...ও গ্ল্যাম টাইপও নয়, 'লিজি বিউটিফুল'

0

আপনারা কেউ লিজি ভ্যালাস্কুয়েজ কে চেনেন? কখনো তাঁকে দেখেছেন? স্থানীয় টিভি চ্যানেলকে দেওয়া লিজির সাক্ষাৎকারের ইউ টিউবে ভিউ ছিল ৪০ লক্ষ। তাঁকে লোকে কুৎসিত মনস্টার বলে ডাকত। এক দর্শক কমেন্টে লিখে ছিল "দয়া করো লিজি, মাথায় বন্দুক ঠেকাও, ট্রিগার টেপো নিজেকে শেষ করে দাও। আমাদের স্বস্তি দাও"। ঠিক তার উল্টো কাজটাই করলেন লিজি। মেলে ধরলেন তাঁর ভিতরের সৌন্দর্য। বাঁচলেন অন্যকে বাঁচাবার মতো অফুরান অনুপ্রেরণা নিয়ে। লিজি এখন পরাজিত মানুষের প্রতিনিধি নন। তিনি বিজয়ীদের দলের শীর্ষে। লিজি আগলি মনস্টার নন। সৌন্দর্যের এক অনন্য উপমা।

ছোট্টো লিজির লড়াই

জন্ম থেকেই লিজি একটা বিরল ব্যধিতে আক্রান্ত। ওঁকে ছাড়া দুনিয়ায় আর দুজনের এই রোগ আছে। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন সাধারণ বাচ্চার মতো লিজি কথা বলতে কিংবা হামাগুড়ি দিতে পারবে না। নিজে থেকে কিছুই করতে পারবে না। শরীরে মেদ ছিল শূন্য শতাংশ। খাদ্য থেকে শরীর মেদ সংরক্ষণ করতে পারত না । ফলে তাঁর শারীরিক ওজন বৃদ্ধি পেত না । বেঁচে থাকার জন্য গুণে গুণে পনেরো মিনিট অন্তর তাঁকে খাবার খেতে হত। সবথেকে বেশি ওজন তাঁর হয়েছিল মাত্র ঊনত্রিশ কিলো। ডান চোখটা নষ্ট।

হার জিরজিরে লিজির বাবা-মা হার মানতে নারাজ। আর পাঁচটা স্বাভাবিক বাচ্চার মতোই তাঁরা সমস্ত কিছু দিয়ে তাঁকে বড় করেছেন। লিজির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মা। লিজির মনে আছে ওঁর মা ওঁর ভিতরের মনোবল কখনো ভাঙ্গতে দেননি। লিজি বলছিলেন " পিঠে স্কুলব্যাগ নিয়ে আমায় ঠিক কচ্ছপের মতো লাগত। কেউ হাসত। কেউ নাক কুঁচকে চলে যেত। কেউ আমার সঙ্গে কথা বলত না।" ছোট্টো মেয়েটা মা বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল সে সবার থেকে আলাদা কেন? মা বলেছিলেন তাঁকে দেখতে অন্যদের থেকে ছোটো হলেও মনের দিক থেকে লিজি অনেক শক্তিশালী। সে স্কুলে যাবে এবং মাথা উঁচু করে বাঁচবে।

লিজির মনে কষ্ট হতো। সকালে উঠে আয়নায় নিজেকে দেখে আঁতকে উঠতো লিজি। কী কুৎসিত। চোখ বন্ধ করে ফেলত। ওর মা, চোখ বন্ধ করে ওর ভিতরের সৌন্দর্যটাকে দেখতে শিখিয়েছেন। বুঝিয়েছেন বাহ্যিক রূপটাই আসল নয়। ধীরে ধীরে ওঁর ভিতর সাহস পুরে দিয়েছেন। তারপর একদিন লিজি স্থির করলেন এভাবে নয়, তিনি বাঁচবেন নিজের শর্তে। দুনিয়ার তাচ্ছিল্যকে তাচ্ছিল্য করে। মেলে ধরবেন তাঁর অন্তরের রূপ।

সুন্দরী লিজি

আজ লিজি একজন সফল লেখিকা ও প্রেরণাদায়ীনি বক্তা। তাঁর প্রথম বই ''লিজি বিউটিফুল''। এই বই লিজির দীর্ঘ লড়াইের ইতিহাস। আর এতে রয়েছে লিজির জীবনের একমাত্র অবলম্বন, তাঁকে লেখা তাঁর মার চিঠিগুলির কথা। দ্বিতীয় বই ''বি বিউটিফুল বি ইউ'' পড়লে সমাজের পিছিয়ে পড়া অবহেলিত মানুষগুলো মনে বল পায়। শারীরিকভাবে অসুন্দর মানুষদের আমাদের সমাজ অনেক তাচ্ছিল্য করে। লিজি দৃপ্ত কন্ঠে সাহস ও প্রেরণা দেন সেইসব অবহেলিতদের। এই ছোট্ট‌ গ্রহের বহু মানুষ শুধু তাদের বেঁধে দেওয়া মাপকাঠি অনুযায়ী দৈহিক রূপের বিচার করে। সুন্দর অসুন্দরের তকমা সেঁটে দেয়। রূপ নিয়ে হাজার একটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে। প্লাস্টিক সার্জারি করে রূপের অদল বদল ঘটায়। শুধুমাত্র অপরের বেঁধে দেওয়া মাপকাঠির বিচারে সুন্দর থাকতে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করে। এঁদের মাঝখানে লিজি একটি দুর্দান্ত প্রতিবাদ।

মানুষের অসম্মান অপমান হতাশা এবং হেনস্থার নানা দিক নিয়ে তিনি একটা ডকুমেন্টরী বানিয়েছেন। সেখানে মানুষের নিজের প্রতি বিশ্বাস এবং অপরের দিকে আঙুল তোলার যে কদর্য প্রবণতা আছে তাকে আক্রমণ করেছেন লিজি। কোনটা আমাদের অস্তিত্ব, কোনটা আমাদের পরিচয়, ভিতরের সৌন্দর্য না বাইরের রূপ? হৃদয় না শরীর? অপরকে উপহার দেওয়ার জন্যে ঠিক কী আছে আপনার কাছে প্রেম, ভালোবাসা নাকি ঘৃণা, তাচ্ছিল্য, অপমান? এই ফিল্মের মাধ্যমে লিজি আমাদের এই মৌলিক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেন।

আমরা প্রার্থনা করি লিজি সুস্থ থাকুন, দীর্ঘজীবি হোন। আর অবশ্যই তিনি তাঁর নিজের মতোই চিরসুন্দর থাকুন।