রইস বনাম কাবিল ফিল্মি টক্কর নয়, ভিন্ন বর্গীয় বিজয়!

লিখছেন আশুতোষ।

1

একে কী বলা যায়? একজন সাম্প্রদায়িক নেতার অনভিপ্রেত মন্তব্য কিংবা একজন অবাঞ্ছিত ব্যক্তির ঠাট্টা অথবা এক পরিত্যক্ত আদর্শের যুদ্ধং দেহি চিৎকারকে কী বলব? দুটি সিনেমা নিয়ে তুলমানূলক আলোচনা নতুন কিছু নয়। এটা বরং সমালোচকদের সৃজনশীলতার প্রকাশ। এর ফলে সিনেমা বিশ্বকে বুঝতে পারি আমরা। দর্শকদের কাছে এ এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও উন্মোচিত করে তোলে। এটা আসলে এমন এক অনুশীলন যা কিনা সৃজনশীল ক্ষেত্রে এক ধরনের সুসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে। সৃজনশীলতার নতুন প্রকাশের দিকগুলি থুলে দেয়। সেইসঙ্গে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনার ক্ষেত্রে নতুন শক্তিকে প্রকাশিত করে্। সেইসঙ্গে চেতনার নতুন কোনও স্তরে আমাদের পৌঁছেও দেয়।

দুভার্গ্যজনকভাবে আমরা এমন একটি যুগে বসবাস করছি, যেখানে সৃজনশীলতার নামে আমরা প্রায়শই অভিশাপের শিকার। পোস্ট ফ্যাক্ট বিশ্বে আমাদের বসবাস এথন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে। নতুন এক স্থানকালে এখন আমাদের বসবাস। সুতরাং, আমি মোটেও বিস্মিত নই কৈলাশ বিজয়বর্গীয়ের অশালীন কথাবার্তায়। শাহরুখ অভিনীত ছবি রইস সম্পর্কে জনমনে বিদ্বেষ ও হৃতিক অভিনীত ছবি কাবিল সম্পর্কে সাড়া জাগাতে বিজয়বর্গীয় পরিকল্পিত একটি উদ্যোগ নিয়েছেন।

ব্যাপারটিতে আপত্তির তেমন কোনও কারণ নেই বলেই মনে হতে পারে। বরং এটা যেন একটি বিশেষ সিনেমা নিয়ে তিনি তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন বলেও চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কৈলাশ বিজয়বর্গীয় যে টুইটটি করেছেন তার এতটা সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। আর একবার দেখে নেওয়া যাক তিনি কী লিখেছেন –

"রইস সিনেমাটিতে দেশাত্মবোধক কিছু নেই। সুতরাং এদেশে এর কোনও মূল্য নেই। আর কাবিল – যিনি একজন দেশপ্রেমিক – সকলেরই উচিত তাঁকে সমর্থন জানানো।"

কৈলাশ বিজয়বর্গীয় তো সাধারণ কোনও মানুষ নন। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি-র জাতীয় সাধারণ সম্পাদক তিনি। তবে হেডলাইনগুলি বিতর্কিত করে তোলার দিকে তাঁর ঝোঁক বরাবরই। একাজটা তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই করেন। অতীাতে এজন্য তাঁর দলও ওঁর বিরোধিতা করেছে। কিন্ত তিনি আবার নতুন করে্ বিতর্কে জড়িয়েছেন ফের নতুন প্রসঙ্গ টেনে এনে। তবে বরাবরই ওঁর বক্তব্য ওই একই। তা সাম্প্রদায়িক, ঘৃণাপূর্ণ এবং কুরুচির প্রকাশ। একটি বিশেষ সম্প্রদায়ই ওঁর আক্রমণের লক্ষ্য।

রইস একটি বায়োপিক। ছবিতে মাফিয়া ডনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শাহরুখ। আর কাবিল হল এক অন্ধ দম্পতির পারস্পরিক ভালোবাসা ও প্রতিহিংসার কাহিনী। হৃতিক এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র। দুটি ছবিই একসঙ্গে মুক্তি পা্ওয়ার কথা ছিল। মুক্তির দিন স্থির করা হয়েছিল ২৫ জানুয়ারি। এটা অবশ্যই ঘটনা হিসাবে কাকতালীয়। তবে শাহরুখ বা হৃতিক দুজনের কেউই কিন্তু ছবি নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। ওঁরা পরস্পর যদি এব্যাপারে বিপরীত মন্তব্য করতেন তাহলে ছড়াতে পারত বিতর্ক। তবে সেটা বাজারি কৌশল হিসাবেই চালিয়ে দেওয়া যেত।

আসলে দুই অভিনেতাই পরস্পরের প্রতি সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখেন। মানুষও এটা দেখেছেন। সুতরাং বিতর্কিত ওই টুইটটি যেমন সিনেমা দুটি নিয়ে এক ধরনের হইচই ফেলবে, পাশাপাশি রইস ছবিটিরও ক্ষতি হযে যাবে। তবে আমি এব্যাপারে নিশ্চিত, হৃতিক মানুষ হিসাবে কাউকে প্ররোচিত করার লোক নন। এটা আদতে কৈলাশ বিজয়বর্গীয়ে্র একটি নিজস্ব সৃষ্টি।

কৈলাশ এমন একটি রাজনীতি করেন যা সংখ্যালঘুদের স্বার্থের পরিপন্থী। বিজেপি ও আরএসএস খোলাখুলিভাবেই সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করে আসছে। ওঁদের অতীত আদর্শ কিংবা পুরনো নেতারা সং‌খ্যালঘুদের নাগরিক অধিকার দিতেই অনাগ্রহী। আরএসএস কিংবা বিজেপি-র যে আদর্শ চর্চিত হয়ে থাকে তাতে ভারতভাগের জন্যে দায়ী করা হয় মুসলমানদের। মধ্যযুগীয় ইতিহাস থেকে নানান দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাবলী তুলে ধরে সেজন্যেও ওঁরা কাঠগড়ায় তোলেন মুসলমানদের। রাজনীতি ওঁদের চোথে সভ্যতার সংঘাতের স্বরূপ। স্যামুয়েল হান্টিংটনকে উদ্বৃত করেই আমি একথা বলছি।

ভারতের প্রেক্ষিতে আরএসএস মুসলমানদের অভিযুক্ত করে থাকে এই দোষে – ভারতীয় সভ্যতার অবনমিত হওয়ার কারণ বহিরাগত মুসলমানরা। মুসলমানরা এদেশে প্রবেশ করার জেরে ভারতীয় সভ্যতা অবনত হয়েছে বলে ওঁরা প্রচার চালিয়ে থাকেন। ওঁদের মতে, ভারতের ইতিহাস হল হিন্দু সভ্যতার ইতিহাস। মুসলমান এবং ক্রিশ্চানরা এদেশে বিদেশি। এক্ষেত্রে ওঁরা প্রচার করে থাকেন বীর সাভারকরের বাণী। সাভারকর প্রচার করতেন, যাঁদের মাতৃভূমি ভারত তাঁরাই হিন্দু। সাভারকরের বক্তব্য আদতে এই, মু‌সলমান ও খ্রিশ্চানরা ভারতের বাইরে থেকে এদেশে ঢুকেছিলেন। সুতরাং এদেশের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা সন্দিগ্ধভাবে দেখতে হবে। সংখ্যালঘুদের সঙ্গে বিজেপি বা আরএসএসে তিক্ত সম্পর্কের মৌলিক কারণ এটাই।

তবে কৈলাশ বিজয়বর্গীয় একদম নতুন কিছু করেননি। ভারত অনেকদিকেই এগিয়ে চলেছে। ভারতে নানাক্ষেত্রে আধুনিকীকরণ ঘটেছে। দ্রুত ঘটেছে নগরায়ন। সেইসঙ্গে অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে নেওয়া হয়েছে ইতিবাচক পদক্ষেপগুলি। এসত্ত্বেও বিজেপি ও আরএসএস নেতারা হিংসাত্মক সাম্প্রদায়িক মনোভাবের খোলস ছেড়ে বেরোতে রাজি নন। কৈলাশ বিজয়বর্গীয় মন্তব্যে এই মানসিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে।এটা নতুন কিছুও নয়। বরং এটা একটি পুরনো স্লোগান। তাছাড়া, তিনি আদতে কোমও সিনেমাকে লক্ষ্যবস্তু বানাননি। শাহরুখ খানই তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য। শাহরুখ তাঁর ধর্মীয় পরিচিত জন্যেই এর শিকার হয়েছেন। শাহরুখ একজন গ্যাংস্টারের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন এবং সিনে্মায় ওই চরিত্রটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। এটাই কৈলাশ ও তাঁর আদর্শবাদী সতীর্থদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।

এছাড়া, হৃতিক রোশনকে ওঁরা একজন অভিনেতা হিসাবে গ্রাহ্য করেননি। ওঁকে দেখা হয়েছে আর একটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসাবে। সেইসঙ্গে ওঁরা শাহরুখের বিপরীতে হৃতিককে খাড়া করে পর্যবসিত করতে চেয়েছেন ঐতিহাসিক একটি সংঘাতকে। এই অশালীনতা আমাদের দেশের সিনেমা জগতের দুই প্রথিতযশা অভিনেতাকে হেনস্থারই নামান্তর। কৈলাশ বিজয়বর্গীয়র কাছে রইস ও কাবিল কেবলমাত্র দুটি সিনেমা নয়, যে ছবি দুটি বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। বরং বিজয়বর্গীয় কাছে এ হল দুটি সভ্যতার ভিতরকার পারস্পরিক ক্ষমতায়নের লড়াই।

অথচ, ভারতীয় ছবি দক্ষিণ-এশিয়ায় অন্য একটি স্বাধীন ভাবমূর্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এখানে জাতপাত বা সাম্প্রদায়িক বৈষম্য নেই। ভারতীয় ছবি কেবলমাত্র প্রতিভাকে তুলে ধরছে। বাজারের ফলাফলের জন্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না জাতপাত বা সাম্প্রদায়িকতা। ৫০ দশকের সুপারস্টার দেবানন্দ, রাজ কাপুর কিংবা ৬০ দশকের সুপারস্টার দিলীপ কুমার, ইউসুফ খান ছিলেন সেইযুগে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নি‌য়ন্ত্রক অভিনেতার ভূমিকাতে। ৭০ কিংবা ৮০ দশকের অনিতাভ বচ্চনের স্টারডম কিংবা নাসিরুদ্দিন শাহ নিউ সিনেমাকে নেতৃত্ব প্রদান – উভয়ই কি্ন্ত দর্শকমহলে সমাদৃত হয়েছে।

অন্যদিকে, ৯০ দশক জুড়ে ভারতীয় সিনেমায় অসাম্প্রদায়িকতার ভাবমূর্তি বিশিষ্ট হয়েছে। সেইসময়েই ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান ঘটে। রামনন্দির আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। বিজেপি ও আরএসএস আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়। তবে বলিউডে রাজত্ব করা খানরাও ক্রমে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। আগে কখনও এরকম দেখা যায়নি। আমির খান, সলমন খান, সঈফ আলি খান, শাহরুখ খান আর হালফিলে ইমরান খান কিংবা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি রাজার মতোই রাজ্যপাট চালাচ্ছেন বলিউডে। আবার হৃতিক রোশন, অক্ষয় কুমার, অমিতাভ, অজয় দেবগণ সাফল্যের সঙ্গে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছেন। ৫০ বছর বয়সেও আমির, সলমন, শাহরুখ তাঁদের ভক্তদের ভালোবাসা পেয়ে চলেছেন। যে কোনও প্রযোজক, পরিচালক ও নায়িকার স্বপ্ন ওঁদের সঙ্গে কাজ করা।

একটা সময়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং কিছু দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী হৃতিককে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয় ওঁদের সমান্তরালে। সেক্ষেত্রে হৃতিককে ওঁদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসাবে তুলে ধরতেও চেষ্টা চালানো হয়। এবিষয়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশ কভার স্টোরিও ছাপতে শুরু করে। আখেরে তাতে কোনও লাভই হয়নি। আসলে ওঁরা যথেষ্ট রকম দেশপ্রেমিক নন, এটা প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগা হয়েছিল। শাহরুখের মাই নেম ইজ খানকে নিশানা বানানো হয়েছিল। আমিরের মন্তব্য ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী নাকি ভারতে বসবাস করতে আগ্রহী নন। এভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে তুঙ্গে আনতে নানা প্রয়াস চলেছে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে। যদিও ওঁদের দেশপ্রেম দেশের মানুষের কাছে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত।

রইসও এখানে একটি অজুহাত মাত্র। এটা আসলে শাহরুখের দেশপ্রেমকে প্রশ্নের নুখে দাঁড় করানোর উদ্দেশে ব্যবহৃত কৌশল। এভাবে গোটা একটি সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চক্রান্ত। সেইসঙ্গে এও প্রমাণ করার মরীয়া প্রয়াস, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় কখনই দেশবিরোধী হতে পারে না। গত দু-আড়াই বছর ধরে একটি সম্প্রদায়কে প্রান্তিক হিসাবে তুলে ধরতে নানা রকম কৌশল রচনা করা হচ্ছে। এটা দেশগঠনের পরিপন্থী। যা থেকে ভবিষ্যতে গুরুতর কোনও বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। 

(Disclaimer: The views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the views of YourStory)