প্রসঙ্গ স্বাধীনতা বনাম রাষ্ট্র ও তার হীনমন্যতা

রামযশ কলেজের সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লিখছেন আশুতোষ।

1

কোন পথে আমাদের সমাজ, রাজনীতি? রামযশ কলেজ এপিসোড কিন্তু একটা প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে যেমন নানা সেমিনার হয়ে থাকে, তেমনই সামান্য একটা ব্যাপার সমাজ ব্যবস্থার হতশ্রী চেহারা সামনে নিয়ে এল। অনেকে চাইছিলেন না সেই সেমিনারে এমন কেউ আমন্ত্রিত হোন যার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদ বিরোধীদের যোগের অভিযোগ রয়েছে, যদিও সেই অভিযোগ এখনও প্রমাণিত নয়। মামলা আদালতে ঝুলে। অথচ আদালতকে পাশকাটিয়ে ইতিমধ্যে তাঁকে দোষীও বলা হচ্ছে। এখানেই তিনটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। এক, মানুষের মত প্রকাশের অধিকারের সীমা কী? দুই, সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হয়েছে এবং কে দোষী, ঠিক করার দাযিত্ব কার? তৃতীয়ত,কেউ যদি মত প্রকাশের অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেন সেক্ষেত্রে কে দোষীকে শাস্তি দেবেন?

রামযশ কলেজে সেমিনারটি হতে পারেনি। ভারত বিরোধী স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে যার বিরুদ্ধে তিনি যদি সেমিনারে অংশ নেন ফের এধরণের স্লোগান শোনা যাবে, এই আশঙ্কায় একপ্রস্ত গণ্ডগোল, ভাঙচুর হয়ে গেল। অর্থাৎ,নৃসংস খুন করতে পারে, শুধুমাত্র এমন ধারণা থেকে কাউকে ফাঁসিতে ঝুলি‌য়ে দেওয়ার মতোই বিষয়টি। অথচ আইনের চোখে, আঁচ বা ধারণা করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। এটাও অপরাধ। এই প্রবণতায় জাতীয়তাবাদের নামে জনতার মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ হয়।

ভয়ঙ্কর। যদি এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায় তাহলে আর কেউ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবেন না। স্বাধীন বক্তব্য থাকবে না, কোনও শিল্পে সৃজনশীলতা থাকবে না। কোনও সিনেমা তৈরি হবে না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিজস্ব উচ্চতায় উঠতে পারবে না। কোনও আবিষ্কার ভবিষ্যৎ তৈরি করবে না। কোনও পড়ুয়া ভুল করবে, ভাবাই যাবে না। কারণ অঙ্কুরেই তার চিন্তার বিকাশে গণ্ডি কেটে দেওয়া হবে। আর এভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অর্থহীন হতে হতে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। জাতীয়তাবাদের নামে আসলে পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে গোটা সমাজকে।

ভারতীয় সংবিধানে পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে, মৌলিক অধিকার বিলোপ করা যাবে না। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সংবিধানে একটা সীমারেখা টানার কথাও বলা আছে। অর্থাৎ একের স্বাধীনতায় অন্যের ক্ষতি হবে না। যার অর্থ দাঁড়ায়, মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে কারও কটূ কথা বলা বা জাতি,ধর্মে বিভেদ তৈরি হবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না। কিন্তু তার জন্যও কথা বলার স্বাধীনতা দিতে হবে। রামযশ এপিসোড সেদিক থেকে দেখতে গেলে বাক স্বাধীনতা হরণ করেছে। আর মৌলিক অধিকার খর্ব করা মনে জরুরি অবস্থা তৈরি হওয়া। ৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধী যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন।

একই সঙ্গে প্রশ্ন, কে ঠিক করবেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে? সংবিধান বলছে, অভিযোগ হলে পুলিশ বিষয়টি দেখতে পারে, তারপর আদালত খতিয়ে দেখবে কোনও অপরাধ সত্যিই হয়েছে কিনা। অভিযোগ ছাড়াও আদালত নিজে থেকে পদক্ষেপ করতে পারে। কিন্তু রামযশে কয়েকজন মিলে নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারাই অদালত, তারাই পুলিশ-সর্বেসর্বা হয়ে গিয়েছে। যারা সেমিনারের আয়োজন করেছিল, এবিভির সমর্থকরা চেয়েছিল ক্যাম্পাসে হল্লা করে তাদের একটা শিক্ষা। এটা আইনের প্রয়োগ নয়, আইন ভাঙার সামিল। যদি এই ধরনের সেমিনারের আয়োজনে আইন শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত হতে পারে বলে মনে হয়,সেক্ষেত্রে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে। এখানে ছাত্ররাই নিজেদের হাতে আইন তুলে নিল। আর দুর্ভগ্যজনকভাবে পুলিশ ছিল নীরব দর্শক। বলতে গেলে এবিভিপিই সংবিধান অমান্য করে জাতীয়তা বিরোধী কাজ করছে।

এক বছর আগে জেএনইউতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। রহস্যজনকভাবে ভারত বিরোধী স্লোগানের একটি টেপ সংবাদ মাধ্যমের হাতে চলে আসে। কানহাইয়া কুমার সহ কয়েকজন ছাত্র সেই অভিযোগে গ্রেফতার হয়। প্রবীন আইনজীবীদের সামনেই কোর্ট চত্বরে বেধড়ক মার খেতে হয় কানহাইয়াকে। অদ্ভুতভাবে তথাকথিত যে আট কাশ্মীরি যুবককে ওই টেপে ভারত বিরোধী স্লোগান দিতে দেখা গিয়েছিল তাদের চিহ্নিত করা বা গ্রেফতারের কোনও চেষ্টাই হয়নি। এখন পুলিশ তাদের রিপোর্টে বলছে,কানহাইয়া ভারত বিরোধী স্লোগান দেননি। এখানেও সংবিধান ভাঙা হল। আদালতকে পাশ কাটিয়ে কিছু ডানপন্থী সমাজকর্মী এবং তাদের বন্ধু মিডিয়া আদালত, বিচারক বনে গেল। রায়ও হয়ে গেল, দোষীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে শূলে চড়ানো হল। এভাবে চলতে থাকে এমন দিন দূরে নয় যেদিন আইন-আদালত-পুলিশের আর দরকার পড়বে না। জঙ্গল রাজ কায়েম হবে,জোর যার মুল্লুক তার।

গত কয়েক বছরে এক নতুন শিশুর জন্ম হয়েছে। নাম জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদের নামে সবেতেই নাকগলানো। সব দেখেও চুপ সরকারি সংস্থাগুলি। চেষ্টা চলছে সমাজের এক শ্রেণির মানুষকে কালো তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়ার। সাধারণের চোখ বিষিয়ে তোলার। ভারতের গণতন্ত্র সাবালক হচ্ছে। অথচ অসহিষ্ণুতা জাতীয়তাবাদের নামে তাকে কয়েক কদম পিছিয়ে দিয়েছে। গণতন্ত্র মানে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের মত নয়। গণতন্ত্র মানে সংখ্যালঘুর স্বার্থ রক্ষাও। প্রত্যেক মানুষ, জনগোষ্ঠী, প্রত্যেক ধারণা এবং আদর্শের জন্য গণতন্ত্র। দূর্বলকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের লক্ষ্য। যদি তা না হয়ে থাকে তবে রাষ্ট্রের যথার্থতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।

রাষ্ট্র কী এতটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছে যে সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষা করা যাচ্ছে না ? রামযশ বিতর্ক কিন্তু প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। পুলিশ পুতুল মাত্র। আমি বিশ্বাস করি না ভারত দুর্বল রাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিকে বলা যায় ক্ষমতাধরের আস্ফালন। দেশের জন্য এই লক্ষ্মণ একেবারেই শুভ নয়। দেশের উন্নতির কথা মাথায় রেখে সংবিধানকে মান্যতা দিতে হবে এবং সংবিধান লঙ্ঘন হয় এমন কোনও কার্যকলাপ সময় বেঁধে দিয়ে শক্ত হাতে দমনের ব্যবস্থা করতে হবে। 

(Disclaimer: The views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the views of YourStory)