তুল্যমূল্য  বিচার করেন উদ্যোগপতি ইন্দ্রনীল

0

মূল্য নিয়ে পাড়ার পিশেমশাই থেকে ইশকুলের মাস্টার মশাই, মাছের বাজারে বৌদিমণি সবাই খুব কনসাস। কার কী মূল্য কেউ জানি না, শুধু মূল্য বাড়লে হইচই করি। কমলে আহ্লাদে আটখানা। সব জিনিসের ক্ষেত্রে অবশ্য এক নিয়ম নয়। আপনি যদি কিছু বেচতে চান তার মূল্য কিছুতেই কমানো হোক আপনি চান না। কিন্তু বাজার আপনার ভাবাবেগে গতিশীল নয়... সে চলে নিজের নিয়মে। আরও একটা নিয়ম অবশ্য আছে সে হল থিওরি অব রিলেটিভিটি। আজ্ঞে হ্যাঁ। রামের চেয়ে শ্যামের দাম বেশি। কারণ সে এমবিএ করেছে, আর রাম শুধু বিএ পাস। কিংবা ধরুন আপনি লেখাপড়ায় গোল্লা পেয়েছেন কিন্তু পার্টি অফিসে গেলে ছেলে ছোকরারা চেয়ার ছেড়ে দেয়। আড়ালে বিড়ি ফোঁকে। বুঝতে হবে আপনার মূল্য আছে। কিন্তু কত মূল্য। আপনি যাকে চেয়ার ছেড়ে দেন আর যার আড়ালে ফাইভ ফিফটি ফাইভ ধরান, পান করলে যার সামনে যেতে চারটে পান ঠোসেন এলাচ, চমন বাহার, আর সুগন্ধি মশলা দিয়ে, গোলাপ জলে ধুয়ে... আপনার দাম তাঁর থেকে কম নিশ্চয়ই! তাহলে মূল্যের একটা হায়ারার্কি আছে, বলুন! বাংলায় যাকে বলে তারতম্য। কথ্য ভাষায় বেশকম।

সমাজের জ্যাঠামশাইরা যখন ছিছিক্কার করে আর বলে, “গেল! গেল! মূল্যবোধ বলে কিছু রইল না...” তখন ভেবে দেখবেন ওরা নিজেদের মূল্যবোধের কথাই বলেন! সমাজ আসলে নতুন মূল্যবোধ পেয়ে গিয়েছে, তাই আর পুরনো মূল্যবোধের নিরিখে সেগুলির কোনও মূল্য নেই। আবার নতুনের চোখেও পুরাতনের মূল্য হ্রাস পেয়েছে। তাহলে সময় একটি এক্স ফ্যাক্টর বলতে হবে। সময় বড় গোলমেলে জিনিস। ‘অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ’ হল সময়ের মূল্য আছে। ধান্দাবাজ লোকেরা বলে Time is money আর দার্শনিক টাইপের শিক্ষকরা বলেন সময় অমূল্য। খুব গোলমেলে... কিন্তু একটা কথা সাদা চোখে দেখা যাচ্ছে যে সময়ের দাম বিচার করা সবার কম্ম নয়।

আসুন আপনাদের সঙ্গে এমন একজনের আলাপ করিয়ে দিই যিনি আকাশের নীচে সমস্ত জিনিসের মূল্য বাতলে দিতে পারেন। হাত গুণে নয়। রীতিমত অঙ্ক কষে।

ইন্দ্রনীল আইচ। কলকাতার তুখোড় উদ্যোগপতি। আদতে ইঞ্জিনিয়ার। তাই জানেন কোনও কিছু তৈরি করতে কতটুকু কাঠ খড় পোড়াতে হয়। কী কী সামগ্রী দিয়ে তৈরি হয় সাফল্য। বলছিলেন, পড়াশুনোকেই জীবনে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। রক্তে ব্যবসা ছিল না। বাবা কাকা সকলেই প্রায় ব্যাঙ্কে চাকরি করেছেন। কেউ কেউ করেছেন পুলিশে, সিবিআইয়ে। ফলে ইন্দ্রনীল যখন ২০০৯ সালে ব্যবসা করার কথা ভাবলেন তখন সকলের কাছেই সেটা একটা কালচার-শক। কিন্তু এক পয়সা ধার দেনা না করে রীতিমত নিজের মুরোদে ব্যবসা শুরু করেন ইন্দ্রনীল। তার আগে ১৯৯৫ থেকে ২০০৯ এই ১৪ বছরে বিভিন্ন সংস্থায় ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করেছেন। দেশি বিদেশি সংস্থায় কাজ করার সুবাদে অভিজ্ঞতা বেড়েছে। শেষ চাকরি করেছেন Ingersoll Rand এর মতো বহুজাতিক সংস্থায়। Ingersoll Rand এর হয়ে ভারতে মার্কেটিং এর দায়িত্ব সামলেছেন ইন্দ্রনীল। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। তারপর থেকেই নিজে কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন। সঙ্গে পেয়ে যান সহকর্মী সুস্মিতা নায়েককে। শুরু হয় ক্যাটআইচ ইনফ্রাকোর ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড। সংস্থায় যোগ দেন স্ত্রী ঝুমা আইচ। ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে আইচ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। মাথা তুলতে থাকে একের পর এক সংস্থা। ইঞ্জিনিয়ারিং সরঞ্জাম সাপ্লাই থেকে শুরু করে সরঞ্জামের মূল্যায়ন করা পর্যন্ত সব রকম কাজই করতে থাকে ইন্দ্রনীলের সংস্থা। এখন মূলত ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী থেকে গাড়ি, বাড়ি, কোম্পানি এমনকি আর্থিক প্রোডাক্ট সবেরই মূল্যায়ন করে আইচ অ্যাপ্রেইজার্স অকশনার্স অ্যান্ড ভ্যালুয়ার্স। এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে সাফল্যের দৌড়টা দারুণ দৌড়েছেন ইন্দ্রনীল আইচ।

শুরুর দিকে বন্ধুরা এগিয়ে এসেছে। ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তাঁর দক্ষতার ওপর ভরসা করেছিলেন বাজাজ ফিনসার্ভের তদানীন্তন বিজনেস হেড সঞ্জীব ভিজ সেটাই ছিল প্রথম ব্রেক। ইন্ডাসইন্ড ব্যাঙ্ক এবং বাজাজ ফিনসার্ভ তাদের যাবতীয় কনস্ট্রাকশন ইকুইপমেন্ট এবং গাড়ির ভ্যালুয়েশনের কাজের দায়িত্ব দেয় ইন্দ্রনীলের সংস্থাকে। ছয় মাসে ঘুরে যায় সংস্থার তকদির। এখন এই ছয় বছরে তাঁদের ক্লায়েন্ট তালিকায় রয়েছে গোটা তিরিশেক ব্যাঙ্ক এবং ফিনান্সিয়াল ইন্সটিটিউশন। ধীরে ধীরে ভ্যালুয়েশনের কাজটাই হয়ে ওঠে আইচ অ্যাপ্রাইজার্সের ইউ এস পি। এবং ক্লায়েন্টের তালিকা বাড়ানোর জন্যে কখনও বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়নি। যারা ইন্দ্রনীলদের কাজে খুশি হয়েছেন তারাই ওদের কথা অন্যদের বলেছেন। এবং একের পর এক কর্পোরেট ক্লায়েন্ট পেয়ে গিয়েছেন ইন্দ্রনীল। তৈরি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কও। আর এটা করতে গিয়ে একটু একটু করে তৈরি হয়ে গিয়েছে দুর্দান্ত একটি টিম।

বলছিলেন ছোটবেলা কেটেছে কার্শিয়ঙয়ে। পড়াশুনো করেছেন গোয়েথালস মেমোরিয়াল স্কুলে, কঠিন নিয়মতন্ত্রের মধ্যে। তার প্রভাব পড়েছে পরবর্তী জীবনে। ছোটবেলার পাহাড় তাঁকে মাথা তুলে বাঁচতে শিখিয়েছে। অনেক উঁচু উঁচু স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। কিন্তু কলকাতাকেও তিনি মিস করেছেন ছোটবেলায়। বালক বেলায় যখন ফিরে এসেছেন এই শহরে। কলকাতাকেই প্রাণ ভরে ভালবেসেছেন। এখনও তাই কলকাতা ছেড়ে কোথাও যেতে চান না। ব্যবসা বাড়াতে চান। ল্যাটিন আমেরিকার দেশে ব্যবসা পৌঁছে দিতে চান ঠিকই, কিন্তু কলকাতায় শিকড় গেড়েই গোটা দুনিয়ায় পল্লবিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখেন এই শহরকে ঘিরেই। কথা বলতে বলতে কলকাতার অনেক ত্রুটির কথাও বলছিলেন তিনি। কিন্তু নিন্দের মতো করে নয়, সমস্যা গুলোকে চিহ্নিত করে তার কীভাবে সমাধান সম্ভব তাই বলছিলেন ইন্দ্রনীল। তরুণ প্রজন্মের প্রাণ শক্তিতে মুগ্ধ এই উদ্যোগপতি মনে করেন, কলকাতায় স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি হচ্ছে এটা ভালো কিন্তু শুধু টেক স্টার্টআপ হলে আদতে কলকাতার লাভ নেই। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন ব্রিক অ্যান্ড মর্টার মডেলে। বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেন প্রোডাকশন ইউনিট চাই। কর্মসংস্থান হবে তাহলেই। সমস্যার সমাধান হবে। এঁকে বেঁকে অনেক পথের কথা বলছিলেন ইন্দ্রনীল। সবগুলো পথই এই রাজ্যের উন্নয়নের আশু সমাধানের পথ, সবগুলোই স্বপ্নের কলকাতা কেমন হওয়া উচিত তাই নিয়ে।

জিজ্ঞেস করেছিলাম, কলকাতার কোনটিকে আপনি সব থেকে বেশি মূল্য দেন?
বললেন, "কলকাতার শিল্প সংস্কৃতি রাজনীতি এসবের আর তত মূল্য নেই, কিন্তু এই শহরের আন্তরিকতাই অন্য যেকোনও মেট্রোর থেকে বেশি মূল্যবান করে রেখেছে।"
পরের প্রশ্ন ছিল, শিল্পী যখন কিছু দেখেন তখন যেকোনও জিনিসের ভিতরই শিল্প খোঁজেন। তার প্রতিফলন হয় ক্যানভাসে। তেমনি একজন শিক্ষক অধিকাংশ মানুষের ভিতর ছাত্রকে খুঁজতে থাকেন। অথবা শিক্ষাকে। এগুলো হতে পারে প্রফেশনাল হ্যাজার্ড কিন্তু এগুলো হয়। তেমনি কি আপনিও আকাশের নীচে যাবতীয় জিনিসের মূল্য মাপতে থাকেন, অন্তত এটাই যখন আপনার সংস্থার ক্যাচলাইন, তখন এটা কি আপনারও অভ্যাস?

সুবক্তা ইন্দ্রনীল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় ভাষণ দেন। টেড টকে ভাষণ দিতে চান। নিজের লড়াইয়ে তৃপ্ত একটি মানুষ। গভীর ভাবে ভেবে বললেন মানুষের ভিতর তিনি মৌলিক মূল্যই খোঁজেন। কতদূর সম্ভাবনা আছে এটাই তাঁর চোখে পড়ে। এখনও সময় পেলেই পড়াশুনোই করতে ভালোবাসেন। সম্প্রতি ডক্টরাল থিসিস নিয়েও ভীষণ সিরিয়াস। 

প্রাণ খোলা এই মানুষটি। প্ৰথম প্রজন্মের ব্যবসায়ী। পরিবারের লোকেদের নিয়েই প্রথমে টিম সাজিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের পরিধি যত বেড়েছে টিমের আয়তনও বেড়েছে। গোটা টিমটাকেই নিজের পরিবার বানিয়ে ফেলেছেন এখন। তাই বেড়াতে গেলেও গোটা টিমকে ট্যাঁকে নিয়ে ঘুরতে যেতে ভালোবাসেন। মুখে বলেন ওরা আমার এক্সটেন্ডেড পরিবার। ৪৫ অনূর্ধ্ব এই যুবকের চোখে তখন আবেগ আর স্বপ্ন চিকচিক করে।

Related Stories