চেনা পেশার বাইরে এক মহিলা পুরোহিতের কাহিনি

1

জি মারাঠির জনপ্রিয় সিরিয়াল ‘অ্যাসে হে কন্যাদান’। সেই সিরিয়ালের দুই প্রধান চরিত্র কার্তিক ও গায়ত্রীর বিয়ে দিতে দেখা ‌যায় এক মহিলা পুরোহিতকে। ‌যদিও এটা ছিল নেতাহই একটা সিরিয়াল, তবু এখানে যাঁকে মহিলা পুরোহিতের চরিত্রে দেখা গিয়েছে তিনি বাস্তব জীবনেও একজন মহিলা পুরোহিতই। পুনের ৪৬ বছরের মণীষা শেতে আট বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে ‌যুক্ত। এই পেশায় আসার জন্য প্রথম জীবনে দুই গুরুজির কাছে তালিম নিয়েছিলেন মণীষা। কীভাবে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ও শাস্ত্রীয় রীতি পালন করতে হয়, পুজো করতে হয়, তা তাঁকে শিখিয়েছিলেন ওই গুরুজিরাই।

কমার্সে স্নাতক মণীষা স্নাতকোত্তর করেন ইন্ডোলজিতে। যেখানে ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করতে হয়। এই সময় থেকেই মহিলা পুরোহিত হওয়ার পোকা মাথায় নড়ছিল তাঁর। তাই পুনেতেই ‘জেনানা প্রাবধিনি’ বা নারী শক্তি, শিক্ষার বিষয় নিয়ে চর্চা শুরু করেন তিনি। শাস্ত্রীয় ক্রিয়াকলাপ এবং তা কেন পালন করা জরুরি তা নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা শুরু করেন মণীষা। ‌নাস্তিকরা এগুলোকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিলেও এর পিছনে একটা বিজ্ঞান কাজ করছে জেনে মণীষার উৎসাহ আরও বেড়ে যায়। প্রবল আগ্রহ তাঁকে বিষয়গুলির গভীরে পৌঁছতে সাহায্য করছিল। দ্রুত রপ্ত হচ্ছিল বিভিন্ন পাঠ।

সমস্যাটা হল বাড়িতে। একদিন মণীষা বাড়িতে খোলাখুলি জানিয়ে দিলেন তিনি মহিলা পুরোহিত হতে চান। এ নিয়ে আরও পড়াশোনা করতে চান। বাড়ির মেয়ের এমন এক অদ্ভুত আবদারে চোখ কপালে ওঠে সকলের। মণীষার কথায় তাঁরা বুঝতেই পারছিলেন না সব ছেড়ে কেন মহিলাদের জন্য এমন এক অপ্রিয় পেশা বেছে নিতে চাইছেন তিনি। তবে হাল ছাড়েন নি মণীষাও। বাড়ির সকলকে তিনি একসময়ে বোঝাতে সক্ষম হন কেন তিনি এই পেশাকে বেছে নিচ্ছেন। তাঁর দৃঢ়সংকল্প মনোভাবের সামনে এক সময়ে হাল ছাড়েন সকলে। মেনে নেন মণীষার সিদ্ধান্ত।

একজন মহিলা পুরোহিত হিসাবে মণীষার প্রথম কাজ ছিল পুনের একটি পরিবারের সদস্যের মৃত্যুর পর তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করানো। মণীষার মতে, সেদিন সকাল থেকেই তিনি ভীষণ মানসিক চাপে ভুগছিলেন। সবকিছু ঠিকঠাক হবে কিনা তা নিয়ে চিন্তা তাঁকে চেপে ধরছিল। মণীষা বেশ বুঝতে পারছিলেন একজন মহিলা পুরোহিত হওয়ায় তিনি সব কাজ ঠিকঠাক করছেন কিনা সেদিকে সকলের কড়া নজর থাকবে। ফলে কোথাও কোনও ভুলচুকের এতটুকু সুযোগ যে তাঁর নেই তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু সেদিন চোখে পড়ার মত ভাল কাজ করেন মণীষা। কাজের শেষে সকলেই স্বীকার করে নেন কাজের পর তাঁরা ভীষণ শান্তি পেয়েছেন।

প্রথম দিনের সেই সাফল্যের পর মণীষাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। নামকরণ থেকে বিয়ে, শ্রাদ্ধ থেকে ভুমিপূজা, সবেতেই ডাক পড়তে থাকে মণীষার। মণীষার স্বামী প্রিন্টিংয়ের কাজ করতেন। ফলে সংসারে খুব বড় অঙ্কের টাকা তিনি দিতে পারতেন না। মণীষা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে দেন। স্বামী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসারে মণীষাই প্রধান উপার্জনকারীর ভূমিকা নেন।

বিশ্বায়নের ‌যুগে অনেকেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত। কিন্তু নিজের শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার একটা ইচ্ছা তাদের সকলেরই আছে। সেকথা মাথায় রেখে ‌যাবতীয় শাস্ত্রীয় কাজকর্ম ইংরাজিতে করা শুরু করেন মণীষা। ফলে বিদেশে কর্মরতরাও তাঁকে ডাকতে শুরু করেন। কারণ মণীষা ভারতীয় শাস্ত্রীয় কাজকর্ম তাঁদের ইংরাজিতে বুঝিয়ে দেন। ‌বলার অপেক্ষা রাখেনা এটা বিদেশে বসবাসকারীদের যথেষ্ট প্রভাবিত করে।

মণীষা যেখানেই পুজো করতে যান সেখানেই পুজোর আচার অনুষ্ঠান থেকে শ্লোক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সকলকে বুঝিয়ে দেন। তাতে সকলে বুঝতে পারেন কার পরে কী হচ্ছে এবং কেন হচ্ছে। একবার এক মহিলা তাঁর মেয়ের কন্যাদান নিজে হাতে করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কারণ তাঁর স্বামীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভাল ছিল না। ‌যদিও ভারতীয় সমাজে কন্যাদান পুরুষদের কাজ হিসাবে স্বীকৃত। তবু ওই মহিলা নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তিনি একটা ব্যবস্থা করার জন্য মণীষাকে অনুরোধ করেন। মণীষা তাঁকে আস্বস্ত করেন, তিনিই তাঁর মেয়ের কন্যাদান করবেন। হলও তাই। মণীষা বলছিলেন সেদিন কন্যাদানের পর ওই মায়ের চোখে যে আনন্দাশ্রু তিনি দেখেছিলেন তা কখনও ভোলার নয়।

মণীষার আক্ষেপ যেখানে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে এত আলোচনা হয় সেখানে ভারতে শাস্ত্রীয় কাজকর্মে মহিলাদের সমানাধিকার এখনও স্বীকৃতি পেল না। মহিলাদের এভাবে পিছিয়ে রাখাটা এখনও মেনে নিতে পারেন না স্বল্পভাষী মণীষা। মণীষার মতে, মহিলাদের মাসিক তাঁদের শারীরিক দিক থেকে কিছু অস্বস্তির কারণ হতে পারে। কিন্তু এটা একেবারেই প্রাকৃতিক বিষয়। মাসিকের ছুতোয় মহিলাদের শাস্ত্রীয় কাজ থেকে দূরে রাখার মানে তাঁর কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। বরং এই প্রথাকে অর্থহীন বলেই মনে করেন মণীষা শেতে। তবে শুধুই মহিলা পুরোহিত হিসাবে পুজো করে বেড়ানো নয়, ‘টরটয়েস ইন ইন্ডিয়ান কালচার’ বা ভারতীয় সংস্কৃতিতে কচ্ছপের ভূমিকা নিয়ে গবেষণার কাজও জোড় কদমে চালিয়ে ‌যাচ্ছেন মণীষা।