হাত বাড়িয়ে কারু‘বন্ধু’ CraftGully.com

0

কুটির শিল্পর বিভিন্ন উপকরন সহজলভ্য করে দেওয়ার জন্য একটা পরিকল্পনার বীজ বোনা হয়েছিল। প্রথমে এলোমেলো কিছু ধারণা, ধীরে ধীরে মিশনে রূপান্তরিত হয়। আর সেই মিশন হল সারা দেশের শিল্পীদের কাছে কুটির শিল্পর সামগ্রী সহজে হাতের কাছে জুগিয়ে দেওয়া। সেই ধারণা থেকে CraftGully.com এর জন্ম।

ক্রাফটগালির একটি দোকান রয়েছে গোয়ায়। অথচ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফিস মুম্বইয়ে। গোয়া কেন? ‘গোয়া নয় কেন? পালটা প্রশ্ন ছুড়লেন ধীরেন্দর। ‘এত সুন্দর দৃশ্য চারদিকে, সবকিছু আমাদের সুন্দর মানিয়েও গিয়েছিল। তাই গোয়াই ছিল প্রাথমিক কাজ শুরুর জন্য আমাদের প্রথম পছন্দ’, জানান ‘ক্রাফটগালি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ধীরেন্দর নিরওয়ানি।

৫০০ কোটি টাকার বাজারের দিকে নজর রেখে ভারতে কারুশিল্পের সবচেয়ে বড় একমাত্র স্টোরের পথ চলা শুরু হয় ২০১৪র গোড়ায়। দুবছরেরও কম সময়ে তাদের হাতে এখন ১৫০০ র বেশি পণ্য এবং সংখ্যাটা ক্রমশ বাড়ছে। ধীরে ধীরে এই অনলাইন স্টোর কারুশিল্পের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠছে।

শুরুতে আন্দামান থেকে অরুণাচল প্রদেশ এমনকী আরও দূরে জম্মু-কাশ্মীর, প্রায় সব রাজ্য চষে ফেলেছেন উদ্যোক্তা স্বামী-স্ত্রী ধীরেন্দর নিরওয়ানি ও কুঞ্জল নিরওয়ানি।CraftGully.com এর প্রতিষ্ঠাতা নিরওয়ানি দম্পতির পেছনের কাহিনীটাও বেশ মজাদার। ধীরেন্দর যদি ‘ক্রাফটগালি’র মাথা হন, কুঞ্জল তবে প্রাণ। দুজনেই নিশ্চিন্ত ক্যারিয়ার ছেড়ে মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছেন ‘ক্রাফটগালি’তে। কুঞ্জলের বরাবরই কুটির শিল্পর প্রতি একটা টান রয়েছ। ক্রাফটের ওয়ার্কশপগুলি তাঁকে উৎসাহ দিত। সেই সময় কুঞ্জলের মনে হয়েছিল এদেশে কুটির শিল্পের জন্য ভালো মানের কাঁচামালের অনলাইন বাজার থাকলে শিল্পীদের সুবিধে হত।

দীর্ঘদিন ডিজটাল মিডিয়ায় কাজের অভিজ্ঞতার সুবাদে ধীরেন্দ্রর তাঁদের এই প্রকল্পের যান্ত্রিক দিকটার দেখভাল করেন। তিনি একসময় কানাডায় ই-গভর্ন্যান্স প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি শাদি ডটকম, শেরখান ডটকম নামে ভারতের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি পোর্টালেও কাজ করেছেন। একেবারে শেষে তিনি কাজ করেছেন আইবিএম ইন্ডিয়ার কান্ট্রি লিডার-ডেভেলপার রিলেশন হিসেবে, সেই হিসেবে দেশের সফটওয়ার ডেভেলপারদের মধ্যে সংস্থার সফটওয়ার পোর্টফোলিও (কাজ)প্রচারের দায়িত্ব ছিল তাঁর ঘাড়ে। ‘চাকরিতে আমার শেষ ভূমিকাটাই ছিল এতবড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে আসল চালিকাশক্তি। ওই কাজটাই আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে’, বলেন ধীরেন্দর।

‘হোক না নতুন যুগে উন্মাদনা সৃষ্টিকারী চুনট অথবা মুষ্টি কারুশিল্প, চিরসবুজ কারুশিল্প যেমন নকল ফুল তৈরি বা গয়না তৈরি, বিশেষ যন্ত্রপাতি বা সাধারণ-‘ক্রাফসগালি’ ক্রেতাদের সহজে তাদের পছন্দের কারু পণ্য হাতের নাগালে এনে দেয়’।

‘ক্রাফটগালি’র সম্ভারে রয়েছে জুতোর ফিতের সংস্থা, ৫০টিরও বেশি রঙের চুনট কাগজ, ১৫ ধরণের মাকড়ির জিনিসপত্র, ৫০ ধরণের রেণু। পাশাপাশি হালফিলের কারুশিল্প ট্রেন্ড ধরতে ‘ক্রাফসগালি’র এক ধরণের কিট (কারুশিল্পে কাজে লাগে এমন যন্ত্রপাতি,কাঁচামাল নিয়ে এক একটি কিট)রয়েছে। যেমন ধরা যাক ঝুমকা কিট। চুনট করা দারুণ সব কানের দুল তৈরিতে যা যা প্রয়োজন সব মিলবে এই কিটে। ‘যেদিন প্রথম অর্ডার পাই সেই মুহূর্তটা আমাদের খুব প্রিয় একটা সময়। তখনও পর্যন্ত সবকিছু ছিল রোমাঞ্চে ভরা। ভেবে দারুণ লেগেছিল যখন আবিষ্কার করলাম দেশের সবকটা রাজ্যে আমরা পৌঁছে যেতে পেরেছি। পথ চলতে চলতে অনেক কিছু শিখেছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল-কম প্রতিশ্রুতি, বেশি সরবরাহ। তাতে ঠিক সময়ে গ্রাহকের হাতে জিনিস পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করা যায়’, বলেন ধীরেন্দর।

লড়াইয়ের ময়দানে ‘ক্রাফসগালি’র প্রতিযোগিতা ইটসিবিটসি ডটইন, দ্য হবি, ক্রাফটস অ্যান্ড আর্টস মেগাস্টোরের সঙ্গে। পণ্যের বিরাট সম্ভার নিয়ে ‘ক্রাফসগালি’র সঙ্গে এদের প্রত্যেকেরই কড়া টক্কর। তবে অনলাইন সুবিধা নিশ্চিতভাবে ‘ক্রাফটগালি’কে প্রতিযোগিতায় অনেক এগিয়ে দিয়েছে। ‘ক্রাফসগালি’ এবার অফলাইন অর্থাৎ সরাসরি বিক্রির জন্য দোকান বাড়াতে আগ্রহী।

‘ক্রাফটগালি’র প্রতিষ্ঠাতাদের কাছে শুরুর লড়াইটা ছিল রোলার কোস্টার রাইডের মতো। ‘অর্ডার নম্বর ১০০০০ ছুঁয়ে বিস্ময় তৈরি হওয়া থেকে অর্ডার নম্বর ২০০০০ পৌঁছাতে অধৈর্য হয়ে পড়া-এই সবকিছুর মধ্যে দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছে। কাজের জন্য ঠিক লোক খুঁজে পাওয়া থেকে সন্তুষ্ট গ্রাহকদের ‘ওয়েল ডান’ বলে পাঠানো একটা ই-মেল-এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলি এতটা পথ আসতে আমাদের প্রেরণা যুগিয়েছে’, উপলব্ধি ধীরেন্দরের। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই স্বীকার করেন, প্রথম দিকে নতুন কাজটা শুরু করা নিয়ে খানিকটা সন্দেহ ছিল নিজেদের মনেই। কিন্তু এখন নিজেদের সিদ্ধান্তে তাঁরা অনড়। আসল কথা হল দুজনেই অন্য ধাতুতে তৈরি, কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন। আর সেটাই তাঁদের সন্তুষ্টি।

এই সংস্থাকে নিয়ে নিরওয়ানি দম্পতির আরও অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে সদ্য লঞ্চ করা মোবাইল অ্যাপও রয়েছে যেটা কারুশিল্পীদের চলতে চলতে বাজার করার সুযোগ দেবে। এনরয়েড সিস্টেমে ক্রাফটগালি মোবাইল অ্যাপ লাইভ পাওয়া যাবে এবং গুগুল প্লে স্টোর থেকে ডাউনলোড করা যাবে।

আরও বেশকিছু শিগগিরই লঞ্চ হতে চলেছে যেগুলি পেশাদার অথবা শখের কারু শিল্পীদের কাজের সময় সব পর্যায়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। দুই প্রতিষ্ঠাতা দম্পতি সব শেষে যোগ করেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সব পর্যায়ের সব কারুশিল্পীদের কাছে পৌঁছে গিয়ে তাঁদের সবরকম যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল সরবরাহ করা যাতে তাঁরা সৃজনশীলতার সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেন’।

Related Stories