লক্ষ্মীলাভের দুটি অস্ত্র সেলস আর মার্কেটিং

0

কাস্টমার হল লক্ষ্মী। সেই লক্ষ্মীর কৃপা পেতে প্রধান দুই হাতিয়ার সেলস ও মার্কেটিং। এ জন্য খরচও আছে। যে খরচা করতে গিয়ে অনেকেরই বাজেটে কুলোয় না। নতুন বছরের বাজেট তৈরি করতে গিয়ে আপনারও কি একই দশা? উত্তর যদি হ্যাঁ হয় নিচের লেখাটা পড়ুন। একদম ছয়ে ছক্কা। কীভাবে কম খরচে হাতিয়ার দুটোয় শান দেবেন খালি একবার পড়ে নিন।

চারদিকে এখন মার্কেটিং মেসেজের ছড়াছড়ি। টিভি, মেল, ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন, রাস্তার ধারে ও স্টেশন প্ল্যাটফর্মে ছোট-বড় হরেক রকমের হোর্ডিং। ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব‌্যবসায়িক সংস্থাগুলি আর কী বা করবে বলুন? না জানালে লোকে জানবে কী করে। কিন্তু কোনও শুরুয়াতি ব্যবস্থা, যার আর্থিক ক্ষমতাও সীমিত, তাদের পক্ষে এই ধরনের খরচ বেশ কষ্টসাধ্য। এই ধরনের পেইড অ্যাডভার্টাইজিংয়ের জন্য অনেক খরচ। ক্রিয়েটিভ কনটেন্ট তৈরি থেকে হোর্ডিং বসানোর ভাড়া, সাধ্যে কুলোয় না।

এখন তাহলে প্রশ্ন হল, আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্ধীর সঙ্গে আপনি টক্কর দেবেন কী করে। প্রতিযোগিতার কথা না হয় বাদই দিন। শুধু এটুকুই ভাবুন, কম খরচে সম্ভাব্য ক্রেতাদের কী ভাবে জানাবেন যে বাজারে আপনিও আছেন। আসলে যে কোনও ব্যবসার সাফল্যের জন্য মার্কেটিং অত্যন্ত জরুরি। আপনার সংস্থার তৈরি পণ্য বা পরিষেবা যতই ভালো হোক না কেন, যতক্ষণ না তা ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরতে পারছেন কিছুই হবে না। এ পর্যন্ত পড়ে যদি নিরাশ হয়ে পড়েন তাহলে বলব, আপনার জন্যও সুখবর আছে বৈকি। কার্যকরী মার্কেটিং মানেই গুচ্ছ-গুচ্ছ খরচ এমনটা কিন্তু নয়। এমন কিছু বিকল্প আছে যার মাধ্যমে আপনি কাজ হাসিল করতে পারেন। যে সব ক্ষেত্রে খরচ খুবই কম কিংবা জিরো বাজেট।

১. একদম নতুন কিছু করুন

একই ক্ষেত্রে কাজ করছে এমন প্রতিযোগী সংস্থার থেকে আপনাকে আলাদা কিছু করতে হবে। ব্যবসা শুরুর প্রথম দিন থেকেই আপনাকে সেই কাজ শুরু করে দিতে হবে। কীভাবে হবে সেই কাজ? সংস্থার জন্য খুব সুন্দর একটা লোগো বানান। শোরুমে যে সব স্টাফ থাকবেন তাদের জন্য ইউনিফর্মের ব্যবস্থা করুন। আপনি যে জিনিস বিক্রি করতে চান সেটাকে যতটা সম্ভব ভালো ভাবে তুলে ধরাটাও জরুরি। উদাহরণ হিসাবে লোর্না সাইসনের কথা জানাই। টেক্সটাইলস বেসড প্রোডাক্টের (ল্যাম্পশেডস, পিলো ইত্যাদি) একটা ব্যবসা রয়েছে লোর্নার। সেই সব প্রোডাক্টকে প্রাকৃতিক দৃশ্যের পেইন্টিং দিয়ে রাঙিয়ে তুলেছেন লোর্না। যা ক্রেতাদের সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে।

এখন আপনার সংস্থা যদি পরিষেবা দেওয়ার কাজ করে তাহলে কী করবেন। সে ক্ষেত্রেও একাধিক পথ রয়েছে।

  • ডেলিভারি টাইম নিখুঁত করুন
  • আপনার প্রতিযোগীদের থেকে বেশি রকমের পরিষেবা
  • আপনার ম্যানেজমেন্ট টিমে ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্টদের রাখুন

এগুলো আপনাকে এগিয়ে দেবে। সেইসঙ্গে তুলে ধরবে আপনার পণ্য বা পরিষেবার ইউনিক সেলিং পয়েন্ট বা ইউএসপি। ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে মার্কেটিং এজেন্সি হিসাবে কাজ করে থাকা Humm Media-র ডিরেক্টর এমিলি পেরি এ সম্পর্কে দারুণ একটা কথা বলেছেন। আপনার প্রতিযোগীরা কী বলছে সেটা জানার চেষ্টা করুন। তারা কী বলছে না সেটাও জানার চেষ্টা করুন। এরপর ঠিক করুন আপনি কী বলবেন। পেরির কথার সূত্র ধরেই বলা যায়, এমন কনটেন্ট তৈরি করুন যা আপনার নিজস্বতা তুলে ধরবে। যেমন সংস্থার ওয়েবসাইটে একটা ব্লগ চালু করে দিন, কিংবা LinkedIn-এর মতো সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে যুক্ত হয়ে যান।

2. মিডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পাতান

প্রেস বা মিডিয়া কভারেজ আশ্চর্য ফল দিতে পারে। ঠিক সে কথাটাই বলেছেন বিখ্যাত পাবলিক রিলেশন এজেন্সি Jargon PR-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাইমন করবেট। তিনি বলেছেন,"আপনার সংস্থা নিয়ে একটা ভালো স্টোরি (সংবাদপত্রের ভাষায় খবর) শুধু আপনার ব্যবসার সুনামই বাড়াবে না, পাশাপাশি আপনারও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে।"

এখন কথা হল সেই সব সংবাদপত্রের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের কী ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন। করবেট বলছেন, এর প্রথম ধাপ হল সেই সব সংবাদপত্র কী ধরনের মানুষ পড়ছেন তার খোঁজ নেওয়া। এখান থেকেই বুঝতে পারবেন আপনার টার্গেট অডিয়েন্স কারা। পরের ধাপ হল সেই সংবাদপত্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা। সেই কাগজকে এমন খবর দিতে হবে যাতে তাদের আগ্রহ রয়েছে ও তারা ছাপতে পারে। স্থানীয় সংবাদপত্র হলে তারা স্থানীয় খবরই ছাপতে চাইবে। এই যেমন নতুন রেস্তোরাঁর উদ্বোধন। বাণিজ্যিক সংবাদপত্র হলে নতুন এমডি'র নিয়োগ বা বিশেষ কোনও স্বীকতি লাভ। ফ্যাশন ব্লগ হলে নতুন ডিজাইনের খবরে আগ্রহ থাকবে। তবে করবেট একটা কথায় খুব জোর দিয়ে বলেছেন, আপনি যে স্টোরি (খবর) দিতে চাইছেন তা যেন প্রাসঙ্গিক ও সেই সময়ের হয়।

শুধুমাত্র প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে দায় সারলে কিন্তু হবে না। সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাটাও জরুরি। এই সম্পর্ক না থাকলে কাজের কাজ হওয়াটা মুশকিল। আপনিও জানতে ও বুঝতে পারবেন, কোনও সংবাদপত্রের কাছে খবর, আর কোনটা নয়।

'আসুন, জিতে নিন পুরস্কার'-এই ধরনের কর্মসূচিও আপনার সংস্থাকে মিডিয়ার আনুকূল্য এনে দেবে। ফলে প্রচারও থেমে থাকবে না।

3. কাস্টমারদের সঙ্গে নিরন্তর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন

কোনও ব্যবসার প্রোফাইল গড়ে তুলতে গেলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে নেটওয়ার্কিং। এমিলি পেরি মনে করেন, "এটা মার্কেটিং স্ট্রাটেজির মধ্যেই থাকা উচিত। নেটওয়ার্কিং এমন একা জিনিস যা আপনাকে ক্রেতা এবং সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। যা পরবর্তী সময়ে সম্পর্ককে দৃঢ় করে।"

নেটওয়ার্কিং দুভাবে বাড়ানো যায়। অফলাইন ও অনলাইন। অফলাইনে আপনি স্থানীয় বিজনেস নেটওয়ার্কিং গ্রুপে (যেমন ধরুন বিভিন্ন চেম্বার অব কমার্স) যোগ দিতে পারেন। যোগ দিতে পারেন কোনও ট্রেড ফেয়ারে। যেখানে কাস্টমারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারবেন। অনেকে ভাবেন এই ধরনের মেলায় অনেক টাকা ঢালতে হয়। আসলে আপনার সংস্থার উপস্থিতিটাই আসল। সেটা হারালে চলবে না।

অনলাইন নেটওয়ার্কিংয়ের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সোশ্যাল সাইট। যেমন ফেসবুক, টুইটার, পিন্টারেস্ট, ইনস্টাগ্রাম। এ সবের মাধ্যমে কমিউনিটির মধ্যে, যাদের আপনার ব্যবসা সম্পর্কে আগ্রহ রয়েছে, তাদের সঙ্গে আপনার ব্যবসার সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়। তবে এমিলি পেরি বলছেন, সোশ্যাল মডিয়াকে কৌশলে ব্যবহার করতে হবে। তাঁর মতে, ফেসবুক B2C (বিজনেস টু কাস্টমার)-র ভালো কাজ দেয়। কিন্তু B2B (বিজনেস টু বিজনেস) ক্ষেত্রে ততটা ভালো কাজ দেয় না। আর একটা কথা জরুরি। একইসঙ্গে সব বিগ নেটওয়ার্কে নজর দেবেন না। সেগুলোর দিকেই নজর দিন যেগুলো আপনার যথার্থ মনে হয়।

লোর্না সাইসন এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সোশ্যাল সাইটে আপনাকে ৮০/২০ নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে। ৮০ শতাংশ কনটেন্ট এমন হবে যা আপনার কমিউনিটির পছন্দের। কিন্তু তা যেন আপনার সংস্থা বা প্রোডাক্ট নিয়ে ভারাক্লান্ত না হয়। এমনটা হলেই সেলস সম্পর্কিত বাকি ২০ শতাংশ পোস্টের ক্ষেত্রে আপনার অডিয়েন্স বেশি আগ্রহ দেখাবে।

ই-মেলকেও গুরুত্ব দিতে হবে। যত আপনার কাস্টমার বাড়বে, ততই বাড়বে ই-মেল অ্যাড্রেসের সংখ্যা। এই ই-মেল সস্তা হলেও খুবই দামি। আপনার সংস্থা কী করছে সে সম্পর্কে এক লহমায় তাদের জানিয়ে দিতে পারবেন। এটাও কম কিছু নয়।

4. বিশিষ্ট ক্রেতাদের ফোকাস করুন

সেরা মার্কেটিং হল মুখে-মুখে প্রচার। যা কিছু ভালো ঠিক যে ভাবে লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। একজন আর একজনকে বলেন। সেই ব্যক্তি আবার আর একজনকে বলেন। এ ভাবেই প্রচার ছড়াতে থাকে। পসার বাড়তে থাকে। আপনাকেও তাই এগিতে আসতে হবে। আপনি কাস্টমারদের বলতে পারেন, আপনার সংস্থার পণ্য বা পরিষেবা কেমন লাগছে তা তারা লিখে জানাক। যেগুলো আপনি উচিত বলে মনে করবেন সেই সব পোস্ট সংস্থার ওয়েবসাইটে তুলে ধরুন। এর বিকল্প হিসাবে আরেকটা জিনিস করতে পারেন। নামজাদা কোনও ব্যক্তি বা সংস্থা আপনার সংস্থার পণ্য বা পরিষেবা নিলে সেটা কৌশলে তুলে ধরতে হবে। এই ধরনের ক্রেতাদের কেস স্টাডি হিসাবে ওয়েবসাইটে তুলে ধরুন। তাঁরা কী ধরনের সমস্যায় পড়েছিলেন, কেন তাঁরা আপনার পণ্য বা পরিষেবা বেছে নিলেন সে সম্পর্কে লিখুন। যা খুবই কাজে দেয়।

5. ওয়েবসাইটে এক্সপার্ট কনটেন্ট তুলে ধরুন

একজন ক্রেতা আপনাকে বা আপনার সংস্থাকে কীভাবে খুঁজে পাবে? নতুন কাস্টমাররা সাধারণত গুগল বা বিংগের সার্চ ইঞ্জিনে কয়েকটা কি ওয়ার্ড টাইপ করেন, যেমন ধরুন 'camera + SLR + canon'. অর্থাৎ ক্যাননের এসএলআর ক্যামেরা সম্পর্কে জানতে চাইছেন। ক্যাননের ক্যামেরা বিক্রি করে এমন হাজারটা দোকানের নাম ভেসে উঠবে। ফলে চ্যালেঞ্জটা বুঝতেই পারছেন। আপনার সংস্থাকে এমন ভাবে তুলে ধরতে হবে যাতে সার্চ দিলে rankings-এ ওপরের দিকে থাকে, ক্রেতার নজরে পড়ে।

ফলে আপনি যখন একটা ওয়েবসাইট তৈরি করছেন, মাথায় রাখতে হবে সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশনের বিষয়টি। ক্রেতা কী ধরনের key words ব্যবহার করতে পারে সেদিকে নজর দিন। খুবই সহজ হতে পারে যদি ট্যাগ হিসাবে 'SLR' (ক্যামেরার ক্ষেত্রে) থাকে। কিন্তু এটুকু হলেই হবে না। এটা অর্ধেক। বাকি অর্ধেক হল প্রোডাক্টের বিবরণ, টিপস ও রিভিউ। তবেই না একজন ক্রেতা জিনিসটা সম্পর্কে আগ্রহী হবেন।

6. সেলস ও মার্কেটিংয়ের শক্তি যাচাই করুন

ক্রেতাকে আউটলেট, শোরুম বা ওয়েবসাইটে টেনে আনতে পারলেই মার্কেটিংয়ের কাজ শেষ হয়ে যায় না। জিনিস কিনবেন এমন মানসিকতা নিয়ে কিছু ক্রেতা দোকানে আসেন। কিছু ক্রেতা আসেন জিনিস দেখতে, হয়তো পরে তিনি তা নিতে পারেন। আবার এমন কিছু ক্রেতা আছেন যারা দরদাম করে জিনিস কিনতে পছন্দ করেন। তারা প্রোডাক্টের দাম দেখেন, কোনও অফার আছে কি না তার খোঁজখবর নেন। কেনাকাটা তখনই করেন না। এখানেই লুকিয়ে রয়েছে চ্যালেঞ্জ। সেলস বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ। কী ধরনের প্রাইস বা ডিসকাউন্ট হলে ক্রেতা কিনতে বাধ্য হবেন, তা খুঁজে বের করতে হবে। খুব বেশি দাম হলে ক্রেতা মুখ ঘুরিয়ে নেবেন। আপনার দাম খুব কম রাখলে আপনার লাভের মার্জিন কমে যাবে। সেটাই আপনাকে পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করতে হবে। এটা একবার করলেই হবে না। নিরন্তর চালিয়ে যেতে হবে। তবেই না লক্ষ্মী ধরা দেবেন।

(লেখক স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম বিশেষজ্ঞ রাজদুলাল মুখোপাধ্য়ায়)