সাদা, কালো আর রঙিন টাকায় মোদির রংবাজি!

(লিখছেন AAP নেতা, সাংবাদিক আশুতোষ)

1

আমার মোবাইলে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। খবর পেলাম। খবরটা হল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীর উদ্দেশে কিছু বলবেন। সামান্য অবাক হলাম। সীমান্ত সংঘর্ষ ছাড়া তেমন কোনও সঙ্কটজনক কোনও ঘটনা তো দেশে ঘটছে না। এছাড়া সবই যেমনভাবে চলছিল তেমন স্বাভাবি্কভাবেই চলছে। আমার নিজের ভিতর একজন প্রাণবন্ত সম্পাদক বসবাস করেন। সে লোকটাও বেশ বিস্মিত হল। প্রধানমন্ত্রীর দেশবাসীর উদ্দেশে যা বলবেন নিশ্চয়ই গুরুতর কোনও কারণেই। ঠিক কী ব্যাপারে বলবেন, তা আমি জানি না। ঘড়িতে আটটা বাজতে না বাজতেই আমি টিভিটা চালিয়ে দিলাম।

প্রধানমন্ত্রী সাধারণত বলে থাকেন সন্ত্রাসবাদ, দুর্নীতি এবং কালো টাকার প্রসঙ্গে। তবে আর কী নিয়ে তিনি বলতে পারেন সে ব্যাপারে কিছুই আঁচ করতে পারিনি। তখনই একটা বোমা ফাটল যেন! সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৫০০ ও ১০০০ টাকা নোট বাজারে থেকে তুলে নেওয়া হবে। সেদিন মধ্যরাত থেকেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। কালো টাকার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে এটা করার দরকার হল। ফলে আমার কাছে যে টাকাটা ছিল বিনাবাক্যব্যয়ে সেও অচল হয়ে গেল। আর আমরা ভীষণ অবাক হলাম। আমার মানিব্যাগে তখন তিন-তিনটি ৫০০ টাকার নোট। এই নোটগুলি এখন মূল্যহীন। এগুলি এখন নিতান্ত বাজে কাগজমাত্র। ৫০০ অঙ্কটা লেখা আছে ঠিকই, কিন্তু বাজারে তার কোনওই দাম পাওয়া যাবে না।

আমি এবং আমার এক বন্ধু তখন ঠিক করি বাড়ি থেকে একটু বাইরে বেরোব। সময় ফুরানোর আগে ওই ৫০০ টাকার নোটগুলি ব্যবহার করে ফেলব। খাওয়া-দাওয়া করা যেতে পারে। আমরা ভাল করে খাওয়া-দাওয়াই করেছিলাম। খেতে খেতে কানে আসছিল নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা ধরনের সাহসী আলোচনা। আলোচনা হচ্ছিল ও কি সত্যিই কালো টাকার বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে পারবে? এই সিদ্ধান্ত কি আন্তরিক? এতে কি ওঁর ভাবমুর্তি কিছুটা ভাল হবে? সিদ্ধান্তটা কি আর্থিক ক্ষেত্রে সমতা ও শৃঙ্খলা আনবে নাকি নৈরাজ্য দেখা দিতে পারে?

সত্যি কথা বলতে কি, আমি নিজেই সংশয়ে পড়ে গেলাম। আমার মনে হয়েছিল আজকের এই মধ্যরাত হয়তো প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করবে। ওঁকে এমন একজন পরিত্রাতা হিসাবে দেখা হবে, যিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারের একটা লড়াই করছেন। তবে প্রশ্ন এটাই যে, এতে রাজনৈতিকভাবে তিনি কি লাভবান হবেন? তবে আমার কাছে এই প্রশ্নেরও কোনও ‌উত্তর ছিল না। ইতিমধ্যে খবরটা ছডিয়ে পড়েছে। পেট্রল পাম্পেও দীর্ঘ লাইন। আর আম আদমি যেন খানিকটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।

পরদিন ব্যাপারটা গোলমাল ও নৈরাজ্যের আকার নিতে শুরু করল। সাধারণ মানুষ ব্যাঙ্ক ও এটিএমের লাইনে দাঁড়ালেন। নোট বাতিল প্রসঙ্গটিই তখন আলোচনার প্রধান বিষয়। এক সময় চার্চিল বলেছিলেন, রাজনীতিতে এক সপ্তাহ মানে সেটা এক বিরাট সময়। কিন্তু এখন ৪৫ মিনিটই যেন একটা গোটা সপ্তাহের থেকে বেশি লম্বা সময়। প্রধানমন্ত্রীর ওই ঘোষণার পরে দুসপ্তাহ হয়ে গেল। ইতিমধ্যে দুটি যুযুধান শিবির বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করছে। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি ও কালো টাকার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন। কিন্ত আমার নিজের পক্ষে ব্যাপারটা হজম করা খানিক শক্ত।

২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে মোদি কথা দিয়েছিলেন, বিদেশে গচ্ছিত কালো টাকা দেশে ফিরিয়ে আনবেন। দেশবাসীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এর জেরে মাথা পিছু ১৫ লক্ষ টাকা করে জমা পড়বে। পূর্বতন কংগ্রেস সরকার প্রধানত দুর্নীতির কারণেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল। জাতীয় স্তরে কংগ্রেসের করুণ দশার মূল কারণ হল দুর্নীতি। অথচ, সারা পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে কংগ্রেস একটা নজির গড়েছিল। বিংশ শতকের সিংহভাগ সময়ে স্বাধীনতা পরবর্তী ভারত শাসনের ভার ছিল কংগ্রেসেরই হাতে। সারা পৃথিবীতে অন্য কোনও রাজনৈতিক দল এই দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারেনি।

মোদির দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলকভাবেই যুদ্ধ করার কথা ছিল। বিদেশি ব্যাঙ্কে গচ্ছিত দেশের কালো টাকা দেশে ফেরানোরও কথা ছিল তাঁর। বিশেষত সুইস ব্যাঙ্কে যে টাকাটা গচ্ছিত আছে। সুইস ব্যাঙ্কের সঙ্গে আমাদের ভারতীয়দের এতই মধুর সম্পর্ক যে নাম শুনলেই আমরা সাধারণত রেগে উঠি। সুইস ব্যাঙ্কে টাকা রয়েছে এমন মানুষ বলতে আমাদের মনে হয় কোনও ধনী ও দুর্নীতিপরায়ণ মানুষের কথা। যে কিনা অসাধু উপায়ে কালো টাকা সুইটজারল্যান্ডের ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রেখেছেন। সে মানুষটি দেশবাসীর ওপর লুঠতরাজ চালিয়েছেন। তিনি ক্ষমতাবান হলেও আসলে পাপী। এদিকে এ কথাও লোকে বিশ্বাস করে, একজন সফল রাজনীতিক মানে তাঁর বিদেশি ব্যাঙ্কে গচ্ছিত টাকা আছেই। বিদেশি ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট থাকাটা এখন আভিজাত্য ও ক্ষমতার লক্ষণ। যে তিনি নারী বা পুরুষ যাই হোন, দুতরফের ক্ষেত্রেই এটা এখন বাস্তব সত্য।

বিজেপি-র সবচেয়ে প্রবীণ নেতা এল কে আদবানি – যিনি একসময় মোদির অভিভাবকের মতো ছিলেন – সেই আদবানিই কিন্তু প্রথম কালো টাকার প্রসঙ্গে সোচ্চার হয়েছিলেন। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় আদবানি এই প্রসঙ্গটি উত্থাপণ করেছিলেন। সেই সময় আদবানি এ বিষয়ে কয়েকটি সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন, নির্বাচনী প্রচারের বেশ কিছু ক্ষেত্রে কালো টাকা প্রসঙ্গটি টেনে এনেছিলেন। তবে সেটা তখন মুখ্য নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠেনি। ২০০৮ সালে বিশ্বজুড়ে মন্দা চললেও ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বৃদ্ধির হার তখন ছিল ৯ শতাংশ। মনমোহন ফের প্রধানমন্ত্রী হলেন। ২০০৪-এর তুলনায় ভালভাবেই জিতলেন। আদবানির তোলা কালো টাকা ইস্যুটা সেইসময় কাজে লাগল না। কিন্ত ২০১১ সাল নাগাদ রাজনৈতিক পরিস্থিতিটাই পাল্টে গেল। পাল্টে গেল তার ব্যাখ্যাও।

এরপরে আন্নার আন্দোলন একটা বড় ধাক্কা দিল। দুর্নীতি একটি মুখ্য প্রসঙ্গ হয়ে উঠল। একটির পর একটি দুর্নীতি মনমোহন সিং আর সনিয়া গান্ধীর ভাবমূর্তিতে আঘাত করল। কংগ্রেস পরিণত হল আদ্যপান্তভাবে নির্লজ্জ একটি দুর্নীতিপরায়ণ রাজনৈতিক দলে। দেশের অর্থনীতিও অবনত হয়েছে তখন। এই পরিস্থিতিতে মোদির উত্থান। মোদি তাঁর নিজের ভাবমূর্তি ভালভাবে বেচতে পেরেছিলেন। দেশের বৃহত্তর জনতার কাছে মোদি তখন একজন দুর্নীতিমুক্ত নেতা, যিনি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে মনমোহনকে সরে যেতে হল। আর রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করলেন মোদি।

মোদি অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি মতো ১০০ দিনের ভিতর বিদেশি ব্যাঙ্কগুলি থেকে কালো টাকা দেশে ফেরাতে পারলেন না। শীর্ষ আ্দালতের নির্দেশ অনুসারে কালো টাকা নিয়ে তদন্তের জন্যে মোদি একটি স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম বা সিট গড়লেও সেটা ছিল কার্যত নখদন্তহীন। এই পরিস্থিতি বিজেপি সভাপতি অমিত শাহকে বলতে হল, নির্বাচনের আগে নেতারা অনেক কিছুই বলে থাকেন। ভোটারদের উচিত সব কথা গভীরভাবে না নেওয়া। যদিও মোদির নির্বাচনী প্রচারের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল। স্বাধীন ভারতের নির্বাচনে সেটাও ছিল আর একটা নজির। প্রচারে যেভাবে জলের মতো অর্থব্যয় করা হয়েছে, তাও ছিল দৃষ্টিকটু। আনুমানিক ১০ থেকে ২০ টাকা কোটি টাকা মোদির প্রচার বাবদ খরচ করা হয়েছিল। এর জেরে বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলি নিজেদের নিরাপদ করতে পেরেছে। এর আগে এই পরিমাণ নিরাপত্তার বোধ তাদেরও ছিল না। এদিকে মোদি খরচের কোনওই হিসাব পেশ করেননি। এপর্যন্ত কখনও বিষয়টি নিয়ে মুখও খোলেননি্। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুসারে, বিজেপি দলের তহবিল সংক্রান্ত ৮০ শতাংশ তথ্যই জানাতে নারাজ। এ ব্যাপারে আপনি পথচলতি মানুষের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলবেন, এসবই কালো টাকার খেলা।

গত আড়াই বছর ধরে দেশশাসন করছেন মোদি। অথচ এখনও লোকপাল নিয়োগ করা নিয়ে কোনও উদ্যোগ নেননি। মনমোহনের আমলেই এ ব্যাপারে আইন কিন্ত পাস হয়েছে। ১২ বছর গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মোদি। ওই কার্যকালেও লোকায়ুক্ত নিয়োগ করেননি। যদিও এই প্রতিষ্ঠানগুলিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র। নিজের মন্ত্রিসভার দুর্নীতিপরায়ণ মন্ত্রীদের বিরুদ্ধেও মোদি কখনও কোনও ব্যবস্থা নেননি। উল্টে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নিজের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিয়েছেন। দিল্লির আম আদমি পার্টির সরকারের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন অ্যান্টি করাপশন ব্যুরোটিকেও।

এখন মোদির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তিনি দুটি বড়সড় কর্পোরেট সংস্থার কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। সরকারি নথিতেও এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী এই গুরুতর অভিযোগ নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন না। অথচ মোদি আমাদের বোঝাতে চাইছেন তিনি কোনওভাবেই দুর্নীতিপরায়ণ নন। এটা কীভাবে আমি বিশ্বাস করব? এটা রাজনীতি নয়? এই-ই কি শুদ্ধ ও সরল রাজনীতি?

কোনও সন্দেহ নেই মোদি ও তাঁর কাজ নি্য়ে দেশের ভিতর এখন দুটি শিবির তৈরি হয়ে গিয়েছে। একদিকে মোদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হতে দেখা যাচ্ছে, আবার তিনি নিজের ভাবমূর্তিও নির্মাণ করতে চাইছেন। তবে এত তাড়াতাড়ি বলা সম্ভব নয়, মোদি সফল হবেন নাকি এটা তাঁর সবচেয়ে বড় ভুল? বরং আরও কিছুদিন দেখা যাক। টাকার সঙ্কট মানুষজন তাঁদের ভোগান্তি কিছুটা সামলে উঠুক। আসুন, আমরা অপেক্ষা করে দেখি। মোদি ও দেশবাসীর পক্ষে এই সময়টা বড্ড বেশি উত্তেজকই।

লিখেছেন AAP নেতা সাংবাদিক আশুতোষ-অনুবাদ Team YS Bangla

(Disclaimer: The views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the views of YourStory)