কলকাতার AnaMika আন্তর্জাতিক একটি ব্র্যান্ড

1

ভারতীয় ফ্যাশনে টানা ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। অথচ কাট, মাপ, কার্ভ বইয়ে পড়া বিদ্যের ধারে কাছে যাননি কোনও দিন। লোরেটো কলেজের প্রাক্তনী অনামিকা খান্না স্বশিক্ষিত ফ্যাশন ডিজাইনার। তাঁর কাছে ফ্যাশন মানে নিজের ইচ্ছে ডানায় ভর করে স্বপ্নের উড়ান। দেড় দশকের বেশি ফ্যাশন দুনিয়া শাসনে কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরুর নামী স্টোর ছাপিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, স্পেন, থাইল্যান্ড, পশ্চিম এশিয়ায় এখন পরিচিত ব্র্যান্ড Ana Mika।

শিল্পের প্রতি বরাবরই টান অনামিকার। ধ্রুপদী নৃত্যে তালিম নিয়েছেন। চিত্রশিল্পী। দেড় দশকেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। ৯৫ সালে দামানিয়া ফ্যাশন অ্যাওয়ার্ড জিতে ফ্যাশন দুনিয়ায় পা রাখেন অনামিকা। আর পিছন ফিরে তাকাননি। কোনও রকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরুর ফ্যাশন ডিজাইনারদের সঙ্গে সমান তালে কখনও বা পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছেন কলকাতার এই কন্যা। দশ বছর আগে তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় মহিলা ডিজাইনার যিনি প্যারিস ফ্যাশন উইকে নিজের সম্ভার নিয়ে হাজির হতে পেরেছেন। প্রথম ভারতীয় ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে নিজের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড (Ana Mika) লঞ্চ করেছেন। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও তাঁর ডিজাইন হামেশাই ব়্যাম্প মাতাচ্ছে।

প্রিয় রং সাদা। পোশাক ডিজাইনেও সাদার ব্যবহার নজরকাড়া। মূলত শাড়ি ডিজাইন করতে ভালোবাসেন। দেশি ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের ডিজাইনের ফিউশন দিয়ে ফ্যাশন বোদ্ধাদের মাত দিয়েছেন অনামিকা। রং আর ক্রাফটের ব্যবহারে বিশ্বের কাছে সমাদৃত Ana Mika, তাঁর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। নিজের ব্র্যান্ডকে বাজারে পরিচিতি দিতে বাকিদের মতো চেনা পথে হাঁটেননি। কখনও কোনও পাবলিক রিলেশন সংস্থার সাহায্য নেননি। নিজেকে আড়ালেই রাখেন। ব়্যাম্পে কয়েক মিটারের বেশি হাঁটতেই চান না। ‘আমাকে নিয়ে কেউ প্রতিবেদন লিখবে বললে মরেই যাব বোধহয়’, হেসে বলছিলেন প্রচার বিমুখ এই ফ্যাশন ডিজাইনার। তবুও তাঁর হাতযশেই গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে পরিচিতি।

স্বপ্ন পূরণে কলকাতার মতো শহরে নীরবে ফ্যাশন দুনিয়ায় পা রেখেছিলেন অনামিকা। ডিজাইনে এমন কিছু ছিল যা সমালোচকদের নজরে আসতে বাধ্য করেছিল। অল্প সময়ের মধ্যে নাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর সিগনেচার স্টাইল নানান ধাপের মিশেল। গোল্ডেন এমব্রয়েডারির সঙ্গে জরদৌসির কাজ, রঙের ব্যবহার এক এক কালেকশনে এক এক রকম। অনামিকার ট্রেডমার্ক হল কালো, আইভরি আর প্যাস্টেল শেড। কালো-সাদা, সাদা কালো দিয়েই দর্শকদের মন জিতে নেন অনামিকা। কাপড় নিয়ে নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। সাদা কালোয় আবেদন তৈরির মুহূর্ত গুলোয় সৃজনশীল পাগলামো ওকে পেয়ে বসে। সে যেন সৃজনের স্নায়বিক বিপর্যয়। আর সেই বিপর্যয় থেকেই সৃষ্টি হয় তাঁর শিল্প। বলছিলেন অনামিকা। বেশিরভাগ কালেকশনে এমব্রয়ডারি চোখে পড়বে।আসল ডিজাইন ফুটিয়ে তুলতে ক্রাফটিং টেকনিকের সুন্দর ব্যবহার এড়িয়ে যেতে পারবেন না। দক্ষিণ কলকাতার ল্যান্স ডাউনে ফ্যাক্টরিতে কারিগরদের সঙ্গে ব্যস্ত সময় কাটে অনামিকার। কলকাতারই ফ্ল্যাগ-শিপ স্টোরে এক্সক্লুসিভ ডিজাইনের সব পোশাক রাখা থাকে। দুবাই, আমেরিকা, ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং সারা বিশ্বজুড়ে শ'তিনেক নামি স্টোরে Ana Mika হট কেক।

বিয়ের কনের পোশাক তৈরি করেন। পাশ্চাত্যের পোশাকের আদল থাকে। তবে এর মধ্যেও নানান কিন্তু পরন্তু আছে। যেমন একটু রক্ষণশীল পরিবার হলে বাড়ির মেয়েদের গাউন পরা পছন্দ করবেন না। আর ভারতীয় নারীর অবয়বে গাউন মানাবেও না। তাহলে কী উপায়? দেখে নেন কী ধরনের পরিবারের কনেকে সাজাতে হবে। যেকোনও পরিবারের যে কোনও পরিস্থিতির জন্যে কনের পোশাক তৈরি রাখেন ওরা। বুঝিয়ে বলছিলেন অনামিকা।

ভারতের সমৃদ্ধ বস্ত্রশিল্পকে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেয় অনামিকার পোশাক। যখন ডিজাইন করেন ভারতীয় স্টাইলের পোশাককে কীভাবে আধুনিক বিশ্বের সমসাময়িক করে তোলা যায় সেটা মাথায় রাখেন। ধরা যাক ধোতি প্যান্ট। ওর ব্র্যান্ডের একেবারে পরিচিত এই পোশাকটিকে হাই ওয়েস্ট ট্রাউজার হিসেবে ব্যবহার করেন, সঙ্গে দোপাট্টা। কুর্তা সঙ্গে ক্যাপস, বুট এবং শার্ট—ভারতীয় অথচ পাশ্চাত্যের আধুনিকতার ছোঁয়া, এই ফিউশনের জন্যেই অনামিকা আজ পৌঁছেছেন সাফল্যের টিলায়।

বলিউডের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ অনামিকার। সোনম কাপুর, করিনা কাপুর, দীপিকা পাড়ুকোন, ইয়ামি গৌতম, দিয়া মীর্জা, ফ্রেডা পিন্টো, ইলেনা ডি’ক্রুজদের লম্বা তালিকা, যারা রেড কার্পেট ইভেন্টের জন্য কলকাতার এই ডিজাইনারের পোশাকই পছন্দ করেন। মাসাবা গুপ্তা, গৌরব গুপ্তার মত ডিজাইনারদের কাছে অনামিকার ডিজাইন রীতিমত কুর্নিশ আদায় করেছে।

খুব বেশি ডিজাইন করেন না অনামিকা। ‘সংখ্যা না মান’ এই প্রশ্নে অনামিকা মানের তরফে ভোট দেন। ফ্যাশন দুনিয়ায় তাঁর পরিচিতি অনেক আগেই দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে। ভারত-ব্রিটেন সংস্কৃতি বিনিময় উপলক্ষে বাকিংহাম প্যালেসে রানির আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। দুদেশের বাণিজ্য, ক্রীড়া, রাজনীতি, ফ্যাশন জগতের প্রতিনিধিদের মধ্যে অনামিকার উজ্জ্বল উপস্থিতি তাঁর অনেক প্রাপ্তির মধ্যে সেরা বলে মনে করেন অনামিকা। একেবারে হালে হাভার্ড বিজনেস স্কুলে ইন্ডিয়ান কনফারেন্স ২০১৭ সালে প্যানেল ডিসকাশনে বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। ভারতীয় ফ্যাশনে অনন্য অবদানের জন্য ২০১৬ সালে হল অব ফেম পুরস্কার পেয়েছেন আমাদের কলকাতার শ্রীমতী।

Related Stories