আমৃত্যু ২০ টাকায় রোগী দেখতেন যে ডাক্তার...

1

ডাক্তারবাবুরা রোগী পেলেই পকেট কেটে টাকা আদায় করেন। এমন অমানবিকতার নজির ভুরিভুরি। খবরের কাগজে, টিভিতে বা মিডিয়ায় ডাক্তারবাবুদের অমানবিকতার নজির নিয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ কাহিনি নিত্য প্রচারিত হচ্ছে। ফলে ডাক্তারবাবুদের পেশার প্রতি সাধারণ ভূক্তভোগী মানুষের মর্যাদাবোধ এখন প্রায় তলানিতে।

কিন্ত পৃথিবী যে পুরোপুরিভাবে সত্যিসত্যি এখনও ধ্বংস হয়ে যায়নি, তার প্রমাণও ইতিউতি ছড়িয়ে রয়েছে। সেই নজিরগুলি হয়তো ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে জেগে ওঠা ফিনিক্স পাখির রূপকথার গল্পের মতো।

আশা করার মতো এমনই একজন মানুষ ছিলেন কোয়েম্বাটোরের বাসিন্দা পেশায় ডাক্তার ভি বালাসুহ্মমনিয়াম। ৬৮ বছরে্র এই ডাক্তারবাবু প্রয়াত হয়েছেন সম্প্রতি। তাঁর শেষযাত্রায় কোয়েম্বাটোর শহরের অন্ততপক্ষে হাজার খানেক দরিদ্র মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছেন। দরিদ্র মানুষগুলি স্মরণ করেছেন ডক্টর বালাসুহ্মমনিয়ামের সহৃদয়তা। দরিদ্র রোগীদের প্রতি তাঁর আজীবনের দায়বদ্ধতার গল্প।

এমপ্লয়িজ স্টেট ইনসিওরেন্স কর্পোরেশনে চাকরি করতেন ভি বালাসুহ্মমনিয়াম। চাকরি জীবনেও ছিলেন দায়বদ্ধ পেশাদার। অবসর নেওয়ার পরে কোয়েম্বাটোর শহরের একপ্রান্তে সিধাপুদুর এলাকায় নিজে চেম্বার করেন। সেখানে মূল শহরের ও পাশ্ববর্তী‌ এলাকার গরিব মানুষকে বছরের পর বছর সেবা দিয়ে এসেছেন নামমাত্র টাকায়।

প্রথমদিকে ২ টাকা ভিজিট নিতেন। পরে সেটা সামান্য কিছু বাড়িয়ে রোগীপিছু ১০ টাকা বরাদ্দ করেন। আমৃত্যু ২০ টাকা ভিজিটে রোগী দেখে এসেছেন তিনি। আর ওষুধপত্র দিতেন বিনা পয়সাতে। প্রয়োজনে রোগীকে ইঞ্জেকশন দিতে হলে সে বাবদও এক পয়সাও নিতেন না।

আজকের পৃথিবীতে এমন মানুষের মৃত্যু তো অপূরণীয় ক্ষতিই! জনপ্রিয় ডাক্তার বালা ভি সুব্রহ্মমনিয়ামের শবদেহটি তাঁর রোগী ও রোগিণীরা মিছিল করে স্থানীয় শ্মশানে্ নিয়ে গেলেন। অন্ততপক্ষে হাজারের ওপর মানুষ শেষযাত্রায় সমবেত হন। ওঁরা শেষশ্রদ্ধা জানাতে স্মরণ করলেন সাধারণ মানুষের প্রতি ডাক্তারবাবুর প্রীতি ও ভালোবাসার কথা।

অরুণ নামে প্রাক্তন এক রোগীর কখায়, সোনার মানুষ বলতে যা বোঝায়, সেরকমই একজন আদর্শ মানুষ ছিলেন ডাক্তারবাবু। ওঁর মৃত্যুতে আমাদের মতো গরিব মানুষের বিরাট ক্ষতি হল। প্রতিদিন নিয়ম করে ১০০ থেকে ১৫০জন রোগী দেখতেন বালাসুব্রহ্মনিয়াম। সেবার বিনিমযে কারও কাছ থেকে কখনও ২০ টাকার বেশি নেননি তিনি। রোগী বা রোগিণীকে শহরের অন্য ডাক্তারের কাছে পাঠানোর প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রে তাঁর পাঠানো রোগীদের নামমাত্র খরচে দেখে দিতেন শহরের অন্য কয়েকজন ডাক্তারবাবু।

নিজের হাতে সব কাজই করতেন বালাসুহ্মমনিয়াম। গরিবের কাছ থেকে টাকা আদায় করে নিজের রোজগার বাড়াবেন না বলে নার্স বা অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজও নিজের হাতেই করে নিতেন। আর বলতেন, খাওয়াপরা আর নিজের নৈমিত্তিক খরচ-খরচা চালানোর জন্যে রোগীদের কাছ থেকে কিছু টাকা নিতেই হয়। না হলে আজীবন দাতব্য ডাক্তারখানা চালানোর সাধ ছিল এই মানুষটির।

এ যুগের ডাক্তারবাবুদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের বহু অভিযোগ। এর ভিতর প্রধান একটি অভিযোগ হল, অধিকাংশ ডাক্তারবাবুই টাকার পিশাচ। আদ্যন্ত অন্যরকম ডাক্তার ছিলেন ভি বালাসুহ্মমনিয়াম। মানুষের হৃদমাঝারে অমলিন থেকে্ যাবে তাঁর জীবনের ত্যাগব্রত।