ভারতীয় মহিলা ফুটবলের উজ্জ্বল তারা রাজমিস্ত্রির মেয়ে মীনা

0

বলের ওপর অসাধারণ কর্তৃত্ব। ব্যালেন্সড পাস, ড্রিবলিং, ভলি সব যেমন নিখুঁত তেমনি দৃষ্টিনন্দন। এবং তেমন কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই। গাঁয়ের মেয়ে মীনা খাতুনের পায়ের এমন যাদু প্রথম নজরে পড়ে গ্রামেরই প্রবীণ ফুটবলপ্রেমী অরুণ পাঁজার। সিন্ধু ছেঁচে মুক্তো তুলে আনতে দেরি করেননি। গরিব বাবা-মায়ের কন্যা মীনাকে মহিলা ফুটবলের আন্তর্জাতিক স্তরে টেনে আনার দায়িত্ব নেন নিজেই।

মীনার কাহিনী রূপকথা বলে মনে হতে পারে। বাবা ইজাদ আলি, পেশায় রাজমিস্ত্রি। মা গৃহবধূ। চার ছেলে, চার মেয়ে। সব মিলিয়ে দশজনের সংসার। রুটিরুজির সন্ধান করতেই দিশেহারা ইজাদ আলি। মেয়ে মীনা বাগনানের চাকুর হরিশ সেমিনারি হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকে খেলাধূলায় আগ্রহ সবার নজরে আসে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে হাইজাম্প, লংজাম্প এবং দৌড়ে সাফল্যের নজিরও আছে। এক সময় ফুটবলের দিকে ঝোঁক বাড়ে। পায়ের কাজে ছোট্ট মীনা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় অরুণবাবু নজরে পড়ে। ইজাদ আলির বাড়ি বয়ে গিয়ে এই মেয়ের ফুটবল ক্যারিয়ার গড়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে চান। মেয়ের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের কথা ভেবে মত দিতে দেরি করেননি মীনার বাবা-মা। দায়িত্ব পেয়ে কলকাতার ফুটবল কোচিং সেন্টারে এনে মীনাকে ভর্তি করে দেন অরুণবাবু। সেখানেও ইতিমধ্যে কোচ থেকে ফুটবল কর্তা সবার নয়নের মনি হয়ে উঠেছে মীনা।

২০১৫য় বেঙ্গল ফুটবলে দারুণ সাফল্য। তারপরই সুযোগ মিলেছে আন্তর্জাতিক মহিলা ফুটবলের আসরে যোগ দেওয়ার। জুনে অনূর্ধ্ব ১৯ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট। তাতে ভারতের হয়ে সুযোগ পেয়েছে অজ পাড়া গাঁয়ের এই কন্যা। যেতে হবে স্কটল্যান্ড। তার জন্য এখনি দরকার লক্ষাধিক টাকা। মীনার বাবা-মায়ের পক্ষে এই টাকা জোগাড় করা সাধ্যের অতীত। অরুণবাবু একটা ওষুধের দোকানে কাজ করতেন। ছেলে অমিত বেসরকারি সংস্থার ছা-পোষা কর্মী। অরুণবাবুর ছেলে-পুত্রবধূও মীনাকে পরিবারের একজন হিসেবেই দেখেন। ভিনধর্মের মেয়ের জন্য এমন আদিখ্যেতা সহ্য হয় না পড়শিদের। পাঁজা পরিবারকে তার জন্য কম গঞ্জনা সহ্য করতে হয়নি। মীনাকে তাই নামী ফুটবলার করে তোলা বাপ-ব্যাটার কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনুর্ধ্ব ১৯এ ভারতের হয়ে খেলতে গেলে এতগুলি টাকার জোগাড় হবে কীভাবে, তাই ভেবে ঘুম উড়েছে তাদের। ‘বাধ্য হয়ে হাত পাতছি সবার কাছে। তা না হলে বোনের (মীনা) স্বপ্ন বৃথা যাবে’, বলছিলেন অমিত। মীনার বাবা-মায়ের অবশ্য পাঁজা পরিবারকে কৃতজ্ঞতা জানানো ছাড়া আর কিছু করারও নেই। মেয়েকে খেলতে স্কটল্যান্ড পাঠানো তাঁদের কাছে ছেঁড়া কাথায় শুয়ে চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা। অবশ্য সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন মীনার স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

স্কটল্যান্ড যাওয়ার দিন দ্রুত এগিয়ে আসছে। সাহায্যের জন্য রাজ্য সরকারের কাছেও আবেদন করা হয়েছে। তবে এরই মাঝে ভোট পড়ে যাওয়ায় সরকারি সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ‘আমার স্বপ্ন বড় খেলোয়াড় হওয়া। ফুটবলের আন্তর্জাতিক আসরে যোগ দিতে চাই। কিন্তু অনেক টাকা লাগবে। দাদা চেষ্টা করছে। জানি না পৌঁছতে পারব কি না’, বাস্তব কঠিন হলেও হাল ছাড়েনি লড়াকু মীনা। তিন কাঠির পোস্টকে লক্ষ্য করে নিয়মিত অনুশীলন চলছে। আর মনে মনে আশা-কিছু একটা করবেই দাদা।