গুজরাতে জলের সমস্যা মেটাচ্ছে 'ভুঙ্গরো'

0

দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের খেত। গোলায় অঢেল দানাশস্য। কৃষক পরিবারে সচ্ছলতা। স্বামী, সন্তান নিয়ে কৃষক রমণীর সুখের সংসার। গ্রামীণ ভারতের কথা ভাবলে হয়তো এমন একটা পরিপূর্ণ ছবিই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন। বসুন্ধরা শস্যশ্যামলা ঠিকই, তবে সেই আশীর্বাদ সব অঞ্চলে সকলের জন্য নয়।

পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে কী হবে সেটা ভাবতেই শিউরে ওঠেন ভারতের কোনও-কোনও অঞ্চলের মানুষ। অনাবৃষ্টি মানেই খরা। চাষের কাজে মেলে না জল। খেতেই শুকিয়ে যায় ফসল। এমনই এক রাজ্য গুজরাত।ভারতের পশ্চিম সমুদ্রতটের উত্তর দিক অধিকার করে আছে এই রাজ্য। রাজ্যে তিনটি ভৌগোলিক এলাকা। সৌরাষ্ট্র, কচ্ছ উপদ্বীপ ও সমতল ক্ষেত্র। সৌরাষ্ট্র পার্বত্য অঞ্চল, এখানে ছোট-ছোট পাহাড় দেখা যায়। কচ্ছ উপদ্বীপ উত্তর-পূর্ব দিকের রুক্ষ ও পর্বতময় অঞ্চল, এখানেই কচ্ছের বিখ্যাত রান বা মরুভূমি রয়েছে। কচ্ছের রান ও আরাবল্লী পর্বত থেকে প্রসারিত হয়ে দমনগঙ্গা পর্যন্ত পাললিক শিলায় গঠিত সমতল ক্ষেত্র। গুজরাতের সমতল এলাকা সবরমতী, মাহি, নর্মদা ও তাপ্তী নদী দ্বারা সিঞ্চিত।এছাড়া কয়েকটি ছোট নদীও এই অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত।গুজরাতের উত্তরপ্রান্ত দিয়ে কর্কট ক্রান্তি রেখা গিয়েছে। ফলে রাজ্যটিতে আবহাওয়ার বৈচিত্র লক্ষ্য করা যায়।কোথাও কোথাও সেই আবহাওয়া বেশ চরম।

গ্রীষ্মে যেখানে তাপমাত্রার পারদ চল্লিশ পেরিয়ে যায়, সেই আমেদাবাদের মেয়ে ত্রুপ্তি জৈন। কাজের সূত্রে গুজরাত ও রাজস্থানের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করেন ত্রুপ্তি। এইসব এলাকার পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ মহিলাদের নিয়ে কাজ করেন ত্রুপ্তি। চরম আবহাওয়া আর জলের সঙ্কট এই গ্রামীণ মহিলাদের জীবনকে পিষে মারে।শুকিয়ে যায় ঘর-সংসার। সেই তাদের মুখে হাসি ফোটাতেই ত্রুপ্তি গড়ে তুলেছেন নৈঋত সার্ভিসেস। তিনিই এর ডিরেক্টর। রয়েছেন ন'জন সদস্য। যাদের কাজই হল ভুঙ্গরোর রুপায়ন। নৈঋত'র এক্সিকিউশন টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন NSPL ও অশোকা গ্লোবালাইজারের ডিরেক্টর বিপ্লব কেতন পাল। ত্রুপ্তি নিজেও রকফেলার ফাউন্ডেশনের ফেলো। এনভায়রনমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও বিশেষ পারদর্শিতা রয়েছে তাঁর।শুধু গুজরাত নয়, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, কর্নাটকেও কাজ করে নৈঋত সার্ভিসেস। আগামীদিনে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও হরিয়ানাতেও কাজ ছড়িয়ে দিতে চায় নৈঋত।


ত্রুপ্তি জৈন
ত্রুপ্তি জৈন

কী এই ভুঙ্গরো? গ্রামীণ ভারতে অনেকেই নিশ্চয় মহিলাদের হাতে বাঁশির মতো একটা পাইপ দেখেছেন, যার সাহায্যে ফুঁ দিয়ে উনুন বা চুলায় হাওয়া দেওয়া হয়। ফলে আগুন নিভতে পারে না। আবার বৃষ্টির জল ধরে রেখে প্রয়োজনের সময় তা সেচের কাজে লাগানোর পদ্ধতিরও নাম ভুঙ্গরো।কিন্তু প্রান্তিক চাষিদের কাছে ভুঙ্গরোর নাগাল সহজ নয়। টাকা, প্রযুক্তি,লোকবল কোনওটাই তাদের নেই। প্রান্তিক চাষিদের এই দুর্দশার কথা তুলে ধরা হয়েছে রাষ্ট্রসংঘের ২০১৩ সালের একটি রিপোর্টে।সেখানে বলা হয়েছে কম জমির এইসব কৃষকরাই উন্নয়নশীল দেশগুলির ৮০ শতাংশ মানুষের খাদ্যের যোগান দেন। খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র দূরীকরণ, উভয় ক্ষেত্রেই এইসব প্রান্তিক কৃষকদের অবদান রয়েছে। কিন্তু জমির পরিমাণ কমে যাওয়া, আর্থিক সহায়তার অভাব সেই অবদানকেই ক্রমশ প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। দিশাহারা হয়ে পড়েছেন এইসব প্রান্তিক কৃষকরাও।

গুজরাত ও রাজস্থানে ত্রুপ্তি লক্ষ্য করেছেন গ্রীষ্মকালীন বছরের আট মাস জলের জন্য কী কঠোর সংগ্রাম করতে হয় গ্রামীণ মহিলাদের। আবার বর্ষার সময় জলমগ্ন এলাকা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দৌড়ে বেড়ান তারা। দুটো ছবিই বলে দেয় অবস্থা কী করুণ!ত্রুপ্তি বলেন,'পর্যাপ্ত খাদ্য নিরাপত্তার অভাবে এইসব পরিবারগুলো ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে।কেউ জমিজমা বিক্রি করে অন্য জায়গায় কাজের সন্ধানে চলে যান। কেউ-কেউ আবার কৃষক থেকে দিনমজুর হয়ে যান। মহাত্মা গান্ধীর অন্ত্যোদয় নীতিকে সামনে রেখে ঠিক এই জায়গাটাতেই কাজ করে থাকে নৈঋত। পিছিয়ে থাকা শেষ ব্যক্তিকেও যতটা সম্ভব সহায়তা করা, এটাই আমাদের লক্ষ্য'। চুলা জ্বালাতে যেমন ভুঙ্গরো, ঠিক তেমনই এই পরিবারগুলোকে বাঁচাতেও ভুঙ্গরোকে কাজে লাগাচ্ছেন ত্রুপ্তিরা। কীভাবে? জল ছাড়া ফসল বাঁচানো যাবে না, আর ফসল বাঁচানো না গেলে এই পরিবারগুলোও বাঁচবে না।তাই জল ধরতে হবে, ফসল বাঁচাতে হবে। সহজ এই ফর্মুলা মেনেই কাজ করে থাকে নৈঋত। বিষয়টি ব্যাখা করে ত্রুপ্তি বলেন,'দেখা গিয়েছে একটি ভুঙ্গরো ইউনিট থেকে অফ সিজনে দশ লক্ষ লিটার জলের নিশ্চয়তা পান ক্ষুদ্র কৃষকরা।এভাবেই আমরা ২ লক্ষ হেক্টর জমিতে জলসেচের ব্যবস্থা করতে পেরেছি। বর্ষার সময় অতিরিক্ত জলটা আমরা মাটির নিচে ধরে রাখি। পরে সেটাই কাজে লাগান হয়'।এর ফলে উপকৃত হচ্ছেন হাজার-হাজার প্রান্তিক চাষি। জলের জন্য তাদের আর একশ্রেণির লোভী মানুষের কাছে হাত পাততে হচ্ছে না বা সর্বস্ব বিক্রি করতে হচ্ছে না। একটা সময় অভাবি চাষিদের অন্যভাবে ফাঁদে ফেলত মহাজনরা। জলের জন্য চুক্তি করা হত। চাষের কাজে জল মিলবে, তবে যা ফসল উৎপাদন হবে তার অর্ধেক নেবে জলদাতা মহাজন। শুধু এই নয়, কে জল পাবে আর পাবে না, তা পুরোটাই সেইসব মহাজনদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল।এমন এক জটিল পরিস্থিতিতে অনেক কৃষকই শেষ সম্বল জমিটি হারিয়েছেন। গ্রীষ্ম মানেই কৃষকদের কাছে আতঙ্ক। জল নেই, ফসল নেই, খাদ্য নেই। যা কিছু ভরসা বর্ষার কয়েকটা মাস। সারাবছরের খাদ্যের সংস্থান সেখান থেকেই করতে হবে।


কয়েক দশক ধরে চলে আসা প্রকৃতি বনাম প্রান্তিক কৃষকের এই জুয়ায় ছেদ টেনেছে ভুঙ্গরো।সেচের কাজে জল মিলেছে, ফসল বাঁচানো গিয়েছে। আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন ক্ষুদ্র কৃষকরা।ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হয়েছে কৃষক রমণীদেরও। এক অদ্ভুত উপায়ে দরিদ্র গ্রামীণ মহিলাদের ভুঙ্গরোর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে নৈঋত। একটি ভুঙ্গরো ইউনিট চালানোর জন্য বেছে নেওয়া হয় কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ জন মহিলাকে। এজন্য একটা বোঝাপড়ায় আসতে হয় সেইসব মহিলাদের। চুক্তি অনুযায়ী, যৌথভাবে তাঁরা তাঁদের ভুঙ্গরোর দায়িত্ব নেবেন, জল ভাগ করে নেবেন এবং একে অপরের জমিতে শ্রম দেবেন।একটি ভুঙ্গরোর বছরভর রক্ষণাবেক্ষনের খরচ পড়ে প্রায় ৯ লক্ষ টাকা এবং একটি ভুঙ্গরো ইউনিট বসাতে পারলে মোটামুটি ২০ বছর পরিষেবা পাওয়া যায়। গ্রীষ্ম ও শীতের সময় ধরলে একটি ভুঙ্গরো থেকে বছরে ২১ হেক্টর জমিতে সেচের কাজ হয়ে যায়। তাই এই প্রকল্প অনায়াসেই ৩০ থেকে ৫০ জনের (পরিবার পিছু ৫-৬ জন সদস্য ধরলে) খাওয়াপরার ব্যবস্থা করতে পারছে। ত্রুপ্তি জানালেন,'আগে এক একর জমি থেকে বড়জোর ৮ হাজার টাকার ফসল মিলত। এখন তা বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। ফলে এইসব পরিবারের বার্ষিক রোজগার ১২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা হয়েছে'।


মহিলাদের নিয়ে ভুঙ্গরোর এই সাফল্য অবশ্য সহজে আসেনি। ঋণভারে জর্জরিত কৃষকরা ভেবেছেন, তাদের পিষে মারার এটাও একটা ফাঁদ। যাদের কায়েমি স্বার্থে আঘাত লাগছিল তারাও বিরোধিতা করছিল।তারা রটিয়ে দেয় এটা আসলে জমি দখলের ছক।কিন্তু হাল ছাড়েননি নৈঋতর সদস্যরা। মহিলাদের নিয়ে ভুঙ্গরোর কাজ তারা চালিয়ে যেতে থাকেন। যখন ব্যাপারটা সাফল্য এনে দিল, অবাক হলেন কৃষকরাও।রুজি রোজগারের জন্য তারা বাইরে চলে যেতেন। তাদের স্ত্রীরা গ্রামে কী করছেন, কীভাবে বেঁচে আছেন তা জানার সুযোগই ছিল না। কিন্তু গ্রামে ফিরে স্ত্রী-মেয়েদের ভূমিকা তাদেরও উজ্জীবিত করেছে।


সামনের সারিতে একদম বাঁদিকে বিপ্লব কেতন পাল
সামনের সারিতে একদম বাঁদিকে বিপ্লব কেতন পাল

বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনুযায়ী বর্তমানে ভুঙ্গরোর ১২টি ডিজাইন রয়েছে। যেখানে কম বৃষ্টিপাত সেখানের জন্য এক ধরনের মডেল, আবার যেখানে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত সেখানের জন্য অন্য এক ধরনের মডেল। ভুঙ্গরো প্রকল্পে এগিয়ে এসেছে সরকারি সংস্থাগুলিও। দেশজুড়ে ১২টি রাজ্যে এই মডেল অনুসৃত হয়েছে। বিষয়টি আলোচিত হয়েছে সংসদ এবং নীতি আয়োগের বৈঠকেও। ভুঙ্গরোর ক্ষেত্রে অবশ্য প্রযুক্তি নির্ভরতা বেশি। স্থাপন করতে খরচাও বেশি। ফলে ভারতে এই প্রযুক্তি পুরোপুরি গ্রহণ করতে আরও একটা দশক লাগবে বলেই মনে করেন ত্রুপ্তি জৈন।তাঁর বিশ্বাস, গুজরাতের সব প্রান্তিক কৃষক এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে রাজ্যের কোষাগারে বছরে ৮০০ কোটি টাকা ঢুকবে। আর তাদের পরিবারেও সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি আসবে।