অভিনন্দন! আপনার খামতিই নিহীত শক্তি!

(লিখছেন ইংরেজি ইওর স্টোরি প্রতিষ্ঠাত্রী এবং প্রধান সম্পাদিকা শ্রদ্ধা শর্মা)

0

কাল বাঙ্গালুরুর রাস্তায় ১০ কিলেমিটার পেরোতে আমার ১ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। ‌যতক্ষণ গাড়িতে ছিলাম মনে হচ্ছিল শামুকের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছি। গাড়িতে যে সময় নষ্ট হচ্ছিল, ভেবেছিলাম ফোন করে তার কিছুটা কাজে লাগাই। সে গুড়েও বালি। সমানে কল ড্রপ হয়ে যাচ্ছে। কারণ আমার নেটওয়ার্ক, সবসময় যা করে থাকে, নুন্যতম ‘নো কল ড্রপ সার্ভিস' দিতে পারেনি। সামান্য একটা ফোন কলও ঢুকছিল না। ঝকঝকে থ্রিজি ডাটা কানেকটিভিটির কথা তো বাদই দিন। আর এই সবকিছুই ঘটছিল এমন একটা শহরে যাকে ভারতে প্রযুক্তির রাজধানী বলা হয়।

ভারতে উদ্যোক্তা হওয়ার রাস্তাও এমন নানা নাটক, নাটকীয় মুহূর্তে ভরা। আপনি জানেন না কত রকম প্রসাশনিক নাগপাশ আর ভোগান্তির বড় বড় পাঁচিলের মুখোমুখি আপনি হতে চলেছেন। এর একটা মূল কারণ হল পরিকাঠামোর অভাব। কারণ দেশের আয়তন চিনের এক তৃতীয়াংশ। ওইটুকুনির মধ্যে এত লোক গুটিসুটি মেরে থাকে। অথচ আয়তনে বড় হয়েও চিনে আমাদের সমানই লোকসংখ্যা।

আরও অনেকের মতো আমারও রাগ হয়, দু্খ হয়, হতাশা চেপে ধরে। বেশিরভাগ সময় নিজেকে সান্তনা দিই এই বলে, প্রতিদিন আমার সঙ্গে এর চাইতে ভালো কিছু ঘটতে পারে না।

বিশ্বাস হচ্ছে না তো? আপনাদের একটা গল্প বলি। গর্বের সেন্ট স্টিফেন কলেজে পড়তে পাটনা থেকে সবে দিল্লি যাই আমি। সেই সময় একটা বিতর্ক সভায় অংশ নিতে আবেদন করি। পটনায় বহুবার আন্ত-স্কুল বিতর্কে জিতেছি। তাই ভেবেছিলাম বিতর্কে অংশ নেওয়ার জন্য আমার নির্বাচিত হওয়া কোনও ব্যাপারই না। কিন্তু আমাকে নেওয়া হল না। কারণ যেসব নিয়ম মানতে হবে তার কোনওটাই আমি জানতাম না। সেখানে বক্তব্য পেশ করার একটা নিজস্ব ভঙ্গি রয়েছে। যুক্তি খণ্ডনের আবার আলাদা ব্যাপার এবং আরও অনেক কিছু। যাইহোক আমাকে ডাকা হল না, কারণ এত নিয়ম কানুনের কিছুই আমি জানতাম না। ভেঙে পড়লাম, হতাশা গ্রাস করল আমাকে।

গরমের ছুটিতে যখন পাটনা ফিরি, আমার স্কুলের শিক্ষিকা রেখা শ্রীবাস্তবের সঙ্গে দেখা করতে যাই। আমার এই তিক্ত অভিজ্ঞতা আর হতাশার কথা তাঁকে জানাই। এতদিন ভেতরে ভেতরে রাগ পুষে রেখেছিলাম। দিদিমনিকে পেয়ে আর আটকালো না। একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলি, পটনা নটর ড্যামকে যেখানে ভালো স্কুলগুলির মধ্যে অন্যতম বলে মানা হয় সেখানে নিজের পড়ুয়াদের কেন দিল্লির ধাঁচে তৈরি করা গেল না? আমরা জানিই না দিল্লির মতো জায়গায় আসলে কী চাওয়া হয়? আর সেই করণেই বিতর্কসভার প্রথমিক ধারণাগুলিই আমাদের মধ্যে ছিল না...আরও অনেক অনুযোগ করি।

আমার গরম গরম বক্তৃতার পুরওটাই তিনি ধৈর্য ধরে শুনলেন। এবার হেসে বললেন, তুমি যা পাওনি, সেটাই তোমাকে দৌড় করাবে। যা পাওনি, যা শেখনি, যা তোমার নেই, সেটাই তোমার মধ্যে সাফল্যের আগুন জ্বালিয়ে দেবে। ১৯৯৯ এর গ্রীষ্ম পর্যন্ত দিদিমনির সেই কথাগুলি আমার কানে বাজত। আমার যা খামতি এবং যেটা জানতাম না সেটাই যেন প্রতিদিন আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যেত। দুখ কেমন না জানলে সুখের অনুভব পাব কীভাবে? যদি না হারি, জেতা কী জিনিস জানব কীভাবে? অভাবের অভিজ্ঞতা না থাকলে প্রাচুর্যের সত্যিকার অনুভব হবে কীভাবে? উদ্যোক্তা, ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা, আমাদের সবার কাছে ভারতে সুযোগের অভাব নেই। আমাদের অনেক কিছু করার আছে। উদ্যোক্তা হিসেবে, দেশ হিসেবে আমাদের যা খামতি আছে সেটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করে দেবে। যা নেই সেটা পাওয়ার যে চাড়, সেটাই জ্বালানী হয়ে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে।

ভাবুন তো একবার সেই আগুন, সেই চালিকাশক্তি ১০০ কোটি মানুষের জীবন পালটে দিতে কী না করতে পারে? ভারতে আমাদের অনেক সমস্যা আছে। একইসঙ্গে যার মানে দাঁড়ায়, যারা একটু আলাদা কিছু করতে চায় তাদের জন্য ভারতে সুযোগের বড় বাজার রয়েছে। যে কোনও সমাধান গ্রহণ করতে এগিয়ে আসবেন আরও কোটি কোটি। বদল প্রয়োজন- আরও ভালো কিছুর জন্য বদল, সত্যি অসাধারণ। দুনিয়ার সবার সেরা আমাদের এই হিন্দুস্থানই সবচেয়ে বড় সুযোগ। আসুন আমরা বরং আমাদের খামতিগুলিকে উপভোগ করি। এই বছরের টেকস্পার্কস-এ সবাই মিলে ভিড় জমাই।

( মূল নিবন্ধটি লিখছেন ইংরেজি ইওর স্টোরি প্রতিষ্ঠাত্রী এবং প্রধান সম্পাদিকা শ্রদ্ধা শর্মা )