প্লাস্টিকের বোতলের দুটি নৌকায় নদীপথে ২৪৯ কিলোমিটার পরিক্রমা

0

ওঁরা আটজন অসমসাহসী তরুণ। অভিনবভাবে তৈরি করা দুটি নৌকা আর একটি কায়াকে চেপে ২৪৯ কিলোমিটার নদীপথ উজিয়ে আউটরাম ঘাটে অভিযান সমাপ্ত করলেন। ৯ মার্চ দীঘার সমুদ্রে ভেসে ১৬ তারিখ অক্ষতভাবে নৌকা ভেড়ালেন আউটরাম ঘাটে। দুটি নৌকাই গড়া হয়েছে বাঁশের কাঠামো গড়ে। তারপর প্রতিটি নৌকায় দুহাজার প্লাস্টিকের বোতল বোঝাই করা হয়েছে, যাতে জলে ভেসে থাকা যায়।

অভিযানের উদ্দেশ্য, প্লাস্টিক দূষণের বিপদ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। সারা বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণ কীভাবে পরিবেশের ক্ষতি করছে, সে সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা ছিল এই অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। অভিযানের উদ্যোক্তাদের দাবি, প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি নৌ-অভিযান এদেশে এই প্রথম। সেজন্য অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে, প্লাস্টিক বোতল কায়াক এক্সপিডিশন।

আটজন অভি‌যাত্রীই হাওড়ার বাসিন্দা। অভিযাত্রীদের দলপতির নাম পুষ্পেন সামন্ত। ওয়াটার স্পোর্টসে এই রাজ্যে খেলোয়াড়দের মধ্যে পুষ্পেন একটি পরিচিত নাম। অন্য সাত অভিযাত্রীর নাম, বিশ্বজিত মণ্ডল, তন্ময় খাঁড়া, মৃন্ময় খাঁড়া, অরিন্দম দাস, সৌরভ গুছাইত, পল্লব ভৌমিক ও সৌরভ মান্না। পুষ্পেন ছাড়া বাকি সকলের বয়স ২২ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে। ওঁদের ভিতর বয়সেও দলপতি পুষ্পেন কয়েক বছরের বড়। বলাবাহুল্য, সময় ও সুযোগ পেলে ওয়াটার স্পোর্টসে অংশ নেওয়া ওঁদের স‌বারই নেশা। এই অভিযানের উদ্যোক্তা ছিল JYS FOUNDATION, সংস্থার অন্যতম মুখপাত্র তন্ময় চক্রবর্তী জানালেন, JYS WATER SPORTS কেন্দ্রিক নানা ধরনের ইভেন্টের আয়োজন করে থাকে। এই অভিযান তারই একটি অঙ্গ।

প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি দুটি নৌকায় ২৪৯ কিলোমিটার সমুদ্র ও নদীপথ পেরিয়ে আসা মুখের কথা নয়! বিশেষত, জলপথে যে কোনও ধরনের বিপদ হতে পারে। কেউ অসুস্থ হলে কিংবা কোনও সঙ্গী জখম হলেও তাঁর শ্ৰুশ্ৰূষার জন্যে কার্যত তখন কিছুই করার নেই। যদিও পুষ্পেনের নেতৃত্বে আট অভিযাত্রী নদী ও সমুদ্রপথের বিপদ-আপদ কাটিয়ে দীঘা, মন্দারমনি, হিজলি, হলদিয়া, ডায়মন্ডহারবার, ফলতা হয়ে আউটরাম ঘাটে নৌকা ভেড়ালেন যখন, তাঁদের জন্যে JYS এর অন্যান্য সদস্যরা মালামিষ্টি হাতে অপেক্ষা করছিলেন। তুমুল করতালির ভিতর দিয়ে সুস্থ শরীরে ফিরে আসা আট অভিযাত্রীকে তাঁদের সতীর্থরা সংবর্ধিত করলেন।

তন্ময় খাঁড়া নামে এক অভিযাত্রী জানালেন, পথে গুরুতর বিপদ হতে পারত গাদিয়ারার কাছে শিবগঞ্জে। রাতে নৌকা চালাতে চালাতে শেষমুহূর্তে আচমকা ওঁরা টের পান সামনে জলস্তর অনেকটা নেমে গিয়েছে। ওই জায়গায় বাঁধ মতো করা হয়েছে। বাঁধে গিয়ে নৌকার সজোরে ধাক্কা খাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। তাতে নৌকাডুবি হতে পারত। ওঁরা জখম হতে পারতেন। অভিযাত্রী দলের অন্যতম সদস্য অরিন্দম দাসের কথায়, সেই রাতে কোনওক্রমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছি আমরা। 

অভিযান মানেই যে বিপদ, সে আর নতুন কী! বিপদের মোকাবিলা করবেন বলেই তো ওঁরা অভিযাত্রী হিসাবে নিজেদের একরকম পরখ করে নেন। সেই সাহসের পরীক্ষায় অবলীলায় উত্তীর্ণ হয়ে ফিরে আসা আট অভিযাত্রীই অভিযানমূলক খেলাধূলার প্রতি যে সমস্ত মানুষের আগ্রহ আছে, তাঁদের কাছে এখন এক-একজন হিরো।

পুষ্পেনের নেতৃত্বে সারা বছরই ওঁরা অভিযান নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন। তবে জেওয়াইএস শুধুমাত্র ওয়াটার স্পোর্টসেরই আয়োজক সংস্থা। অভিযানের ফ্ল্যাগ অফ করেন বিশিষ্ট পর্বতারোহী শ্যামল সরকার। নৌকায় এই কয়েকদিনের খাওয়া-দাওয়া বলতে শুকনো খাবার। মাঝেমাঝে নৌকা ঘাটে ভিড়িয়ে তাঁবু খাটিয়ে থাকা। সেই সময়ে রান্নাবান্না করে নেওয়া। অবশ্য কলকাতা থেকে নৌকা ও কায়াক নিয়ে ওঁরা জলপথে দীঘা যাননি। দীঘাতে ছিলেন হোটেলে। তারপর ৯ তারিখে সমুদ্রে ভেসে পড়া। অভিযাত্রীদের কাছে জানা গেল, যাত্রাপথে অনেক জায়গাতেই নদী ছিল‌ খরস্রোতা। সে কারণে কোথাও কোথাও দিনের বেলা বেশ কয়েক ঘণ্টার জন্যে থামতে হয়েছে। পরে সময় পুষিয়ে নিতে সারারাত্রিই নৌকা চালাতে হয়েছে অভিযাত্রীদের।

২৪৯ কিলোমিটারের যাত্রাপথে মানুষের কাছ থেকেও ভালো সাড়া পেয়েছেন অভিযাত্রীরা। পল্লব ভৌমিক বললেন, গ্রামের মানুষের অনেক কৌতূহল। তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি আমরা নিজেদের কাজটা করেছি। কীভাবে প্লাস্টিক পরিবেশের ক্ষতি করছে, তা আমরা গ্রামবাসীদের বুঝিয়েছি। প্লাস্টিক দূষণের বিপদটা ওঁরাও ভালোমতোই উপলব্ধি করেছেন।প্লাস্টিকের তৈরি সামগ্রী ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলে তা যে রিসাইকেল করে কাজে লাগানো যায়, তাতে প্লাস্টিক বর্জ্যের মারফত পরিবে‌শ দূষণও প্রতিরোধ করা যায়। এই সামান্য কথাটাই সাধারণ মানুষকে বোঝাতে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে নৌকা তৈরি করে এই অসামান্য অভিযান মোটের ওপর দুর্দান্ত সফল। 

Related Stories