টানা তিরিশ বছর গলা কাচে ফুঁ দিয়ে শিল্প গড়েন শ্রীলা

1

গলিত কাচের পিণ্ডে তাঁর নিঃশ্বাস বানিয়ে তোলে অপরূপ শিল্প। ছোটবেলায় ভেনিসে যখন ছিলেন তখনই এই বাঙালি শিল্পী তখন প্রায়ই গ্লাস ব্লোয়ারদের কাজ দেখতে যেতেন। তাদের দেখে দেখে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল শ্রীলার সেই ছোটবেলায়। তার পর যত বড় হয়েছেন শিল্পটাকে ভালোবেসে ফেলেছেন। তাঁর প্রাণবায়ু দিয়ে বানানো শিল্পকীর্তি এখন গোটা বিশ্ব চেনে। শ্রীলা মুখোপাধ্যায়। দেশে হাতে গোনা যে কজন গ্লাস আর্টিস্ট রয়েছেন তাঁদের একজন এই বাঙালি শিল্পী। তিনি বিরল শিল্পীদের মধ্যে পড়েন কারণ নিজেই হাঁপর চালান। কাঁচ গলিয়ে লাল, নীল নানা রঙের নানা আকারের কাচের বয়াম তৈরি করেন। শ্রীলার এক এক ফুঁ—য়ে তৈরি হয় এক একটি শিল্পকীর্তি। কাচশিল্পের পীঠস্থান ফিরোজাবাদে এমন হাঁপর আর কাচের কারিগর অলিতে গলিতে চোখে পড়ে। কিন্তু স্টুডিওতে গোটা কারখানা তুলে এনে কাচের বয়ামে শিল্পিত রূপ দিতে খুব একটা দেখা যায় না। নিজেকে সেদিক থেকে একেবারেই আলাদা করে রেখেছেন কলকাতার শ্রীলা।

ন্যাশনাল ইন্সস্টিউট অব ডিজাইন থেকে সেরামিকসে স্পেশালাইজেশন করেছেন। এরপর সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার Pentik এবং পটারি স্টুডিও Eiropaja য় শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন। পাড়ি দেন লন্ডন গ্লাসব্লোয়ারের প্রশিক্ষণ নেবেন বলে। ‘অনেক শিল্পী রয়েছেন যারা কাচ নিয়ে কাজ করেন। স্টেন গ্লাসের কাজ কিংবা অন্য কিছু। কিন্তু পুরাদস্তুর হাপর চালাতে অনেকেই জানেন না। যারা জানেন তারাও হাঁপর চালান না কারণ তাঁদের নিজেদের স্টুডিও নেই। অন্যের কারখানায় গিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হয়। আর শ্রীলা স্বয়ং সম্পূর্ণ। যখন হাপর চালানো শুরু করেন তখন নানান আইডিয়া মাথায় আসতে থাকে। সেই স্রোত ধরেই একেকটি কাচের পিণ্ড একেকটি শিল্পে রূপ পায়। কাজ শুরু করার আগে যার সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও ধারণা থাকে না। রীতিমত কবিতার মত একেকটি শিল্পকীর্তি অবয়ব নিয়ে গড়ে ওঠে। শিল্পীর অবচেতনের অস্পষ্ট অথচ তীব্র অনুভূতির এক অনবদ্য প্রকাশ। নিজের স্টুডিও ওয়ার্কশপ ‘আকৃতি’তে বসে এভাবেই শ্রীলা আবিষ্কার করছিলেন তাঁর সৃজন রহস্য।

সেই ১৯৮৭ সাল থেকে একটানা কাচ নিয়ে কাজ করে চলেছেন শ্রীলা। ৩০ বছর। তাঁর হাতে রূপ পেয়েছে অসামান্য সব শিল্পকর্ম। শিল্পীর মতে, ভারতে শিল্পের মাধ্যম হিসেবে কাচ এখনও তেমনিভাবে জনপ্রিয় নয়। ফলে গ্লাস আর্টিস্ট হওয়া খুব একটা সোজা কাজও নয়। প্রথম দিকে কাজের জন্য কলকাতার Central Glass and Ceramics Research Institute থেকে কাচ জোগাড় করতে হত। তারপর LaOpala-র ফেলে দেওয়া কাচ নিয়ে আসতেন। এখন অবশ্য বিদেশ থেকেও কাঁচামাল আনেন।

বিখ্যাত ফিল্মমেকার এবং কাচশিল্পী অ্যান্টনি স্টার্নের সান্নিধ্য পেয়েছেন শ্রীলা। তাঁর কাছে কাজও শিখেছেন অনেক। বলছিলেন, তাঁর সময়ে ভারতে গ্লাস আর্ট নিয়ে পড়াশোনা খুব বেশি এগোনোর সুযোগ ছিল না। এখনও সেভাবে নেই। সেরামিকসে গ্রাজুয়েশনের পর ফিনল্যান্ডে Pentik এ কাজ শেখা শুরু করেন। সেখান থেকে দেশে ফেরার পথে লন্ডনে আটকে যান। ওখানেই অ্যান্টনি স্টার্নের সঙ্গে দেখা হয়। পরের এক বছর বিখ্যাত লোকটির কাছে হাতে কলমে কাজ শিখেছেন। জীবনে পাঁচ পাঁচ জন দুর্দান্ত শিক্ষক পেয়েছেন শ্রীলা। প্রত্যেকের শেখানোর আলাদা আলাদা কায়দা। একজন সূক্ষ্ম জিনিস নিয়ে কাজ করতে শিখিয়েছেন তো অন্য জন ভাস্কর্য তৈরি করতে শিখিয়েছেন। কেউ কোল্ড ওয়ার্কড তো কেউ শিখিয়েছেন প্রিজম, লন্ডনে The Glasshouse এ শিক্ষানবিশির সময় নিজের অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছিলেন শ্রীলা।

এতকিছুর পরও কোথাও একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছিল। নিজের স্টুডিওতে হাপর বসিয়ে হাতেকলমে কাজটা করতে না পারলে শান্তি হচ্ছিল না। ‘৮৬—৮৭ সাল নাগাদ যখন বিদেশ থেকে ফিরে আসেন তখন তো দেশে মুক্ত অর্থনীতি ছিল না। ফলে বিদেশ থেকে কিছু নিয়ে আসা রীতিমতো দুঃস্বপ্ন ছিল। তাই সেপথে হাঁটতে চাননি। যেসব যন্ত্রপাতি দরকার ছিল তার ছবি, ড্রইং নিয়ে প্রায় বছর দেড়েক নানান জনের দরজায় ঘুরেছেন। একটা ফার্নেস তৈরি করে দেওয়ার জন্য বলতে যার কাছে গিয়েছেন প্রত্যেকেই বলেছেন ‘হবে না’। ফার্নেস নাকি তৈরিই করা যাবে না’, উত্তেজিত শোনায় শ্রীলার গলা। স্টুডিওতে ফার্নেস তৈরি করাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন শ্রীলা। প্রায় দুবছর সময় লেগেছিল ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা থাকবে এমন একটা ফার্নেস নিয়ে স্টুডিওর কাজ সম্পূর্ণ করতে। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শ্রীলার এক এক ফুঁয়ে লাল, নীল, সবুজ নানা রঙের কাঁচের শিল্প তৈরি হয়েছে। স্টুডিওর যেদিকে চোখ যায় রেক, শেলফ, টেবিল, হ্যাঙ্গিং সবদিকে সূক্ষ্ম শিল্পের ছোঁয়া লাগা গ্লাস-ওয়ার্ক। বড় হলে দিনে পাঁচটি আর ছোট হলে ২০টি গ্লাস-ওয়ার্ক, এই হিসেবে কাজ ভাগ করে নিয়ে স্টুডিওতে ডুবে থাকেন শ্রীলা। নানা প্রদর্শনী ছাড়াও কলকাতার বিখ্যাত গয়না ডিজাইনার ইনা আলুওয়ালিয়ার সঙ্গে জুটি বেঁধে কনসেপ্ট জুয়েলারি ডিজাইন করেছেন।

ফুলদানি, পাত্র হোক বা প্লেট, রঙের সঙ্গে খেলা করেন শ্রীলা। যত্নে তৈরি করা এক একটা বাঁক, নানা আকার, নানা রঙের ব্যবহার গানের সুর অথবা কবিতার ছন্দ যেন। শিল্পের সঙ্গে প্রযুক্তি, ভারসাম্যের এক অদ্ভুত মিশেল। লম্বা লোহার পাইপের মধ্যে দিয়ে শ্রীলার এক একটা ফুঁ কাঁচের বুদবুদকে চুল্লির ভেতরে গলিয়ে দেয়। পাইপের মাথায় একটা কাঠি মত থাকে যেটা দিয়ে কাচে রং মেশান শিল্পী। এরপর গরম গলানো কাচের পিণ্ড চুল্লি থেকে বের করে নানা আকার দিতে হয় ভেজা খবরের কাগজ দিয়ে। এরপর অন্য একটি ওভেনে রেখে ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা করা হয়। তৈরি হয়ে যাওয়া জিনিসটিকে। পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে নিখুঁত আঁচ, ঝলসানো এবং আকৃতি দেওয়ার ওপর। যতক্ষণ পর্যন্ত না ঠিক শেপ আসছে ততক্ষণ গরম করেই যেতে হয়। কাচ এমন একটি পদার্থ গরম না থাকলে কোনও আকারই দেওয়া সম্ভব নয়। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সে প্রায় প্রতিদিনই হাঁপরে কাজ করলে শরীরে তেমন একটা প্রভাব পড়ে না। তার বেশি হলে একটু সাবধান হতেই হয়।

সিরামিকস বা পটুয়া শিল্পে ঝোঁক দেখা গেলেও এখনও গ্লাস বা কাচের শিল্পে তেমন একটা উৎসাহ দেখা যায় না। দুঃখ প্রকাশ করলেন শ্রীলা। তবে সুযোগ এবং অন্যান্য সুবিধা পেলে মেট্রো শহরগুলিতে কাচ-শিল্প জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। নতুন প্রজন্মের গ্লাস আর্টিস্টদের কাছে সেই বার্তা পৌঁছে দিতে চান কলকাতার এই শিল্পী।