কলেজ ছুট ওঙ্কার বুদ্ধি দেন পুঁজি বাড়ানোর

0

‘স্বপ্ন তাড়া করতে গিয়ে কলেজ ছাড়া, আর কলেজ ছাড়তে গিয়ে আমাকে লড়তে হয়েছে পরিবার, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষকের সঙ্গে। ইশ্বর জানেন, কী কঠিন কাজ ছিল। ভাষায় ঠিক বোঝাতে পারব না’, বলছিলেন ওঙ্কার কে খুল্লার, Impact India এর প্রতিষ্ঠাতা।

একবার দুবার নয়, তিন তিন বার পড়ার মাঝপথে কলেজ ছেড়েছেন। প্রথম ২০১০ সালে, একটি বেসরকারি কলেজ, আইআইএলএম লোধি রোডে, পড়া মাঝপথে বন্ধ করে দেন। পরেরবার ২০১১ সালে খালসা থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর ২০১৩ সালে বিজনেস ম্যানেজমেন্টের জন্য সেই সময় দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রথম সারির কলেজ এসএসসিবিএস-এ পড়ছিলেন, তাও মাঝপথে ছেড়ে দেন। ওঙ্কার বলেন, ‘প্রথম দুবার কলেজ ছেড়েছি আবেগের বশে, যখন বুঝতে পারি কলেজের কাছে তার কোনও সমাধান নেই। স্টক মার্কেটের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে পারিবারিক ব্যাবসা সামলাতে লেগে পড়ি। পাশাপাশি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা Make-A-Wish Foundation এ কাজ করছিলাম। সেখানে বন্ধুত্ব হয় রাধিকা নামে আট বছরের একটি বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে, ব্লাড ক্যান্সারে ভুগছিল রাধিকা। ছ মাস পর তাকে কেমো থেরাপি দিতে বলেন ডাক্তার, যার শুধু ওষুধের দামই দেড় লক্ষ টাকা। রাধিকার মা টাকার জোগাড় করতে গিয়ে নানা এনজিও সহ প্রায় সব স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দরজায় দরজায় ঘুরে ফিরে এসেছেন। ওইটুকু অর্থের যোগান দেওয়ার সামর্থ ছিল না কোনও সংস্থারই। আমার কাছে যখন টাকা চাইতে আসেন বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। স্টক মার্কেটে কাজ করে বেশকিছু টাকা জমেছিল ঠিকই। কিন্তু বুঝতে পারি টাকা দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। রাধিকার মা একা নন, এই সমস্যা আরও অনেকের’। এই ঘটনা ভাবিয়ে তোলে ওঙ্কারকে। অবস্থায় বদল আনবে এমন কী তিনি করতে পারেন তার প্ল্যনিংও শুরু হয়ে গেল।

এবার বাড়ির ব্যবসাপত্র ছাড়লেন। উন্নয়নমূলক সংস্থাগুলির সমস্যা নিয়ে গবেষণায় মন দিলেন। বুঝতে পারলেন মূল সমস্যা টাকা নয়,দক্ষতা। মূলত যোগাযোগ বা কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে দক্ষতার যথেষ্ট অভাব তাঁর নজরে পড়ে। তিনি বলেন, ‘বুঝলাম সৃজনশীলতাই আমার জীবনের মূল আসক্তি। তারপর যে প্রশ্নটা আসে, প্রভাব খাটিয়ে টাকা রোজগার করতে চাও,নাকি টাকা রোজগার করে প্রভাব খাটাতে চাও’? ওঙ্কার ঠিক করেন ‘লাভের জন্য ব্যবসা’ মডেল চালু করতে দক্ষ লোকজন নিয়ে একটা টিম তৈরি করবেন, যারা টাকার বিনময়ে উন্নয়নমূলক সংস্থাগুলিতে যোগাযোগের উপায় বাতলে দেবে। কোকাকোলা বা অন্যান্য এফএমসিজি ব্র্যান্ডগুলির তাদের পণ্য বিক্রির জন্য সেরা টিম নিয়ে মাঠে নামে, তাহলে পৃথিবী বদলে দিতে কেন সবচেয়ে ভালো না হোক অন্তত ভালো মাইনের সেরা টিম পাওয়া যাবে না? ওঙ্কার যোগ করেন, ‘আমার টাকার দরকার ছিল,তাই এনজেল ইনভেস্টমেন্টে আবেদন করি। তাদের একমাত্র আপত্তি ছিল আমি গ্র্যাজুয়েট নই’। ভারতের সবচেয়ে নামি ম্যানেজমেন্ট কলেজ এসএসসিবিএসে তখন সারা ভারতের জন্য মাত্র ৬০টি আসন। সেখানেই বিএফআইতে ভর্তির আবেদন করেন ওঙ্কার। একটা ডিগ্রি পেতে ৬ মাস কলেজে টিকে থাকতে রীতিমতো লড়াই করলেন। সেই সময় দিল্লির বিভিন্ন বিজনেস প্ল্যান প্রতিযোগিতায় যোগ দেন। ৫০০০০ টাকা মতো পুরস্কারের অর্থ তাঁর জমা হয়। ওঙ্কার বলেন, ‘অনেকগুলি বিজনেস প্ল্যান কম্পিটিশন জেতার পর একদিন আমার মাস্টারমশাইয়ের কাছে কলেজে অ্যাটেডেন্স নিয়ে বলতে যাই। তিনি আমাকে বলেছিলেন, যে কেউ বিজনেস প্ল্যান কম্পিটিশন জিততে পারে।তবে পরিকল্পনাগুলি বাস্তবে রূপ না পাওয়া পর্যন্ত কোনও মানে দাঁড়ায় না। ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে আমার নিজের সংস্থা খুলে ফেলি এবং ২০১৩ র ১৪ ফেব্রুয়ারি আমরা প্রথম ক্যাম্পেইন ’One packet per view’ শুরু করি। রোটারি ইন্টারন্যাশনাল, ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর ব্লাইন্ড এবং ডিএলএফের মত খদ্দের পেয়ে যাই। কিন্তু ৪মাস পর দুই বন্ধু এমবিএ করার জন্য আমার সঙ্গ ছাড়ে। ওদের বলেছিলাম, যদি তোমরা এমবিএ করতে যাও তাহলে আমাকে কলেজ ছাড়তে হবে। জানতাম সংস্থাকে বাঁচানো যাবে না। তাই কলেজ ছাড়লাম এবং সংস্থার কাজকেই পুরও সময়ের জন্য বেছে নিলাম’।

I Impact India টিম
I Impact India টিম

ওঙ্কারের সঙ্গে কথার কিছু অংশ তুলে দেওয়া হল-

আগেই যেটা বলছিলাম, মনোমালিন্যের মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, এইসব নিয়ে বলতে আর ভালো লাগছে না। আমরা তিন জনই বাল্যবন্ধু ছিলাম। একটা শিক্ষা পেলাম, প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে কখনও ব্যবসা করতে নেই। ২০১৩য় আমাদের প্রথম ইন্টার্নশিপ শুরু করি। একশোর বেশি আবেদনপত্র জমা পড়েছিল। জানতাম ঠিক পথেই এগোচ্ছি এবং ইশ্বর আমার পাশে আছেন। যখন সংস্থাটি শুরু করলাম (ততদিনে কলেজ ছেড়েছি) তখন ভারতে কম্পানি বিল এবং সিএসআর আইনের কোনও আলো দেখা যাচ্ছিল না। আমার বাড়ির লোকজন ভয় পেয়ে যায়, ভাবে ওর কী হবে? ঠিকই, যখন নিজে কিছুতে বিশ্বাস করবে, সেটা সফল হবেই। আমার ব্যবসা শুরুর তিন মাস পর বিল পাস হল। বর্তমানে I Impact India এর ২৫ জন সদস্য সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

ওঙ্কার চান পাঠকরা এমন কোনও সংস্থার নাম মনে করুন যারা ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য, ধর্ষণের আশঙ্কা কমানো, সরকারি এবং এনজিও স্কুলগুলিতে উপস্থিতির সংখ্যা বাড়ানো, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় পুঁজি বাড়ানো এবং সেগুলিকে স্বনির্ভর করে তোলার জন্য ‘অন্না বিপ্লব’ তৈরি করতে পেরেছে। ওঙ্কারের ইচ্ছে শুধু দেখনদারি নয়, হাতে-কলমে কাজ করে ব্যবসায় সাপ্লাই চেনের(উৎপাদন থেকে ক্রেতাদের হাতে তুলে দেওয়া পর্যন্ত যে প্রক্রিয়া) সমস্যা মেটাবেন এবং কার্যকরি সিএসআর অর্থাৎ ব্যবসার মাধ্যমে সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করবেন, একই সঙ্গে জনসংযোগ বা পিআর সমস্যাও মেটাবেন । ওঙ্কার চান, গণবন্টন ব্যবস্থা স্থির করতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দিতে।

I Impact India আদতে ব্র্যান্ডিং থেকে পিআর, ডিজাইন, ইভেন্ট, মার্কেটিং, বিজ্ঞাপন-সবার কাছে যোগাযোগের মাধ্যমে সামাজিক প্রভাবের (social impact communication ) নানা পরামর্শ দেয়।‘‌স্বচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির একসঙ্গে অনেকগুলি সহকারি সংস্থা বানিয়ে কাজ করার সামর্থ্য থাকে না, তবে সবকটার নির্যাস তার মধ্যে থাকতে পারে। আমাদের বোর্ড অব অ্যাডভাইসরিতে পরামর্শদাতা হিসেবে যারা রয়েছেন প্রত্যেকেই দক্ষ লোক’। ওঙ্কার যেটা তৈরি করেছেন সেটা হল ‘ইমপেক্ট থিংকিং মেথড’, ‌যার মাধ্যমে ৯০ দিনে অল্প খরচে সমাধান মিলবে।

I Impact India(III) নিয়ে কিছু ভুল ধারণা আছে সেগুলি পরিষ্কার হওয়া উচিত,যেমন-

I Impact India কী এনজিও? না, এটা এনজিও নয়। এটা একটা ফর-প্রফিট অর্থাৎ লাভের জন্য তৈরি সংস্থা। কারণ তারা বিশ্বাস করে ব্যবসা থেকে টাকা আসে এবং অভিজ্ঞতার মূল্য আছে। এটা কী এনজিওর জন্য টাকা তোলে? না, আইআইআই এমন একটি সংস্থা যারা এনজিওর জন্য টাকা তুলে দিতে দায়বদ্ধ নয়। তবে কীভাবে পুঁজি বা তহবিল বাড়াবে তার জন্য উপায় বাতলে দিতে পারে। অন্যান্য পরামর্শদাতা সংস্থাগুলির মতো আইআইআই তার খদ্দেরদের কাছ থেকে ঘণ্টার হিসেবে টাকা নেয় না। বরং কাজ কতটা কী মিটল তার উপর ভিত্তি করে পারিশ্রমিক নেয়।

I Impact India দেশি বিদেশি নানা সংস্থায় ইতিমধ্যে নিজেদের কাজের ছাপ রেখেছে। বিদেশি সংস্থা যেমন Swamimusic.com থেকে লন্ডনের Chakraviyuh এবং রোটারি ইন্টারন্যাশনাল এবং জাতীয়স্তরে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা যেমন প্রয়াস এবং প্রভাব ফাউন্ডেশন ছাড়াও কর্পোরেট সংস্থা যেমন সিলেক্ট সিটিওয়াক, ডিএলএফ এবং ভারতী ফাউন্ডেশনের মতো অনেক সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছে।

শুরুর প্রথম দু বছর ব্যবসার উত্থান পতন থেকে একটা দুটো শিক্ষা নিয়েছেন ওঙ্কার। তিনি বলেন, ‘পাকা চুলের অভিজ্ঞ লোকে ভরা এমন ক্ষেত্রে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ঢোকা খুব কঠিন। নতুন নতুন আইডিয়া দিয়ে তাঁদের মানসিকতার বদল ঘটানো বিশেষ করে হাঁটুর বয়েসি কেউ এসে যখন বলেন চলুন নতুন কিছু চেষ্টা করা যাক, সেটা বেশ চাপের। ভারতের এবং বিদেশের ৬০০টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ওপর কাজ করেছি এবং ‘What’s your cause?’ নামে আমার একটি বইয়ে সেই অভিজ্ঞতা লেখা রয়েছ। যারা আমাদের পরামর্শ পাননি,তাঁরা এই বইতে সবটাই পাবেন, আমি ২০০১-২০১৩ র মধ্যে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যা শিখেছি সব লেখা রয়েছে বইয়ে’।

‘চ্যারিটি মডেল বা বিনে পয়সায় সাহায্য এখন মৃত। স্বেচ্ছসেবী সংস্থাগুলি বিনে পয়সায় কাজ করলে শেষ হয়ে যাবে। মোটা অংকের কমিশনের বিনিময়ে স্বেচ্ছসেবী সংস্থাগুলির জন্য তহবিল তুলে দেয় এমন অনেক সংস্থা রয়েছে। এই ব্যবস্থাকে আমি ঘৃণা করি। ভাবুন, প্রতি ডোনেশন পিছু ৫০ শতাংশ করে কমিশন নেয় অর্থাৎ যদি কেউ ১০ টাকা চাঁদা দেন এজেন্ট ৫ টাকা কেটে নেবে। স্বেচ্ছসেবী সংস্থাটির প্রশাসকেরা নেবেন ৩ টাকা। যারা মাঠে নেমে কাজ করছে তাঁদের জন্য পড়ে থাকে মাত্র ২ টাকা। আমি স্বেচ্ছসেবী সংস্থাগুলির সঙ্গে কাজ করি অন্যভাবে। নিজেদের জন্য পুঁজি নিজেদেরকেই জোগাড়ের সুলুক দিই। যার ফলে ৯০ দিনে গোটা ছবিটাই বদলে যায়’।

এবার আন্তর্জাতিক স্তরেও নিজেদের ছড়িয়ে দিতে চায় I Impact India । ‘ ভারতের সবচেয়ে বড় ভালো কাজের (cause) নলেজ ব্যাঙ্ক (তথ্য ভাণ্ডার) তৈরির কাজ চলছে। কোপিও বা বিপিওর মতো ইমপ্যাক্ট প্রসেস আউট সোর্সিং নামে নতুন একটি প্রযুক্তিতে এই বছরের শেষের দিকে I Impact India কে I Impact International এর দিকে নিয়ে যাচ্ছি। বিদেশের স্বেচ্ছসেবী সংস্থাগুলিকেও সঠিক পারিশ্রমিকে পরিষেবা দেব’,বললেন এই তরুণ সামাজিক উদ্যোক্তা।

ভারতে ৭৫ লক্ষ এনজিও কাজ করছে। ২০১৩ য় সিএসআর-এর কড়াকড়ি উঠে যাওয়ার পর এই সংখ্যা দ্বিগুন হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। তারপরও লক্ষ লক্ষ মানুষ শাচনীয় দারিদ্রের শিকার। ছবিটা বদলে দিতে I Impact India র মতো কিছু সংস্থা উন্নয়ণের ক্ষেত্রগুলিতে পরিবর্তন এবং ক্ষেত্র অনুযায়ী দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।