বুটস্ট্র্যাপিং থেকেই একশো কোটির লক্ষ্মী লাভ করে দেখিয়েছে MIRRAW

0

বুটস্ট্র্যাপিং করে নিজের সংস্থাকে সম্পূর্ণতা দেওয়ার কাজটা খুব একটা সহজ না হলেও এটা অনেকসময় এগিয়ে যাওয়ার পথে সঠিক পদক্ষেপ হিসাবে কাজ করে। যেকোনো ব্যবসাতেই সাফল্য নির্ভর করে তার লাভের অঙ্কের ওপর। বড় সংস্থার বিনিয়োগ পেলে যেমন ছোট সংস্থার পক্ষে লাভের সংখ্যাটা বড় হয় তেমন আবার অনেক সময় সেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে ছোট সংস্থার জন্য। তাই বিন্দু বিন্দুতেই সিন্ধু তৈরি করাতে বিশ্বাস করেন উদ্যোগী সংস্থা MIRRAW এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা অনুপ নায়ার। ইয়োর স্টোরির সাথে কথা বলার সময় তিনি বলছিলেন যে এই পদ্ধতিতে বৃদ্ধির হার খুব অল্প হলেও সংস্থার ভিত এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অনেক মজবুত থাকে। তিনি বলছিলেন খুব দুর্দিনেও তাঁরা প্রতিমাসে কম করে ২০ শতাংশ লাভ করতে সামর্থ্য হয়েছে এবং সবথেকে বড় কথা হল এই অঙ্কটা বেশ বিশ্বাসযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত।

২০১১ সালে মাত্র একলক্ষ টাকা নিজস্ব পুঁজি বিনিয়োগ করে সংস্থার সূচনা করেছিলেন মিস্টার নায়ার। ব্যবসায়িক পণ্য হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন বিভিন্ন জুয়েলারি সামগ্রী। বছর ঘোরার সাথে সাথে আরও কিছু সামগ্রী যেমন শাড়ি, শালওয়ারের মতো পোশাকি যোগ হয় MIRRAW এর তালিকায়। কিন্তু এসব নতুন প্রোডাক্ট বিক্রির কথা তাঁরা ভাবে তাদের নিজেদের ক্রেতার কথা ভেবেই। প্রথমদিকে বিক্রির টাকা লাগানো হতো পরের মাসের মার্কেটিং এর কাজে। অনেক যুদ্ধের ফল এবং কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আজ তাদের এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে এবং সংস্থা আজ পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ করেছে। গর্বের হাসি মুখে নিয়ে অনুপবাবু বলছিলেন যে এই অর্থনৈতিক বর্ষে তাঁরা প্রায় ১০০ কোটির কাছাকাছি মোট আয় করতে পেরেছে। বলছিলেন যে কতোটা ঠিক বা ভুল করেছেন সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু এইভাবে কাজ করে তাঁরা সফল হয়েছে।

একটা সংস্থাকে সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে সবথেকে বড় এবং কঠিনতম কাজ হল খরচার হিসাবে লাগাম টানা। শুরুর দিনে অনেক কাজই তাদের নিজেদের করতে হয়েছে। ছোট একটু জায়গায় বসে কাজ করা থেকে শুরু করে, দুটো শিফটে কাজ করা – সবই তাঁরা করেছে কিছুটা পয়সা বাঁচিয়ে সংস্থার কাজে লাগানোর জন্য। নিজেরা ডেভেলপিং এর কাজটা জানত বলে প্রথম বছরে কোনরকম ডেভেলপিং খরচ বহন করতে হয়নি তাদের। এছাড়াও বিভিন্ন পেড-সার্ভিস গুলো থেকে তাঁরা থেকেছে অনেক দূরে। বিভিন্ন রকম অফার এবং বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা চেষ্টা করেছে নিজেদের দরকার মেটানোর। আর এইসময় তাঁরা উপলব্ধি করেন যে আসলে একটা সংস্থার উন্নতির পেছনে এইসব পেড সার্ভিসের কাজ ঠিক কতটুকু আর কত সহজে এইসব সার্ভিসকে বিনামূল্যে করা সম্ভব।

কিন্তু একটা সময় আসে যখন এইসব সার্ভিসের সত্যিকারের প্রয়োজন হয় আর যখন তাদের ক্রেতার সংখ্যাটা ক্রমশই বাড়ছিল নির্দিষ্ট হাড়ে, নিজেদের মান বজায় রাখার জন্য, ক্রেতাকে খুশি করার জন্য এই সার্ভিস গুলোর প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল সেই সময়। অনুপবাবু বলছিলেন যে ‘আয় এবং ব্যায়ের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য রাখতে পারলে তবেই এইসব সার্ভিসের কথা ভাবা উচিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যখন সংস্থার ৫০ জন কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন আগামী ছমাসের মধ্যে তখনই কেবল ভালো ডাটাবেস পাওয়ার জন্য পেড সার্ভিসের দ্বারস্থ হওয়া উচিত। একটা প্রচলিত ধারণা আছে যে স্টার্টআপের উন্নতির জন্য কর্মচারীর ওপর বিনিয়োগ খুব গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সাথে সাথে এটাও ভাবা দরকার যে পরিমাণ টাকা কোন কর্মচারীর প্রতি বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তার থেকে সেই পরিমাণ ভ্যালু পাওয়া যাচ্ছে কিনা।

এর সাথে ভাবতে হয় মার্কেটিং এর উপায়। নিজের সংস্থাকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন মার্কেটিং অপশন আছে বাজারে। ছাপানো বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে টেলিভিশন বা রেডিওর মাধ্যমে, স্পন্সরশীপ জোগাড়ের মাধ্যমে নিজের বিজ্ঞাপন করা সম্ভব আজকের দিনে। এছাড়াও কিছু মানুষ থাকে যারা সর্বদা বোঝানোর চেষ্টা করে যে একটা বিজ্ঞাপন হয়তো আপনার সংস্থাকে দ্বিতীয় amazon.com এ পরিণত করে দেবে কিন্তু উনি বিশ্বাস করেন ‘ব্র্যান্ডিং এর অনেক ভালো দিক থাকলেও আমাদের মতো ছোট সংস্থার ক্ষেত্রে অনেক হিসাবকষে এগোতে হয়। তাই আমরা আমাদের সীমার বাইরের বিষয় থেকে নিজেদের যথাসম্ভব দূরে রাখার চেষ্টা করেছি। আমাদের নিজেদের মার্কেটিং প্রচেষ্টার সাথে আমরা বিভিন্ন পেড মার্কেটিং পলিসির তুলনা করে দেখেছি যে সেগুলো আমাদের সংস্থার সমীকরণের সাথে ঠিক খাপ খেতনা প্রথম দিকে। আমরা আমাদের পাই-পয়সা বিনিয়োগের রিটার্ন নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেছি বলেই আমাদের মার্কেটিং পলিসিকে আমরা নিখুঁত করতে পেরেছি।

বৃথা খরচ করার মতো পুঁজি না থাকাটাও অনেক সময় যে কোন ব্যবসার ক্ষেত্রে নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে বলে মনে করেন অনুপ বাবু। নিজেরা অনেকরকম পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে সহজ এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পছন্দ করেন MIRRAW র প্রতিনিধিরা আর এইভাবেই তাদের পক্ষে সঠিক জায়গায় সঠিক বিনিয়োগ করাটা সম্ভব হয়েছে আর তাই যাবতীয় প্রাথমিক বাঁধা টপকে যাওয়ার পর এখন তারা ব্র্যান্ডিং এর জন্য পয়সা খরচ করতে সমর্থ হয়েছেন। আর পরের মাসে খরচ করার মতো যথেষ্ট টাকা যখন কোন সংস্থার হাতে থাকেনা তখন নিজের প্রোডাক্টের উন্নতি করা ছাড়া আর কোন ভালো অপশন খোলা থাকেনা। অনুপবাবুর মতে ব্যবসার সফলতা নির্ভর করে ক্রেতার প্রতিক্রিয়ার ওপর। আপনাকে ক্রেতার পছন্দ, অপছন্দের কথা যেমন ভাবতে হবে তেমনই মাথায় রাখতে হবে নতুন কোন অপশনের কথাও। নতুন নতুন প্রোডাক্ট নিজেদের তালিকায় যোগ করতে হবে। ব্যবহারকারীর মনের কথাটা ভালো করে বোঝার চেষ্টা করতে হবে, সাথে বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে যুগোপযোগী বিভিন্ন পণ্য নিজেদের তালিকার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আর এভাবেই উন্নতি সম্ভব। অনেক বাঁধা আসলেও সেগুলো টপকে যাওয়ার পর সাফল্য আসতে বাধ্য।

তিনি বলছিলেন যে আপনার সাইটে যখন একহাজারের বেশি ভিজিটর আছে কিন্তু তাদের মধ্যে ক্রেতা আছে ৫ জন, তখন আপনার হাতে দুটো অপশন খোলা থাকে। হয় আপনাকে দুহাজার ভিজিটর বানিয়ে তা থেকে দশ জন ক্রেতার সন্ধান করতে হবে, নাহয় আপনাকে ওই একহাজার ভিজিটরের মধ্যে থেকেই ক্রেতার সংখ্যা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয় পদ্ধতিটা অনেক সময়সাপেক্ষ এবং পরিশ্রমী হলেও ভবিষ্যতের জন্য সেটা একটা মূলধন হিসাবে কাজ করে এবং একটা শক্ত কাস্টমার বেস তৈরি করতে সাহায্য করে। আসলে যেকোনো স্টার্টআপ সংস্থার মুল লক্ষ্য হওয়া উচিত তার নিজস্ব ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা এবং বিশ্বাস যোগ্যতা অর্জন করা।

নিজের সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে উচ্ছ্বসিত অনুপ বাবু বলছিলেন যে মার্কেটিং এর জন্য তাঁরা অনেক এজেন্সির সাথে কথা বলেছিলেন প্রথমদিকে কিন্তু তাঁরা কেউই সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্টে সফল ভাবে মার্কেটিং করতে সফল নয়। তাই তাঁরা নিজেরা একটা ভালো মার্কেটিং টীম তৈরি করেছেন যারা নিজেরা খরচ সচেতন, যারা একটা স্বাস্থ্যকর উন্নতিতে বিশ্বাস করে আর নিজেদের মস্তিস্কপ্রসূত সমাধানে বিশ্বাস করেন। কিন্তু এটার মানে তাই নয় যে বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নতি সম্ভব নয়। তিনি বলছিলেন ‘একটা ব্যবসাকে দ্রুত লাভের মুখ দেখাতে অবশ্যই বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন। আমরাও নিজেদের আরও বড় কোম্পানিতে পরিণত করতে চাই আর সেটা ভালো বিনিয়োগ ছাড়া কখনই সম্ভব না। কিন্তু বিনিয়োগ পাওয়ার আগে এটা ভালো করে বোঝা দরকার যে সেই বিপুল টাকা খরচ কোথায় করা হবে আর সেখান থেকে কি পরিমাণ রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। গত কয়েক বছরে স্ব-বিনিয়োগ করে এটা আমরা বুঝেছি যে কোন কোন জায়গায় বড় বিনিয়োগ করলে সেখান থেকে কি পরিমাণ রিটার্ন পাওয়া সম্ভব।

সবশেষে তিনি মনে করেন একটা ব্যবসাকে মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে গেলে সর্বপ্রথম দরকার পরিশ্রমী মনোভাব, সাথে ঠিকঠাক ক্রেতা আর স্বদিচ্ছা। আর স্ব-বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা করে যদি মাসে অন্তত ২০-৩০ শতাংশ লভ্যাংশ টানা সম্ভব হয় তাহলে সেভাবেই ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত কারণ স্ব-প্রবর্তিত বৃদ্ধি যেকোনো ব্যবসায় একটা আলাদা মাত্রা যোগ করে থাকে।

( লেখা – অনুপ নায়ার, অনুবাদ – নভজিত গাঙ্গুলী )