পুজোয় দিল্লির স্লোগান ‘গো গ্রিন’

0

মণ্ডপে মণ্ডপে আলোর রোশনাই। হাজার হাজার ওয়াটের আলো ত্রিনয়নীর মুখে। কত রকমারি সাজ। আক্ষরিক ভাবেই আলুর বেণুতে ভুবন মাতোয়ারা। উসৎবের অনুরণন একদিন মিলিয়ে যাবে, কিন্তু থেকে যায় কিছু যন্ত্রণা। শাড়ি, শ্যাম্পু থেকে পুজোকমিটি গুলির বিজ্ঞাপন দেওয়া রাস্তায় রাস্তায় ফ্লেক্স, ব্যানারের কোথায় ‘পুনর্বাসন’ হবে কেউ জানেন না। সীসা ভর্তি রঙে রঙিন প্রতিমা বিসর্জনের পর জলজ প্রাণীদের কী অবস্থা হবে সেকথা ভাবার অনেকেরই সময় নেই। তারওপর চরম দাহ্য পদার্থে ঠাসা মণ্ডপে কিছু অঘটন ঘটে গেলে তার কী হবে সেই উত্তরও অজানা। পরিবেশ বাঁচলে আমরাও যে বাঁচব, তাৎক্ষণিক হিসাবে চট করে তাই মাথায় আসে না। এড়িয়ে যাওয়া এমন সব বিষয় নিয়ে অনেক হোমওয়ার্ক করেছে দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের বেশ কিছু পুজো কমিটি। তারা মণ্ডপ পরিবেশ বান্ধব করেই ক্ষান্ত হয়নি, এত্তা জঞ্জালের কী গতি হবে তার ব্যবস্থাও করেছে, পাশাপাশি অন্যদেরও বোঝাচ্ছে এর গুরুত্ব।

এই যেমন দক্ষিণ দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের ডি ব্লক পুজো কমিটি। গর্বের সঙ্গে এই পুজোর উদ্যোক্তারা দাবি করেন গত ১৮ বছর ধরে তাদের মণ্ডপ পরিবেশবান্ধব ভাবে তৈরি। তারা প্লাস্টিকের সামগ্রী এক্কেবারে বদলে দিয়েছে। পুনর্বব্যহারযোগ্য কাগজ দিয়েই এখানকার সমস্ত কারুকাজ। সতর্কভাবে থার্মোকল এবং ধাতব জিনিসকে পাল্টে দেওয়া হয়েছে। তার বদলে খড়, মাটির পটের মতো জৈব জিনিস ব্যবহার করেছে। এই পুজো আলোর ব্যবস্থা এমন ভাবে করা যাতে বিদ্যুৎ বেঁচেছে। এই পুজো কমিটি তাদের বিজ্ঞাপনের প্রায় ৮০ শতাংশ ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যম অর্থাৎ এলইডি, এলসিডি দিয়ে করেছে। যার ফলে কার্বন নির্গমন তারা অনেকটাই কমাতে পেরেছে। উদ্যোক্তারা মনে করেন দুষ্টের দমনের জন্যই তো মা দুর্গার আগমন। সেই ভাবেই যদি ধরা হয় তাহলে ‌দূষণ নামের অসুরকে তারা বাগে আনতে পারবেন। তাই প্রকৃতি ও পরিবেশকে বাঁচাতে এমন উদ্যোগ। দর্শনার্থীদের সুবিধায় এই মণ্ডপে ফ্রি ওয়াই ফাই জোন করা হয়েছে।


পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভ। পরিচিত এই পুজো এবার রজত জয়ন্তীতে পড়ল। তাদের মণ্ডপও ফ্রি ওয়াই ফাই জোন। এই পুজো কমিটি তাদের মণ্ডপ ও প্রতিমাকে পরিবেশ বান্ধব করে তোলার ব্যাপারে আন্তরিক। বিসর্জনের সময় দূষণ যাতে না ছড়ায়, তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করেছেন উদ্যোক্তারা। চিত্তরঞ্জন পার্কের বি ব্লকের এই পুজোর মাঠের মধ্যে একটি ট্যাঙ্ক করেছে। যেখান প্রতিমা নিরঞ্জন হবে। এই বিষয়ে ওই পুজো কমিটিকে পরামর্শ দিয়েছে ‘ফ্রেন্ডস অব যমুনা’ বা এফওআই নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। যারা বোঝাতে পেরেছে কীভাবে পুজোকে আরও সবুজ করা যায়।

এফওআই চায় পুজোর সময় দূষণ নামের অসুরের বিনাশ হোক। কিন্তু সেটা কীভাবে হবে। ওই সংস্থা পুজোকে দূষণহীন করতে পুজো কমিটিগুলিকে নানা রকম পরামর্শ দেয়। সবরকম ভাবে সহযোগিতা করে। তাদের কথায় একটি পুজোর মূর্তি মাটি দিয়ে তৈরি হয়েছে। যেখানে কোনওরকম কৃত্রিম রঙ নেই, বায়োডিগ্রেবল সামগ্রী থাকে। বিসর্জনের সময় বাইরে কোনও জলাশ বা নদীতে নয় মণ্ডপের মধ্যে একটি জায়গায় প্রতিমার নিরঞ্জন করা হয়। এফওআই-এর পরামর্শে এভাবেই পুজোকে সবুজ করার পথে এগিয়েছে

পুজো সকলের। আবার সকলের নয়। ভিড়ের চাপ বয়স্করা অনেক সময় ইচ্ছে থাকলেও পুজো মণ্ডপে যেতে পারেন না। দিল্লির বেশ কিছু পুজো উদ্যোক্তারা এই বিষয়ে প্রবীণদের পাশে। বরিষ্ঠ নাগরিকদের আরও মণ্ডপমুখী করতে তারা নানা রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বয়স্কদের জন্য অঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে ডি ব্লক পুজো কমিটি। কো-অপারেটিভ দুর্গা পুজো কমিটি আবার প্রবীণদের সুবিধার জন্য ই রিকশার ব্যবস্থা করেছে। চিত্তরঞ্জন পার্কের পুজো কমিটিগুলো কুইজ, ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উৎসবের মুহূর্তগুলিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলার চেষ্টা করেছে।

দিল্লির পুজো ঘিরে কত আয়োজন। কত নতুন ভাবন। পরিবেশ বাঁচানোর শপথ। সিআর পার্কের ডি ব্লকের পুজো নিয়ে শর্ট ফিল্ম বানিয়ে ইউ টিউবে তা আপলোডও করে ফেলেছে একটি সংস্থা। তাদের কথায় এই শর্ট ফিল্ম দেখিয়েছে মহামায়ার মিথ এবং বাঙালিদের কাছে উৎসবের আবেগ কত গভীরে।‌ কীভাবে বাঙালিদের তা উদ্দেলিত করে দেয়। এর মধ্যে ডি ব্লকের পুজো নিয়ে দুটি ক্লিপ ১৫০০ এর বেশি হিট পেয়েছে। ডি ব্লকের উদ্যোক্তারা বলছেন অনেকের সহযোগিতা, স্বেচ্ছাসেবকদের নিরলস চেষ্টা এবং ভগবানের আর্শীবাদ। এভাবেই মূল্যবোধ তৈরি হয়, সচেতনতা বাড়ে। হয়তো এভাবেই একটু একটু করে সবুজের পথে এগিয়ে যাব আমরা।

Related Stories