে হিম্মত দেয়। তাঁর এই আই আই এক্স অর্থের সঙ্গে দরিদ্র কুশলী মানুষকে জুরে দেবে। পাশাটা পাল্টে দেওয়ার একটা সুযোগ দেবে।

Related Stories