তরল শব্দ, সরল ছবি, রামিয়া দারুণ সফল হবেন

সাদা পাতায় আঁকিবুকি। তাতেই কখনও ফুটে উঠছে আনন্দ, কখনও দুঃখ, রাগ অথবা বিদ্রুপ। আর এভাবেই ছোট ছোট মুহূর্ত সাজিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কমিক স্ট্রিপ। এটাই হায়দরাবাদ নিবাসী তরুণ কার্টুনিস্ট রামিয়া শ্রীরামের জগৎ।

0
রামিয়া শ্রীরাম
রামিয়া শ্রীরাম

রামিয়া তাঁর এই কার্টুনের দুনিয়ার নাম দিয়েছেন ‘দ্য ট্যাপ’। কল দিয়ে যেভাবে খুব সহজে জল পড়ে। দ্য ট্যাপের কমিক্সের ভাষাও সেরকম। খুব সহজ-সরল। সেকারণেই রামিয়ার জগতের নাম ‘দ্য ট্যাপ’।

ছোটবেলা থেকেই এক এক সময় এক এক রকম পেশায় যোগ দেওয়ার ইচ্ছে হয়েছে রামিয়ার। তাঁর বাড়ির সদস্যরাও কখনও তাঁর ইচ্ছেতে বাধ সাধেননি। রামিয়া অবশ্য জানিয়েছেন, ‘আমি ‌যখনই যা করেছি সম্পূর্ণ নিষ্ঠা দিয়ে করেছি। আর স্বাধীনভাবে সব কিছু করতে পেরেছি বলেই সুন্দর সুন্দর অভিজ্ঞতাও হয়েছে’। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি যে কমিক্স শিল্পী হবেন, স্বপ্নেও ভাবেননি রামিয়া।

মজার ছলেই বন্ধুদের ছবি এঁকে ফেসবুকে পোস্ট করতেন রামিয়া। সেই সূত্রেই হঠাৎ একদিন এক বন্ধুর ম্যাগাজিনের জন্য কমিক স্ট্রিপ তৈরির প্রস্তাব এল। ফরমায়েশি এই কমিক স্ট্রিপ তৈরির সুযোগ পেতেই প্রথমবার উপলব্ধি করলেন এটা স্রেফ শখের থেকেও বেশি কিছু হতে পারে, ছবি আঁকার বিষয়টা সেই প্রথম গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন রামিয়া। কাজের মধ্যে আরও উদ্ভাবনের সঞ্চার করে নতুনভাবে গল্প বলার চেষ্টা করতে লাগলেন। "কারও জন্য ভেবে সেই ভাবনাটা ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে আমি এখন খুব উপভোগ করি", স্বগতোক্তি রামিয়ার।

স্কুলজীবনে ছবি আঁকা, ভাস্কর্য, নাচ, গানের মতো সৃজনশীল বিষয়গুলোতে আগ্রহ ছিল রামিয়ার। বাড়ি থেকে কোনও বিষয়ে আপত্তি না করলেও একটা সময় কি নিয়ে কেরিয়ার বাছবেন, ভেবে কূল পাচ্ছিলেন না। শেষে ভেলোর ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লেন বটে, কিন্তু পাস করার পর ফের একবার কেরিয়ার নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তারপর হঠাৎ করেই একদিন যোগ দেন এক প্রকাশনা সংস্থায়। এই কাজই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ‘প্রকাশনা সংস্থায় আমি পড়ার বইয়ের প্রুফ চেক করতাম, বাড়ি ফিরে কমিক্স আঁকতাম, ভ্রমণের গল্প লিখতাম। তখনই আমি উপলব্ধি করলাম, লেখা আর ছবি আঁকা আমার সব সময়ের সঙ্গী’।

দ্য ট্যাপ নামে নিজের এই কমিক্সের জগৎ শখেই বানিয়েছিলেন রামিয়া। টুকটাক ফরমায়েশি কমিক্স আঁকতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন এটাই তাঁর ভালোবাসা। তবে তিনি একা এই কাজ করেন বললে ভুল হবে, পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব মিলিয়ে তাঁরা একটা ইউনিট, কারণ এই লোকগুলো পাশে না থাকলে তিনি দৃপ্ত পদক্ষেপ ফেলার সাহসই পেতেন না। রামিয়া জানিয়য়েছেন, ‘দোকানপাটে গিয়ে আমার ছবি আঁকার সামগ্রী কেনা হোক কিংবা আঁকার সমালোচনা, সবেতেই আমার পরিবার ও বন্ধুরা প্রচণ্ড সাহায্য করে’।

তবে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তাঁকে নিজেকেই হতে হয়। ‘না’ বলার ব্যাপারে পটু না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই কর্মক্ষেত্রে ঠকতে হয়েছে। তবে আস্তে আস্তে নিজের কাজের মূল্যায়ন করতে শিখেছেন রামিয়া। ব্যবসার কৌশল শিখতে রীতিমতো কোর্স করে পড়াশোনাও করেছেন। 


রামিয়ার আঁকা কার্টুন স্ট্রিপ
রামিয়ার আঁকা কার্টুন স্ট্রিপ

নিজের কাজে এখন ভালবাসা আর একাগ্রতার সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতার মিশেলও ঘটাচ্ছেন রামিয়া। বড় হোক বা ছোট, যেকোও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি নিজেকে একটা প্রশ্ন করেন – ‘আমি কী হারাবো?’ আর তাতেই অনেকখানি মুশকিল আসান হয়ে যায়।

ওঁর তেমন কোনও বাঁধাধরা রুটিন নেই। চা-কফির বিরতি লেগেই থাকে, মাঝে সাঝে ছুটি কাটাতে পাহাড়ে যান। তবে হ্যাঁ, পেশায় সফল হতে গেলে যে প্রাথমিক কিছু শর্তপূরণ জরুরি, তা মানেন এই তরুণ শিল্পী। রামিয়ার কমিক্স আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হচ্ছে, তবে সাফল্যের চূড়ায় যাওয়ার পথ যে এখনও অনেক বাকি, তিনি জানেন।

একদা খামখেয়ায়ালি এই শিল্পীর নিজের জীবন থেকে একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে – ‘একবার নিজের ভালোবাসার পেশা পেয়ে গেলে জীবনটা অনেক মসৃণ হয়ে যায়, কিন্তু যতক্ষণ সেই ভালোবাসার খোঁজ পাচ্ছ, সন্ধান জারি থাকুক’।

Related Stories