আপনার মার্কেটিং কী অভ্যাস তৈরিতে সক্ষম?

0

অভ্যাস বিশেষজ্ঞ চার্লস ডুহিগের মতে, প্রতিদিন আমরা যা করি তার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ আমাদের ব্যবহার নয়, সেগুলি আসলে আমাদের অভ্যাসের ফল। তাই মার্কেটিংয়ের সবথেকে কঠিন ও মূল্যবান লক্ষ্য হল অভ্যাস তৈরি।


যেমন ধরুন

১। নাইকি ইচ্ছেশক্তিকে একটি অভ্যাসের পরিণত করতে চায়

২। মিলিটারি ট্রেনিংয়ের লক্ষ্য হল ইচ্ছেশক্তিকে অভ্যাসে পরিণত করা

৩। স্টারবাকস জোর দেয় গ্রাহক পরিষেবায় যার মূল লক্ষ্য ইচ্ছেশক্তিকে অভ্যাসে পরিণত করা

কোম্পানিগুলি তাদের কর্মী বা ক্রেতাদের মধ্যে চারিয়ে দিতে চায় বিভিন্ন অভ্যাস। হ্যাবিট মার্কেটিং একটি খুবই শক্তিশালী যোগাযোগ সৃষ্টি প্রক্রিয়া।

হ্যাবিট মার্কেটিংয়ের বিজ্ঞানে আমার ইউরেকা মুহূর্ত, প্রায় এক দশক আগে দেখা ১৯৭৫ সালের আমেরিকান এক্সপ্রেসের একটি বিজ্ঞাপন। সেখানে লেখা ছিল, ‘এটা ছাড়া বাড়ি থেকে বেরোবেন না’। একটা সহজ, শক্তিশালী পরামর্শ যা একটি অভ্যাস তৈরিতে সক্ষম। সেই সময় কারও ওয়ালেটেই ক্রেডিট কার্ড থাকত না, কিন্তু আজ, ক্রেডিট/ডেবিট কার্ড রাখাটা একটা অভ্যাস, এটি একটি নতুন একবিংশ শতাব্দীর অভ্যাস।

এরকমই কিছু অভ্যাসের উদাহরণ

• হ্যাপি বার্থ ডে গান ও তার সুর

• জন্মদিনে কেক কাটা

• ব্যয়াম করা বা না করা

• অতিথীদের চা-জলখাবার দেওয়া

বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অভ্যাসবশত কোনো কিছু করার সময় আমরা সেটা নিয়ে বিশেষ ভাবনা চিন্তা করি না। অভ্যাস সাধারণত মরে না। নিউরোসাইনটিস্টরা দেখিয়েছেন, অভ্যাস আমাদের মস্তিষ্কের ব্যাসাল গ্যান্গলিয়া নামক একটি অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবেগ, স্মৃতি ইত্যাদি সৃষ্টি ও প্যাটার্ন চিহ্নিতকরণেরও মূলেও রয়েছে এই একই অংশ। অভ্যাস স্বয়ংক্রিয়, আর তাই হ্যাবিট মার্কেটিং এত লোভনীয়।

ব্র্যান্ডের প্রচারের একটি সফল পথ হ্যাবিট মার্কেটিং। বাকিগুলি হল অ্যাসপিরেশনাল(আকাঙ্ক্ষা তৈরি), প্রডাক্ট সেন্ট্রিক ( পণ্য কেন্দ্রিক), অ্যালট্রুইস্টিক (মানবিক), ইমোশনাল মিররিং (আবেগ প্রতিফলনকারী) এবং আমরা বনাম ওরা মার্কেটিং।

যদি আপনি অভ্যাস কেন্দ্রিক মার্কেটিং করতে চান, তাহলে ব্র্যান্ডের মার্কেটিং কৌশল তৈরির আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন।

আমার ট্যাগলাইন কী অভ্যাস তৈরিতে কার্যকরী?

নাইকির ট্যাগলাইন, ‘জাস্ট ডু ইট’। সুস্থ-সবল থাকা একটা অভ্যাস। এই পরামর্শই রয়েছে এই ট্যাগলাইনে। আপনাকে শুধু এটা করতে হবে। অতিথীকে জলখাবার বা ঠান্ডা পানীয় দেওয়ার অভ্যাসকে কাজে লাগাতে চায় কোকাকোলার ‘ঠান্ডা মতলব কোকাকোলা’ (ঠান্ডা মানে কোকাকোলা) এই ট্যাগলাইন। একজনের নিজের তেষ্টা মেটানোর ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য।


আমি কী সম্ভাবনাময়?

বিক্রয়কারীদের কাজ কঠিন। তারা অনাগ্রহী শ্রোতাদের কাছে জিনিস বিক্রি করার চেষ্টা করে। সেই শ্রোতারা বেশিরভাগ সময়ই ফোন রেখে দেন, মেইল ডিলিট করেন, প্যামপ্লেট ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলেন। হ্যাবিট মার্কেটিং বা অভ্যাস কেন্দ্রিক মার্কেটিং এর উল্টো। ক্রেতা নিজে থেকেই বেশি বেশি করে আকৃষ্ট হন। এতে মনে হয়না আপনি কিছু বিক্রি করছেন। যেমন ধরুন, ক্যাসিনোর স্লট মেশিনে প্রতিবারই এত নিকট হার হয় যে জুয়াতে অভ্যস্তরা মনে করেন আর একটু হলেই তিনি জিতে যাবেন এবং খেলে যেতেই থাকেন। ক্যাসিনোতে কোথাও কোনো পোস্টারে কিন্তু জুয়াড়িদের আবার আসার আহ্বান জানাতে হয় না।

আমার পণ্যটি কী জীবনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত?

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অভ্যাস বদলায়। সব অভ্যাস সকলের জন্য, সব বয়সের জন্য নয়। প্রতি রবিবার সকাল ১১ টায় সাত বছরে সন্তানের সঙ্গে ডিসকভারি চ্যানেল দেখার অভ্যাস সারাজীবন থাকবে না। তাই অভ্যাস তৈরির লক্ষ্য একটি নির্দিষ্ট অভিমুখে হতে হবে। জীবনের বড় ঘটনাগুলি যেমন বাড়ি বদল, গর্ভধারণ, বিয়ে ইত্যাদি নতুন অভ্যাসের সঙ্গে পরিচিত করার বড় সুযোগ।

আমি কী একটি জোরদার গল্প বলছি?

কিছু সংখ্যক মানুষ থাকেন যারা একটি অভ্যাসের মধ্য আসেন আবার চলে যান। তাদের বারবার গল্প বলে সেটির মধ্যে রাখতে হবে। টিভি সিরিয়ালগুলির কথা ভাবুন, তারা নিজেদের গল্পের মাধ্যমে আপনাকে আকৃষ্ট করে রাখে, আপনার অভ্যাস হয়ে উঠতে চায়।

আমি কী এর সুবিধার দিকগুলি নির্দিষ্ট করে বলছি?

রুটিন ভাল, কিন্তু আমরা লাভ পেতে চাই, সেটাই অনুপ্রেরণা যোগায়। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা থেকে আত্ম-গর্ব, নানাভাবে মানুষ তৃপ্তি লাভ করেন। চার্লস ডুহিগের সুখ্যাত কিউ-রুটিন-রিওয়ার্ড চক্র, অভ্যাস সংক্রান্ত যোগাযোগের মূল কথা হওয়া উচিত। এমনকি নাক খোঁটা বা দাঁতে নখ কাটার মতো বদঅভ্যাস থেকেও ছোট ছোট পাওয়া আছে মানুষের।

আমি কী সার্বিকভাবে মূল্যবান কিছু দিচ্ছি?

অনেক সময় তাত্ক্ষণিক কোনো পাওয়া থাকে না। অভ্যাস সৃষ্টিকারী পণ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও মূল্যবান হয়ে ওঠা উচিত, কারণ গ্রাহক বিনিয়োগ করতে থাকেন।

শেষের কথা

প্রতিটি পরিকল্পিত অভ্যাস সৃষ্টিকারী উদ্যোগের পথে বাধা আসে যখন একটি প্রজন্মের ভাবনা চিন্তা বা কার্যক্রম বদলে যায়। যেমন, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ বা ট্যুইটারফিড দেখার অভ্যাস আগে ছিল না, কিন্তু এটি একটি নেশা সৃষ্টিকারী এবং মানুষের ব্যবহার পরিবর্তনকারী। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত অভ্যাসের সঙ্গে তাল মিলিয়েই করতে হবে অভ্যাস কেন্দ্রিক মার্কেটিং। সকালের খবরে কাগজ, চা-বিস্কুট ৯০ এর দশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র রচনা করলেও ২০১৫ এর চিত্রটা তৈরি করে স্মার্ট ফোন ও তাতে নিবিষ্ট হয়ে থাকা গ্রাহক।

লেখা-রীতা গুপ্ত

অনুবাদ-সানন্দা দাশগুপ্ত