ছাড় নির্ভরতাই ডোবাবে অনলাইন খুচরো ব্যবসাকে

0

ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাল মিলিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে অনলাইন ব্যবসা বা ই-কমার্স। ভারতে বর্তমান পণ্য বিক্রয়কারী ওয়েবসাইটের সংখ্যা ১৫০০ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে তিনটি বড় কোম্পানি ছাড়া বাকি সবগুলিই নতুন স্টার্টআপ, এবং এরা প্রত্যেকেই স্বপ্ন দেখে বড় অনলাইন ব্যবসা করার। মধ্যবিত্ত ভারতীয়ের প্রযুক্তিগতভাবে স্মার্ট হয়ে ওঠার আকাঙ্খা ও ঘরে বসে জিনিস কিনে ফেলার আলসেমি, এই দুই এর ওপর ভরসা করে রোজই গজিয়ে উঠছে নতুন নতুন অনলাইন স্টোর্স। অনলাইন ব্যবসাকে পুঁজি করেই উদ্যোগপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তরুণ ভারতের একটা অংশ। কিন্তু ব্যবসা শুরুর সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়শই তাঁরা অবহেলা করে থাকেন।

একটি ওয়েবসাইট খোলা ও একটি ব্যবসা খোলা যেখানে প্রতিদিন লেনদেন হবে, এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রায় প্রত্যেকটি ওয়েবসাইটই একই ধরণের কৌশল নিয়ে থাকে। সব ওয়েবসাইটেই দামের তুলনা, বিনামূল্যে সরবারাহ, ছাড় এবং আরও বেশি ছাড় এই সুবিধাগুলিই দেওয়া হয়।

নতুন ক্রেতাকে নিজের ওয়েবসাইটে নিয়ে আসার সবথেকে প্রচলিত উপায়টি হল প্রচুর পরিমাণে ছাড় দেওয়া (এমনকি অনেক কোম্পানি ক্রয়মূল্যের থেকেও কমে জিনিস বিক্রি করে থাকে), কিন্তু তা কতদিন পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব? একদিন বিনিয়োগকারীদের থেকে টাকা আসা বন্ধ হবে এবং তখন ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার অন্য পথ খুঁজতে হবে।

অনলাইন খুচরো বিক্রেতারা আসলে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা করছেন যেখানে পণ্য বা পরিষেবার কোনও মূল্য নেই, শুধুমাত্র তার দামই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বাজারে যেখানে পছন্দ করার জন্য এতগুলি বিকল্প রয়েছে সেখানে একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের প্রতি বিশ্বস্ততা তৈরি করা অসম্ভব।

বেশি বেশি ছাড়া দেওয়ার ফলে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে তাতে একজন ক্রেতা একটি অনলাইন স্টোর থেকে বারবার জিনিস কিনতে পারেন কিন্তু তাতে কোনও বিশ্বস্ত ক্রেতা তৈরি হচ্ছে না যারা ছাড়ের প্রতিযোগিতা অবহেলা করে পণ্য বা পরিষেবার গুণমানের জন্যই একটি স্টোর থেকে কিনবেন। এই ওয়েবসাইটগুলির টিকে থাকার একমাত্র উপায় বিক্রির পরিমাণ বাড়ানো, কিন্তু যেভাবে প্রতিদিনই নতুন নতুন কোম্পানি এই ব্যবসায় আসছে তা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

বেশি পরিমাণ ছাড় দিয়ে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার কৌশল কার্যকরী নয় এমন নয় কিন্তু ভাবতে হবে একটি ব্যবসা থেকে যে টাকা আসবে তার প্রেক্ষিতে তারা কত টাকা খরচ করতে সক্ষম। একটা সময়ের পর লাভের অঙ্ক ক্রমেই কমতে থাকবে এবং অনলাইন ব্যবসায়ীর খরচ বাড়তে থাকবে। বর্তমান কিছু উদাহরণঃ স্ন্যাপডিলের ক্ষতির পরিমাণ ২৬৪.৬ কোটি টাকা, ইয়েপমে পোর্টালের মোট বিক্রি ৬১ কোটি টাকা এবং ক্ষতি ৪৫ কোটি টাকা, শপক্লু-এর বিক্রি ৩০.৫ কোটি টাকার থেকে বেশি তাদের ক্ষতির পরিমাণ, তাদের ক্ষতি ৩৮ কোটি টাকা।

এই নতুন আসা কোম্পানিগুলি বিজ্ঞাপন ও মার্কেটিংএর কৌশলেও সেই একই পথ নেয় ও ছাড়ের ওপর নির্ভর করে। কেউ কেউ তারকাদের দিয়ে বিজ্ঞাপন করায় তো কেউ ফ্ল্যাশ সেল নামে কয়েক ঘন্টার জন্য প্রচুর ছাড় দেয়। ফ্ল্যাশ সেলের সময় ক্রেতা খুব দ্রুত একটি জিনিস কিনে নেন, কারণ অত কম দামে সেটি আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা যেটা ভুলে যান তা হল আজকের ক্রেতা অনেক বেশি পরিণত ও ছাড়ের প্রতি আসক্ত। তাঁরা জানেন কোনও একটি জিনিস যদি সাইট ‘এ’ তে কম দামে নাও পাওয়া যায়, সাইট ‘এক্স’-এ অবশ্যই তা কম দামে মিলবে, এবং যেহেতু তাদের ইন্টারনেট সংযোগ ও সময়ের কোনও নির্দিষ্ট সীমা নেই তাই তাঁরা ততক্ষণ পর্যন্ত ছাড়ের খোঁজ চালিয়ে যেতে পারেন যতক্ষণ না সব থেকে কম দামে তা পাচ্ছেন। অনলাইন বিক্রেতারা নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়েছেন, এখন একজন ক্রেতা যদি দেখেন একটি সাইটে জিনিসের দাম বেশি তাঁরা তত্ক্ষণাৎ অন্য একটি সাইটে চলে যাবেন। যে অনলাইন স্টোরের কোনও বিনিয়োগকারী নেই, সে ক্রেতাকে ফিরিয়ে আনার আর দ্বিতীয় সুযোগ পাবে না। যেহেতু তার কোনো শারীরিক উপস্থিতি নেই তাই ক্রেতা যাওয়া আসার পথে তাকে দেখতে পাবে না বা উইন্ডো শপিংএর জন্য তার দোকানে একবার ঢুকে দেখবে না।

ছাড় বাদ দিয়ে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার অন্য সৃজনশীল উপায় ভাবার সময় এসেছে। ছোট ই-টেলারদের দ্রুতই ভাবতে হবে কীভাবে ছাড় বাদ দিয়ে অন্যভাবে ক্রেতাদের কাছে নিজেদের মূল্য তৈরি করবে। এই ছাড় আসক্তি যদি আরও কিছুদিন চলে তাহলে এই ই-টেল বাবল্-এর ফাটতে খুব বেশি সময় লাগবে না এবং সব ছোট ই-কমার্স সাইটও তার সাথেই শেষ হয়ে যাবে। আর তখন শুধুমাত্র বড় হাঙররাই একচেটিয়া ব্যবসা চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে।