মধ্যবিত্ত বাঙালিকে ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে ‘অ্যাসপারাগাস'

0

ইয়ে জাওয়ানি হে দিওয়ানি সিনেমায় সেই বিলাসবহুল বিয়ের কথা মনে আছে? ছবির অন্যতম চরিত্র অদিতির বিয়ের আসর বসেছিল উদয়পুরের রাজপ্রাসাদে। রাজা-রানি না হয়েও যেন আভিজাত্যের মাঝে দাঁড়িয়ে রূপকথার বিয়ে। বিখ্যাত এক গয়না নির্মাতার বৈদ্যুতিন বিজ্ঞাপনেও সেই রূপকথার বিয়ের হাতছানি। বিয়ের আসর তো নয়, আলো ঝলমল রাতে যেন স্বর্গটাই নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে।

মধ্যবিত্তের কাছে অবশ্য এইসব ব্যাপার স্বপ্ন। ‘সিনেমাতেই ওসব হয়’ গোছের ভাবনা। একটু আধটু শখ যদি বা থাকে সাধ্যে কুলোয় না। অগত্যা রূপকথা-স্বপ্নে ইতি টেনে বাজেটের মধ্যে সাত পাকে বাঁধা পড়াটাই রেওয়াজ। হালে অবশ্য প্রি-ওয়েডিং ফটোশ্যুট নামক এক কনসেপ্টের আমদানিতে বিয়ের গতে বাঁধা আদবকায়দায় কিছুটা ফিল্মি টাচ দেওয়া গেছে। ওইটুকু বাদ দিলে সবটাই থোর-বড়ি-খাড়া।

অ্যাসপারাগাসের আশ্চর্য প্রদীপ

মধ্যবিত্ত বঙ্গবাসীকে ছক ভাঙা বিয়ের স্বাদ দিতে আশ্চর্য প্রদীপ নিয়ে হাজির ‘অ্যাসপারাগাস’। জঙ্গলের মাঝে ঝিঁঝির ডাকের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর হোক বা সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে তারাদের ঝিকিমিকি আলোয় বিচের ওপর বিয়ের পার্টি – বলতে হবে কী চান। আপনার সাধ্যের মধ্যে স্বপ্নপূরণ করবে অ্যাসপারাগাস ইভেন্টস। দাবি সংস্থার কর্তা প্রীতম দত্ত-র।

আইএইচএম কলকাতা থেকে হোটেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে স্নাতক প্রীতম চাকরির বেঁধে দেওয়া গণ্ডিতে থেমে থাকতে চাননি। শিক্ষানবীশ হিসেবে মাথার মধ্যে যে স্বপ্নগুলো তৈরি হয়েছিল সেগুলোকে বাস্তব রূপ দিতেই তাঁর ব্যবসায় আসা এবং বছর চারেকের মধ্যেই অন্যের স্বপ্নের রূপকার হয়ে ওঠা।

বাড়িতে অবশ্য ব্যবসার পাঠাপাঠ ছিল না। বাবা সরকারি চাকুরে। আর পাঁচটা বাঙালি ছেলের মতো প্রীতমও কলেজের ক্যাম্পাসিং থেকে চাকরিতে যোগ দেবেন, তেমনটাই আশা ছিল পরিবারের। ২০১০ সালে স্নাতক হওয়ার পর নামজাদা হোটেলে চাকরিজীবন শুরু করেন প্রীতম। কিন্তু ব্যবসা করার পোকাটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলই। সে বছরেরই অক্টোবরে শুরু হয় অ্যাপারাগাস ইভেন্ট্স। কলকাতা, রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ১ বছরের মধ্যে উত্তর পূর্ব ভারতে পরিষেবা বিস্তার করে অ্যাসপারাগাস। প্রীতমও চাকরি ছেড়ে পুরোপুরিভাবে নিজের ব্যবসাতেই মন দেন। তাঁর কথায়, ‘সিদ্ধান্তটা কঠিন ছিল, পরিচিতদের অধিকাংশই চাকরি না ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন’। কিন্তু প্রীতম ঝুঁকিটা নিয়েছিলেন। পিছন ফিরে তাকালে আজ তাঁর মনে হয়, ‘সিদ্ধান্তটা একেবারে ঠিক ছিল’। এরই মধ্যে ২০১১ সালে কলকাতায় পূর্বভারতের প্রথম পোষ্য মেলার আয়োজন করে অ্যাসপারাগাস। পরপর ২ বছরে সেই মেলার বহর বাড়ে এতটাই যে শেষমেশ পশুপাখিদের স্থান সঙ্কুলানের অভাব দেখা দেয়। তুমুল জনপ্রিয় হলেও ২০১৩ সালের পর সেই মেলা আর হয়নি। অবশ্য এই ৩ বছরে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে বেশ পোক্ত হয়ে ওঠে প্রীতমের অ্যাসপারাগাস।

বাঙালির থিম বিয়ে

এদেশে বছর ১০-১২ আগে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং বিষয়টার আগমন ঘটে। বিয়ের সঙ্গেই বরযাত্রী-কনেযাত্রী সমেত ছোট্ট ট্যুর, অর্থাৎ রথ দেখা কলা বেচা দুইই সেরে ফেলা। প্রাথমিকভাবে বিত্তশালী এবং অবাঙালিদের মধ্যেই এই ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের চল ছিল। এই শ্রেণিভেদটাই ভাঙতে চাইছিলেন প্রীতম। তবে বাঙালি বিয়েতে থিম আমদানির পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন শিল্পকেও প্রোমোট করতে চেয়েছিলেন এই তরুণ উদ্যোগপতি। তাই অ্যাসপারাগাস ইভেন্টসের ওয়েডিং প্ল্যানিং কনসেপ্টের মধ্যে তিনি এই দুই ভাবনাকে মিশিয়ে দেন। রাজ্যের মধ্যে থেকেই আকর্ষণীয় বিয়ের লোকেশন খুঁজে বের করেন তিনি। সেই তালিকায় যেমন রয়েছে মন্দারমণি, তাজপুরের মতো জনপ্রিয় জায়গা তেমনই বাঁকিপুট, জয়পুর জঙ্গলের মতো ভার্জিন স্পট যেখানে সচরাচর ডেস্টিনেশন বিয়ের কথা ভাবাই যায় না। এই নতুন নতুন জায়গার হদিশ দিয়ে বাজেটের মধ্যে থিম বিয়ের সখ মেটানোর পথ প্রশস্ত করেছে অ্যাসপারাগাস। অবশ্য বাজেট যদি থাকে একটু বেশি, সেক্ষেত্রে গোয়া, মালদ্বীপ, আন্দামান, ফুকেটে গিয়েও বিয়ের আসর বসানোর অপশন রয়েছে অ্যাসপারাগাসের কাছে।

অন্যান্য সংস্থাকে টেক্কা দিতে অ্যাপারাগাসের রয়েছে নিজস্ব ডেকর ও কেটারিং ইউনিট। এতে থিম বিয়ের আয়োজন আরও খানিকটা সস্তায় করা যায়। তারওপর ডেস্টিনেশন বিয়ের অতিথি অভ্যাগতদের প্রত্যেকের বিমা করানো থেকে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও নেয় অ্যাসপারাগাস। প্রীতমের কথায়, ‘ক্লায়েন্টের অতিথিরা অ্যাসপারাগাসেরও অতিথি’। উবার ক্যাবের বিশেষ কোড ব্যবহার করে অ্যাপারাগাসের এই অতিথিরা সহজেই পৌঁছে যেতে পারেন ওয়েডিং ‘ডেস্টিনেশনে’।

ব্র্যান্ড বেঙ্গল

‘পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসার উন্নতি নেই’ মার্কা নেতিবাচক মনোভাবে প্রীতম বিশ্বাসী নন। তাঁর মতে, ‘ক্লায়েন্টের পছন্দ ও ক্রয় ক্ষমতা বুঝে ভালো প্যাকেজিংয়ের মোড়কে এরাজ্যেও ব্যবসায় সফল হওয়া যায়’। মধ্যবিত্ত বাঙালির পাশাপাশি টাটা স্টিল, এইএসবিসি, নটিকা, সুইসোটেলের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা আজ তাঁর ক্লায়েন্ট। নিজের সাফল্যের জন্য অবশ্য প্রীতম তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ, যাঁরা এক নবাগত ব্যবসায়ী ও তার ‘ছোট’ সংস্থায় ভরসা রেখেছিলেন, প্রথম কাজের সুযোগ দিয়েছিলেন।

অ্যাসপারাগাস এমন এক সব্জি যার কাণ্ড ৯০ ডিগ্রিতে ঊধ্বমুখী। অতিথিসেবায় নতুনত্ব এনে নিজেও এভাবেই ব্যবসার উন্নতি করে যেতে চান প্রীতম। তাই সংস্থার নাম অ্যাসপারাগাস। সাফল্যের তো কোনও সীমা হয় না। তবে নিজের জন্য একটা লক্ষ্যমাত্রা রেখেছেন অ্যাসপারাগাস কর্ণধার। ‘যেদিন অ্যাপারাগাসের কাছে ডেট অ্যাভেলেবল কিনা জেনে ক্লায়েন্টরা অনুষ্ঠান আয়োজনের দিন ঠিক করবেন, সেদিন বুঝব আমরা সফল’। স্মিত হাসেন প্রীতম।