আপনি কি জ্যারি জুডাহকে চেনেন?

কলকাতায় তৈরি হতে পারে জ্যারির বানানো বিশাল স্থাপত্য। জামার হাতা গুটিয়ে জ্যারি তৈরি। কলকাতা তৈরি তো!

2

প্ৰথমেই বলে রাখি জ্যারি জুডাহকে আমি চিনতাম না। বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের একটি আমন্ত্রণ পত্রে প্ৰথম নামটির সঙ্গে আলাপ হল। তারপর যেমন হয় গুগল করলাম। ভেসে উঠল এক অনন্য শিল্পীর কাজ। আকাশ থেকে ঝাঁপ দিচ্ছে তিনটে গাড়ি। আর বিশালাকার সেই গাড়ি গুলো অনন্ত সময় ধরে পড়ি পড়ি করেও পড়ছে না। এরকম অনেক আশ্চর্য ইন্সটলেশন দেখে চোখ ধাঁদিয়ে গেল। যত ব্রাউজ করলাম জানলাম ওর কাজের পরিধি শুধু গাড়ির ইন্সটলেশনে সীমায়িত নয়। নানান বিষয় নানান ভঙ্গিমায় জ্যারি জুডাহর কাজে ধরা দিয়েছে। আছে হাতে টানা রিকশার ওপর লোহার খাঁচার দশভুজা। একটা তিনচাকার সাইকেল ভ্যানের ওপর আস্ত মন্দির। মসজিদের কাঠামোও ঠাঁই পেয়েছে তাঁর শিল্পে। এসব ভারতীয় অনুষঙ্গ দেখে আশ্চর্য হয়েছিলাম। তবে সব থেকে বেশি টেনেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডবে শতচ্ছিন্ন পৃথিবীর ল্যান্ডস্কেপ। মূলত ইউরোপ। সেই বিষণ্ণ ইন্সটলেশনগুলির ভিতর হলোকস্টের যন্ত্রণা যেন ঠিকরে বেরচ্ছে। হননে, নির্যাতনে অপমানে কুকরে ওঠা ইহুদি হৃদয় যেন ওই সব শিল্পে চিৎকার করে বলতে চাইছে “মা নিষাদ...”।

জুডাহর কাজ বিশ্বের তাবড় মিউজিয়ামে আদরের সঙ্গে উপস্থিত। লন্ডনের সেন্টপল ক্যাথিড্রালের দেওয়ালে ওর বানানো সাদা ক্রসে যুদ্ধে বিপন্ন পৃথিবীর অসাধারণ ইন্সটলেশন টাঙানো রয়েছে। মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, সিসিলির সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসেন এই জ্যারি জুডাহ।

তারপর সেদিন আলাপ হল। কলকাতায়। Calcutta Talks নামে বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে কথা হল জুডাহর সঙ্গে। নিজে মুখে বললেন, কলকাতা থেকে জুডাহকে তাড়ানো যেতে পারে কিন্তু জুডাহর জীবন থেকে কলকাতাকে কখনওই আলাদা করা যাবে না। বলছিলেন, কলকাতা নাকি ওর ক্রোমোজোমে আছে। ও কলকাতার ছেলে। এখানেই জন্ম। জীবনের প্রথম দশটি বছর এই শহরের ধুলো কাদা ঘেঁটেছেন এই অসামান্য শিল্পী। এখন গোটা দুনিয়ায় তিনি সমাদৃত। চেহারায় বাগদাদী একটা আদল দেখে বোকার মত জিজ্ঞেসই করে ফেললাম কোনও যোগ আছে বাগদাদে? বললেন মায়ের গোটা পরিবার একসময় থাকত বাগদাদ, বাবার দিকের সবাই সেখানকারই। পরে যে যার কাজের টানে প্রাণ বাঁচাতে ছিটকে যান যে যার মত। বাবা কাকা চলে এসেছিলেন কলকাতায়। কেউ কেউ চলে গিয়েছিলেন সিয়াটল। কেউ লন্ডন। জুডাহর বাবা কাজ করতেন আগরপাড়া জুটমিলে। হ্যাঁ ঠিক শুনছেন বিটি রোডের ওপর এই আগরপাড়া জুটমিলেই কাজ করতেন জুডাহর বাবা কাকা। আগরপাড়ায় তাই এবার ঘুরে গেলেন জুডাহ দম্পতি। বলছেন, একটুও বদলায়নি। সেই সাদা ধবধবে বাড়ি গুলো। সেই গঙ্গার পাড়। শ্রমিকদের থাকার জায়গা। হাড়জিরজিরে মানুষগুলোর চেহারা। এখনও মনের কোণায় ভেসে উঠছে। ছোটবেলায় এখানেই খেলা করেছি কত। সবরকম মানুষের সঙ্গে মিশবার আনন্দ পেয়েছি। কসমোপলিটান কলকাতা। হিন্দু মুসলিম ক্রিশ্চান সব সম্প্রদায়ের মানুষ এক সঙ্গে এখানে থাকতাম। মনে আছে হোলি, ঈদ আর দুর্গাপুজোর কথা। খুব মজা হত। আর মহরমের জুলুস যখন রাস্তা দিয়ে বেরত তখন কেমন কেঁপে কেঁপে উঠত হৃদয়। যুদ্ধের বিভীষিকা আমার মনে দাগ কাটত। বছর দশেক ছিলাম কলকাতায়। তারপর বাবা চলে গেলেন লন্ডন। আমরাও। সেখানে পড়াশুনো করেছি। বড় হয়েছি। কিন্তু তার আগে আমার মনে আছে আমি পড়তাম পার্কস্ট্রিটের জিউস গার্লস স্কুলে। কলকাতায় কিন্তু আমি টের পাইনি আমি কোন জাতের মানুষ। লন্ডনে যাওয়ার পর টের পেলাম। ইহুদি এই পরিচয়টাই আমার একমাত্র পরিচয় হয়ে গেল।

জিজ্ঞেস করেছিলাম এত গাড়ি কেন আপনার কাজে? উত্তর এলো হালকা মেজাজে। বললেন গাড়ি মানে স্পিড আর মোবিলিটি। সেটা যেমন ওর গোটা জীবনে দারুণ ভাবে কাজ করেছে তেমনি কাজ করেছে ফরমায়েশ। ক্রেতার আগ্রহ। সেই অনুযায়ী প্রজেক্ট নিয়েছেন। রোলস রয়েস, পোর্শে, মার্সিডিজ, জাগুয়ারের মত ব্র্যান্ডের জন্যে কাজ করেছেন জুডাহ। 

আরও একটা জিনিস জুডাহর জীবনে আছে, তা হল মঞ্চ। থিয়েটার। লন্ডনে কেরিয়ার শুরু করার সময় যখন সবে ও হোটেলে হোটেলে কাজ করতেন তখন থেকেই থিয়েটার ওকে টানত। তারপর যখন ইন্সটলেশন শুরু করলেন স্টুডিও হল তখন থেকে নিয়মিত কাজ করেছেন লন্ডনের রয়্যাল থিয়েটার সহ অন্যান্য থিয়েটারে। সেখানে মঞ্চ তৈরি করে দেওয়া ব্যাকড্রপ তৈরি করার কাজ করেছেন। কাজই তাঁকে আরও আরও কাজ দিয়েছে।

তিনি যখন অসয়িৎস নিয়ে কাজ করার বরাত পান, তখন আরও কাছ থেকে ইহুদিদের যন্ত্রণা উপলব্ধি করার সুযোগ হয়। বেশ কয়েকবার পোল্যান্ড, অসয়িৎস ঘুরে ঘুরে দেখেন। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের অন্ধকার আর বিবর্ণ সময়গুলো বুকের ভিতরে টনটন করে ওঠে।

কলকাতায় যে কজন হাতে গোণা ইহুদি থাকেন তাদের নয়নের মণি জ্যারি। তাদেরই ডাকে কলকাতায় এসেছেন। আর কলকাতাতেও রেখে যেতে চান তার শিল্পের চিহ্ন। কিন্তু ঘিঞ্জি এই শহরে বিশালাকার ইন্সটলেশনের উপায় কম। তবে সব ঠিক থাকলে নিউটাউনে জমি পেতে পারেন জুডাহ যেখানে মাথা তুলতে পারে কসমোপলিটান কলকাতার স্মৃতি জাগানিয়া এক ইহুদি হৃদয়।