Moving Scenes ইউনিকর্ন হওয়ার স্পর্ধা রাখে

5

ছোটবেলার একটা কথা মনে পড়ে গেল। আমার বাবা বলতেন, শেক্সপিয়র চাইলে আইনস্টাইন হলেও হতে পারতেন। কিন্তু আইনস্টাইন চাইলেই শেক্সপিয়র হতে পারতেন কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। তখন আমার মনে হত আমি সাহিত্যের ছাত্র বলে হয়তো সান্ত্বনা দিতেন আমার প্রেরণাদায়ী বাবা। কিন্তু সোমেককে দেখে পুরনো সেই কথাগুলো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে। সোমেক চৌধুরী। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। নাটক ভালোবাসেন। থিয়েটারকর্মী। অভিনয় করেন। যুক্ত ছিলেন নাসেরুদ্দিন শাহর থিয়েটার গ্রুপ মটলির সঙ্গে। ব্যারি জোনের Theatre Action Group এ অভিনয় করতেন। খাওয়াদাওয়া, সিনেমা, এবং ভ্রমণের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্লগ লেখেন সোমেক। পাশাপাশি পেশাদার সালসা ডান্সার এবং প্রশিক্ষক। কাজের সূত্রে দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন মুম্বাইয়ে। সোমেক আট বছর কলকাতার বাইরে কাটিয়ে ফিরে এসেছেন নিজের শহরে। সৃজনশীল নানান ভাবনা নিয়ে। স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার ইচ্ছে নিয়ে। উদ্যোগপতি হওয়ার ইচ্ছের পোকাটা কামড়ে দেওয়ার পর আর স্থির থাকতে পারেননি। আগেই বলেছি সাহিত্যের ছাত্র। ফলে ব্যবসার সবটাই ঠেকে শিখতে হয়েছে। বিজনেস প্ল্যান তৈরি করা থেকে কোম্পানি তৈরির খুঁটিনাটি। সবই যথেষ্ট গবেষণা করে শেখা। একটু খুঁতখুঁতে। এতটাই যে প্রতিটি পা-ই অঙ্ক-কষে ফেলছেন আজকাল। বলছিলেন ওর স্টার্টআপ মুভিং সিন্সের কথা।

আপনি কি জানেন এই ২০১৭ সালে দাঁড়িয়ে অনলাইন ট্রাফিকের ৭৪ শতাংশই আসে ভিডিও কনটেন্ট থেকে। এই পরিমাণটা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রতিদিন ৫৫ শতাংশ দর্শক অনলাইনে ভিডিও দেখছেন। যারা অনলাইনে ভিডিও দেখেন তাদের ৬৫ শতাংশই এক নাগারে একটি ভিডিওর তিন চতুর্থাংশ দেখেন। ফেসবুকে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন মানুষ ভিডিও দেখেন। আর শব্দ বন্ধ করে দেখেন তাদের ৮৫ শতাংশ। 

শুধু তাই নয়, যারা খুবই কেজো এবং জ্ঞান আহরণের জন্যেই সার্চ ইঞ্জিন তন্নতন্ন করে খোঁজেন তেমন গবেষকদের ৫৯ শতাংশই জানিয়েছেন কোনও একটি বিষয়ে যদি টেক্সট আর ভিডিও দুরকম রিসোর্স পাওয়া যায় তবে ভিডিওই তাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে থাকে। এখান থেকে নিশ্চয়ই আপনি ট্রেন্ডটা আন্দাজ করতে পারছেন। তবু বলে রাখি, অনলাইনে বাংলা ভাষায় কিন্তু কনটেন্ট খুব বেশি নেই। অনলাইনে পাওয়া যায় এমন কনটেন্টের শুধুমাত্র ১০ শতাংশই আছে ইংরেজি নয় এমন ভাষায়। বাংলায় তা আরও নগণ্য। যেটুকু আছে তাও বাংলাদেশের সৌজন্যে। এখানেই সম্ভাবনার বীজ দেখতে পেয়েছেন কলকাতার এই তরুণ উদ্যোগপতি। মূলত বাংলার জন্য অভিনব নেটফ্লিক্স তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছেন ২০১৫ সালের শেষাশেষি। আমাদের এই কাহিনির নায়ক সোমেক চৌধুরী ২০১৬ সালে তৈরি করে ফেলেছেন তাঁর সংস্থা। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ মুভিং সিন্সের।

বলছিলেন ব্যবসা করাটা ওদের পরিবারে এই প্রথম। কিন্তু মগজে আইডিয়া বাল্ব জ্বলে ওঠাটা ওর জন্মগত। কিন্তু ঝপাং করে ঝুঁকি নেওয়ার জন্যে যে পুঁজি লাগে সেটার জোগাড় করাটাই ছিল প্রথম অন্তরায়! বলছিলেন এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা রোজগারই বিনিয়োগ করেছেন মুভিং সিন্স প্রাইভেট লিমিটেড তৈরির পিছনে। ওর কোম্পানির নামটা শুনে মনে হতে পারে কোনও প্রোডাকশন হাউসের নাম। মনে হতে পারে সিনেমার প্রযোজকের ঠিকানা। সোমেক বলছেন এগুলো এখনই নয়। এখন মূল ভাবনা একটি অ্যাপলিকেশন নিয়ে। অ্যান্ড্রয়েড এবং আইওএস। এমন একটি সার্ভিস অ্যাপ যা প্রতিস্পর্ধা দেখায় তাবড় বিজনেস মডেলকে। প্রাথমিক ভাবে বাংলাদেশ, কলকাতা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরাই ওর টার্গেট অডিয়েন্স। পাশাপাশি ভারতীয় ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষায় তৈরি কনটেন্ট রাখছেন মুভিং সিন্স-এ। অন্যান্য ভারতীয় ভাষা নিয়েও ভাবতে চান সোমেক।

আপনি হয়তো ভাবছেন মুভিং সিন্সের আসল ফান্ডাটা ঠিক কী! কেনই বা মনোরঞ্জনের জন্যে দর্শক ঢুকবেন এই প্ল্যাটফর্মে! এটা তো হটস্টার নয়! যে টিভির সিরিয়াল, ক্রিকেট ম্যাচ দেখা যাবে, তাহলে কী ধরণের কনটেন্টের জন্যে মুভিং সিন্স-এ আসবেন দর্শক? প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খেতেই সোমেকের উত্তর তৈরি। এই অ্যাপে আপনি ঢুকলে বিনে পয়সায় দেখতে পাবেন ফিল্ম। এক্সক্লুসিভ ফিল্ম। যা আপনি কোথাও পাবেন না। ওর মুভিং সিন্সের ঘড়িতে এক সেকেন্ড অ্যাড = এক মিনিট এন্টারটেইনমেন্ট। তিরিশ সেকেন্ড অ্যাড দেখলে রোজগার করবেন তিরিশ মিনিট ফিল্ম দেখার ক্রেডিট। যত অ্যাড দেখবেন তত বাড়বে ক্রেডিট। তত দেখতে পারবেন আপনার পছন্দের ফিল্ম, গানের অনুষ্ঠান, ওয়েব সিরিজ কিংবা স্ট্যান্ড আপ কমিডি। চাইলে পছন্দের মুভি অফলাইন দেখার জন্যে এনক্রিপ্টেড ফাইল ডাউনলোডও করতে পারেন। শুধু তাই নয় অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইন শো দেখারও টিকিট পেয়ে যেতে পারেন মুভিং সিন্সের মারফত। একটি পয়সাও খরচ করতে হবে না। আজ্ঞে হ্যাঁ। এখানেই নেটফ্লিক্স বা অন্য যেকোনও সংস্থার থেকে আলাদা মুভিং সিন্স। এন্ড ইউজার পরিষেবা পাবেন একদম বিনামূল্যে।

পাশাপাশি আপনি যদি ফিল্ম তৈরি করেন। তাহলে সেটা আপলোড করতে পারবেন এই প্ল্যাটফর্মে। আর পাবেন রয়্যালটি। শুকনো প্রতিশ্রুতি নয়। এটাই ওদের বিজনেস মডেল। পাশাপাশি লাইভ শোও থাকবে মুভিং সিন্সে। ফলে শুধু সিনেমা নয়, বাংলা ভাষার দর্শক এবং গ্রাহকদের যেকোনও ধরণের মনোরঞ্জনের জন্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি অ্যাপ এই মুভিং সিন্স। 

১৭ জুন কলকাতার জ্ঞানমঞ্চে আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন এই অ্যাপের। সোমেকের নিজস্ব প্রোডাকশনে তৈরি ওয়েব সিরিজ শরীর বনাম মনও তৈরি। ফলে বলাই বাহুল্য সোমেকের এই বাণিজ্যিক উদ্যোগ সংস্কৃতি মনস্ক কলকাতার অতি প্রয়োজনীয় একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে শিগগিরই। এমন হতেই পারে, লিটল ম্যাগাজিনের কবিতা পাঠের আসর থেকে সরাসরি লাইভ ওয়েব কাস্ট হবে মুভিং সিন্সে। আকাদেমির নাটকও চাইলে গাঁটছড়া বাঁধতে পারে। এমনকি কফি হাউসের আড্ডাও। ফিল্ম তৈরি নিয়ে মেতে আছে যে কলকাতার যৌবন তারাও পেয়ে যাবে তাদের নিজস্ব দর্শককুল। এভাবেই বাংলার সংস্কৃতির মণ্ডপে দীর্ঘমেয়াদি একটা দাগ কেটে যেতে চলেছেন বাঙালি উদ্যোগপতি এই যুবক এবং তাঁর স্টার্টআপ। যা কলকাতা থেকে গজিয়ে উঠে ইউনিকর্ন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে মাথা তুলছে।

Related Stories