দেশপ্রেমের অন্য ছবি, উদ্যোগপতি যখন কাগজ কুড়ুনী

পথে পতাকা নয়, এই স্লোগান তুলে উদ্যোগপতিরাই রাস্তার কাগজ কুড়ুনীর কাজ করলেন। এই ৭১ তম স্বাধীনতা দিবসের রাতে তৈরি হয়ে গেল অন্য রকম একটি ক্লাব। ARISE মানে উত্তিষ্ঠত, এই নাম রাখা হল স্বামী বিবেকানন্দের বাণী মাথায় রেখে।

1

আপনার পাড়ায় কি আমরা সবাই ক্লাব আছে কিংবা আমরা ক'জন অথবা হঠাৎ সংঘ? এরকমই নাম হয় হঠাৎ কোনও হুজুগে তৈরি হওয়া ক্লাবের। কদিন গাছ লাগানো চলে সিজনে ফুটবল টুর্নামেন্ট, রক্তদান শিবির। আর চাঁদা তুলে টিভি, ক্যারাম, গণেশ পুজো, সরস্বতী আরাধনা, লক্ষ্মী, কালী এমনকি শীতলা ওলাই চণ্ডী কোনও বারোয়ারি দেবদেবীই বাদ যান না। চাঁদা এলে মাংস ভাত, হুল্লোড়, গমগমে বক্স ফিট করে ঝিংকুলিলু ডিজে। হোল নাইট ফুল্টু মস্তি। সিজনের পর সিজন, ব্যাচের পর ব্যাচ।

আমি এই কদিনে অন্যরকম একটি ক্লাব তৈরি হতে দেখলাম। সমাজের প্রয়োজনে কিছু সংবেদনশীল মানুষ এবার এককাট্টা হলেন। কাঁধে করে মন মন মুড়ির বস্তা, চিড়ে গুড়, ছাতু নিয়ে নৌকোয় উঠলেন। গলা জলে নেবে ত্রাণ পৌঁছে দিলেন ঘাটালের গ্রামে গ্রামে। জলবন্দি মানুষের পাশে থাকার সৎ উদ্যোগ নিয়ে দেখালেন ওরা। ঘটনাচক্রে আমিও দেখতে গেছিলাম ওদের উদ্যোগের নমুনা। ফলে জানি কী বিভ্রাট সইতে হয়েছিল। কখনও ত্রাণ লুঠ হওয়ার উপক্রম হয়। পুলিশের ভ্যান এসকর্ট না করলে নিরন্ন মানুষের মুখের খাবার কালোবাজারির হাঙরের মুখে চলে যেত। সাহসী একদল মানুষ সেই সব হাঙর হায়নার চোখে চোখ রেখে জিতে এলো একটা পাহাড়। এবং এভাবেই তৈরি হয়ে গেল একটি ক্লাব। ত্রাণের প্রয়োজনে ক্লাব। মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিতে তৈরি হওয়া একটি কমিউনিটি। সদস্যদের অধিকাংশই পূর্ব পরিচিত। রেভ অন অ্যান্ড ড্রাইভ নামের একটি ফেসবুক পাতার মেম্বার। হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপের দোস্ত। তারাই আবার তৈরি করলেন ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার জন্যে সদিচ্ছার একটি কমিটি। এভাবেই ওদের সংগঠন থেকে বিভিন্ন সুবর্ণ হুজুগের ইস্যুতে তৈরি হয়েছে এক একটি দল, দোস্তি এবং দাদুর দস্তানা।

দাদুর দস্তানা শব্দটি হীনার্থে প্রয়োগ করছি না। কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ যারা তৈরি করেন, চালান তারা জানেন বিষয়টা দাদুর দস্তানাই বটে। কারণ বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন মতলব নিয়ে এঁকে বেঁকে ঢুকে পড়েন আর সুবিধের আশায় ওঁত পেতে থাকেন এইসব গ্রুপে। মাত্র আড়াইশ জনের ঠাঁই থাকে। সেখানেই নিত্য লাঠালাঠি মান অভিমান লেগেই থাকে। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হল ওদের গ্রুপে কোনও লাঠালাঠি নেই। কোনও অসূয়া নেই। কোনও প্রতিযোগিতা নেই। শুধু আছে ইস্যু ভিত্তিক পথ চলা আর পথের নিয়ম মেনে চলা।

এই সাংগঠনিক উদ্যোগে যে মানুষটার কথা না বললেই নয় তাঁর কথা ইওরস্টোরি বাংলার পাঠকদের কাছে অপরিচিতও নয়। তিনি সমরেশ দাস। উদ্যোগপতি তো বটেই কিন্তু ব্যবসায়িক উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগের প্রশ্নেও তিনি বিশেষভাবে উল্লেখের দাবিদার একজন উদ্যোগপতি। তবে একা সমরেশ নন। কলকাতার ফ্ল্যাগম্যান হিসেবে পরিচিত জিজ্ঞেস ঠক্করও আছেন এই দলে। 

২০১০ সাল থেকে খান্নার হেলমেট ব্যবসায়ী জিজ্ঞেস রাস্তার ধারে পড়ে থাকা পতাকা সরানোর কাজ করতেন। একাই। টানা সাত বছর পর একটা দল পেলেন কলকাতার এই সমাজকর্মী। প্রায় একশ জনের একটি দল। যারা ওর পাশে এসে দাঁড়াল। গড়ে উঠল ARISE নামে তাঁদের একটি হঠাৎ সংঘ। ১৫ অগাস্টের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনে এই সংগঠনের কাজও দেশপ্রেমে ভরা।

সারাদিন ধরে যেসব আমরা কজন, আমরা সবাই গোছের ক্লাবে পতাকার মালা সাজানো হয়েছিল, যেসব অত্যুৎসাহীরা হুজুগে পড়ে একদিনের দেশপ্রেমিক সেজেছিলেন, মুড়ি তেলেভাজা খেয়ে ঠোঙা ছুড়ে ফেলে দেওয়ার মতই 'স্বাধীনতা দিবস'- 'স্বাধীনতা দিবস' খেলে ফ্ল্যাগ ফেলে অন্য খেলায় মাতলেন, একবার ফিরেও তাকালেন না, ডিজের হুল্লোড়ে পা দিয়ে মাড়িয়ে কোমর বেঁকিয়ে তারস্বরে চলল, আন্টি পুলিশ বুলালেগি... তাদের সেই বালখিল্যতার মুখের ওপর জবাব দিতে নীরবে একটা বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলল ARISE। দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের দিব্যি কেটে ওরা রাস্তায়, ক্লাবের চত্বরে, অবহেলায় পড়ে থাকা কাগজের, প্লাস্টিকের কিংবা যেকোনও ধরণের পতাকা গুছিয়ে তুলে উপযুক্ত সম্মানের সঙ্গে সেগুলির ব্যবস্থা করলেন। 

নম্রতা ভট্ট, চিন্ময় ভট্ট, জিজ্ঞেস ঠক্কর, অভীক চক্রবর্তী, ঈর্ষীকা দাস, ঊর্যাস্বী মজুমদার, শেখ ইমরান, সমরেশ দাস সবাই মিলে রাস্তা থেকে, আস্তাকুঁড় থেকে পতাকা সরানোর কাজে হাত লাগালেন। শুধু এইটুকু কাজের জন্যে রাত দশটা থেকে সারা রাত, গোটা শহর তোলপাড় করে খুঁজে বেড়ালেন ফেলে দেওয়া, অসম্মানে লুটিয়ে থাকা পতাকা, ব্যবহার করে টয়লেট পেপারের মতো ছুড়ে দেওয়া গর্বের তিরঙ্গা গোছানোর কাজ করলেন শহরের এই নতুন দল। রাতের কলকাতায় গাড়ি নিয়ে ছুটলেন এ মাথা থেকে ও মাথা। শ্যামবাজার থেকে শুরু করে গোটা শহর শাসন করল ওদের নিজস্ব হঠাৎ সংঘ।