৬০ টাকার কর্মচারী থেকে শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষে

0

দুশো বর্গফুটের ঘরভাড়া। তার মধ্যে পাঁচজনের সংসার। রোজগার অতি সামান্য। তার মধ্যে কোনওমতে দিন গুজরান। এমন অবস্থায় পড়েও নির্লিপ্ত থাকতেন গৃহকর্তা। নিন্দুকেরা ঠাসাঠাসির সংসারে খোটা দিলেও ‘রা’ কাড়তেন না তিনি। মনে মনে বোধহয় বলতেন, ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়’। চরম সংকটের মুখে পড়েও যাঁর এই জীবনদর্শন, তাঁর উন্নতি ঠেকায় কে। হলও তাই। ছোট ঘরে একসঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে কাজে এল। হুগলির বুকে প্রথম বহুতল আবাসন গড়ে তুললেন ‘গৃহকর্তা’ থুড়ি রাজকুমার গুপ্ত।


১৯৮৪ সালে জন্ম নিল ‘মুক্তি গ্রুপ’। সেই থেকে শুরু। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রাজকুমারের হাত ধরে বঙ্গের নির্মাণ শিল্পে ঘটে গেল এক বড়সড় পরিবর্তন। এরপর একে একে মাল্টিপ্লেক্স, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, রেস্তোঁরা সবই রূপ পেল মুক্তি গ্রুপের উদ্যোগে। চেয়ারম্যান পদে বসে কেবল ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাটা ছকে দিলেন রাজকুমার।

পঞ্জাবের এক গরিব পরিবারে জন্ম রাজকুমারের। ছোট থেকে অভাব, অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। সে কারণে স্কুলের পাঠ শেষ করতেও বেগ পেতে হয়েছিল। সেখান থেকে আচমকা কলকাতায় আগমন। এ শহর থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে পাস করা। এরপর ভাট জোটাতে বেসরকারি একটা ছোট ফার্মে চাকরি। ১৯৭৮ সাল থেকে টানা বেশ কয়েক বছর সেখানেই চলে চাকরিজীবন। মাস গেলে যেখানে পরিশ্রমের ফসল ছিল মাত্র ৬০ টাকা। সংসার চালাতে এই টাকাই বহুমূল্য হয়ে ওঠে রাজকুমারের কাছে। পরবর্তীকালে সুযোগ পান ‘হিন্দুস্থান মোটরস’-এ। এবার কিন্তু বেতন এক লাফে বেড়ে দ্বিগুণ। মাসিক ১২৫ টাকায় সেখানে কাজ যোগ দেন রাজকুমার। একাধারে ৬ বছর হিন্দমোটরে কাজ করেন তিনি। তবে বেতনের অঙ্কের থেকেও কোম্পানিতে কাজের অভিজ্ঞতা পরে ভীষণভাবে কাজে লাগে তাঁর।


একদম নীচু স্তর থেকে কাজ করায় কোম্পানির ব্যবসার কায়দা-কানুন বুঝে নেন তিনি। পরবর্তীকালে সেই অভিজ্ঞতায় ভর করে নিজের ব্যবসা শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে ট্রেডিং সরবরাহের ব্যবসায় লগ্নি করেন। বিশাল কিছু লাভ না হলেও সংসার চলে যাচ্ছিল রাজকুমারের। কিন্তু তিনি যে আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন ‘মুক্তির’ সওদাগর। নিয়তি বোধহয় আগেভাগেই কিছু ভেবে রেখেছিল তাঁর জন্য।জীবনে কেবল অর্থ উপার্জনই মূল লক্ষ্য ছিল না তাঁর। ‘মানি’-র থেকেও মান-কেই সর্বদা গুরুত্ব দিতেন। সে কারণে ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে খুলে বসেছিলেন সমাজকল্যণের ‘দোকান’। গরিব-গুর্বোদের জন্য শুরু করেছিলেন বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা। যার উদ্বোধন করেছিলেন ‘হিন্দ মোটরস’-এর প্রেসিডেন্ট এন কে বিড়লা। খবরটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সময় নেয়নি। এরপর থেকে সমাজকল্যাণে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন রাজকুমার গুপ্ত। ভাল কাজের স্বীকৃেতি স্বরূপ অল্প দিনের মধ্যেই ‘রোটারি ক্লাব’-এর সাম্মানিক সদস্য পদ লাভ করেন।


রোটারি ক্লাবে নিত্যদিনই ছিল বহু বিনিয়োগকারীদের আনাগোনা। এহেন ক্লাবে সদস্যপদ মেলায় ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে যায় রাজকুমারের। ভদ্র, নম্র ব্যবহার ও মিতভাষী রাজকুমারকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন সকলেই। নিজের ব্যবসার চিন্তাভাবনাগুলো সহজেই তাদের সামনে মেলে ধরেন তিনি। পরে রাজকুমারের হাসপাতাল, বহুতল, আবাসনের মতো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এরা অনেকেই লগ্নি করেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই ভাগ্যদেবীর প্রসন্নতা লাভ করেন রাজকুমার। তাঁর ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠতে থাকে।


নির্মাণ শিল্পে সু-পরিচিত না হয়ে ওঠায় মুক্তি গ্রুপের কাছে বহু লোভনীয় প্রস্তাব আসতে থাকে। সময়টা নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে। যদিও নির্মাণ শিল্পে আর ঝুঁকতে চাইছিলেন না স্বয়ং গ্রুপের চেয়ারম্যান। মাটি ছেড়ে এবার আকাশের পথে পা বাড়াতে চাইছিলেন তিনি। খুলতে চাইছিলেন নিজের এয়ারলাইন্স কোম্পানি। বিমানসংস্থার অ-আ-ক-খ না জানলেও উদ্যমের অভাব ছিল না রাজকুমারের। লাইসেন্স পেতে গিয়ে টাটা-সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের সঙ্গে লড়তে হয় তাঁকে। শেষ রাজকুমারের ওপর আস্থা রাখে তৎকালীন অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক। কিন্তু হর্ষদ মেহতা দুর্নীতি মামলায় বড়সড় ধাক্কা খায় ভারতীয় অর্থনীতি। ‘মুক্তি এয়ারওয়েজ’-এ লগ্নি করতে বেঁকে বসেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে উড়ান ভরার আগেই মাটিতে আছড়ে পড়ে রাজকুমারের স্বপ্নের উড়ান। এই ঘটনায় খুবই ভেঙে পড়েন তিনি। ধাতস্থ হতে সময় লাগে আরও বেশ কিছু দিন। সেই সময় বিমানসংস্থার জন্য রাখা পুঁজি নির্মাণ শিল্পই ঢেলে দেন রাজকুমার। একদিন যাঁকে ব্যবসাদার হিসাবে চিনত মানুষ, তিনিই হয়ে ওঠেন দেশের নির্মাণ শিল্পের অন্যতম পরিচিত নাম।

তবে এত সাফল্য পেয়েও ২০০ বর্গফুটের এক কামরায় সংসারের কথা ভোলননি রাজকুমার। ভোলেননি ৬০ টাকা মাস মাইনের চাকরি। কারণ তাঁকে জীবন শিখিয়েছে, সাফল্য নয়, ব্যর্থতাই জীবনের উন্নতির পুঁজি।

Related Stories