বিকল্প চিকিত্সার খোঁজ দেখাচ্ছেন রিতিকা

0

আকুপাংচার। শব্দটা অচেনা নয়। কিন্তু এই প্রাচীন চিনা চিকিৎসা পদ্ধতি এ দেশে তেমন জনপ্রিয় নয়। যদিও অনেকের বিশ্বাস এই চিকিৎসার গুণে বহু জটিল রোগের চিকিৎসা সম্ভব। এই বিশ্বাসের পিছনে তাঁদের হাতেকলমে অভিজ্ঞতাও কাজ করেছে। এমনই একটা বিশ্বাস রিটিকা আঞ্চিলাকে কর্পোরেট দুনিয়া থেকে টেনে নিয়ে এসেছে আকুপাংচারের বিকল্প চিকিৎসার জগতে।

যোগা, আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথি বা আকুপাংচার। সবই বিকল্প চিকিৎসা হিসাবে ভারতে নিজের একটা জায়গা করে রেখেছে। কিন্তু ভারতে এসব চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা বা এর প্রচলন তেমন বহুলপ্রচলিত নয়। তুলনায় পশ্চিমী দুনিয়ায় এসব চিকিৎসা পদ্ধতির কদর অনেক বেশি। একটি সুন্দর বিজ্ঞান হিসাবেই তাঁদের মনে জায়গা পেয়েছে এসব চিকিৎসা পদ্ধতি।

বর্তমানে ‌যদিও ভারতীয়রা আকুপাংচার চিকিৎসায় উৎসাহ দেখাচ্ছেন। ফলে গড়ে উঠছে আকুপাংচার চিকিৎসা কেন্দ্র। বেঙ্গালুরুতে তেমনই একটি আকুপাংচার চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন রিতিকা আঞ্চিলা। কিছুটা হঠাৎ করেই অকুপাংচার জগতে পা রাখেন তিনি। রাজস্থানের ভিলওয়ারার মেয়ে রিতিকার স্কুল ও কলেজ জীবন কেটেছে ভিলওয়ারাতেই। ২০০৫ এ এমবিএ করতে রিতিকা চলে আসেন পুনেতে। এমবিএ শেষ করে তিনি যোগ দেন চোলামণ্ডলম ডিবিএস ফিনান্স লিমিটেডে। এক বছর এখানে কাজ করার পর বিয়ে। ২০১০-এ বিবাহ সূত্রে তিনি চলে আসেন চেন্নাই। সেখানেই শ্বশুরবাড়ির এক সদস্যের চিকিৎসার জন্য তাঁকে নিয়ে একটি আকুপাংচার সেন্টারে হাজির হন রিতিকা। সেখানে চিকিৎসক এমএন শঙ্করের চিকিৎসা তাঁকে মুগ্ধ করে। রিতিকার মনে হয় এই চমকে দেওয়ার মত বিজ্ঞানকে আরও বেশি করে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। এই ভাবনা থেকেই কর্পোরেট দুনিয়া ছেড়ে আচমকাই রিতিকা পা রাখলেন আকুপাংচারের জগতে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই দীর্ঘদিনের জটিল রোগ আকুপাংচার কিভাবে সারিয়ে দিতে পারে সেকথা আরও বেশি করে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন রিতিকা।

সরু সরু সূচ দেহের বিশেষ বিশেষ অংশ বা আকুপাংচার পয়েন্টে প্রবেশ করিয়ে মানুষকে সুস্থ করে তোলাই এই চিকিৎসা পদ্ধতির বিশেষত্ব। চিনা এই পদ্ধতি দেহের শক্তিকে সঠিক মাত্রায় প্রবাহিত করিয়ে মানুষকে সুস্থ করে তোলে। মানব দেহের স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপ ও রোগের সঙ্গে লড়ার ক্ষমতাকে বাড়িয়ে এভাবে মানুষকে সুস্থ জীবন দেওয়ার নামই আকুপাংচার। আকুপাংচার থেরাপির এই অসাধারণ গুণই এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে চিনের বাইরে এতটা জনপ্রিয়তা দিয়েছে।

আকুপাংচারের প্রতি ভালবাসাকে হাতিয়ার করে রিতিকা চেন্নাইতে কমপ্লিমেন্টারি মেডিক্যাল অ্যাকাদেমি অফ আকুপাংচার সায়েন্স থেকে অ্যাডভান্স ডিপ্লোমা সম্পূর্ণ করেন। এখানেই শেষ নয়, এই চিকিৎসা পদ্ধতি সম্বন্ধে আরও জানতে ইন্ডিয়ান বোর্ড অফ অল্টারনেটিভ মেডিসিন থেকেও একটি কোর্স করেন রিতিকা। এরপর যোগ দেন চেন্নাইতে চিকিৎসক এমএন শঙ্করের হাই-কিওর আকুপাংচার সেন্টারে।

২০১২ সালে বেঙ্গালুরুতে পাড়ি দেন রিতিকা। সেখানে নিজের একটি হাই-কিওর আকুপাংচার সেন্টার চালু করেন তিনি। বেঙ্গালুরুতে তাঁর এই আকুপাংচার কেন্দ্র গড়ে তুলতে এমএন শঙ্করের কাছে ঋণী রিতিকা। সেকথা নির্দিধায় স্বীকারও করেন তিনি।জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সবরকম সাহা‌য্য শঙ্করের কাছে পেয়েছেন রিতিকা।

হাই-কিওর আকুপাংচার সেন্টার সম্বন্ধে মানুষকে জানাতে জাস্ট ডায়াল ও সুলেখার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন রিতিকা। এতে তাঁর সংস্থার খবর ওয়েবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে রোগীদের মুখ থেকেই এখানে চিকিৎসার সুফল সম্বন্ধে মানুষকে অবহিত করতে অনেক বেশি উৎসাহী ছিলেন রিতিকা।

২০১৫ সালে এমএন শঙ্করের সংস্থার বাইরে বেরিয়ে বেঙ্গালুরুর জয়নগরে অল-কিওর আকুপাংচার সেন্টার নামে নিজের একটি আকুপাংচার সেন্টার চালু করেন রিতিকা। আকুপাংচার থেরাপিস্ট হিসাবে কাজও শুরু করেন। ‌যদিও রিতিকার মতে, তাঁর এই পথ দেখতে ‌যতটা মসৃন বাস্তবে ততটা মসৃন ছিল না। কারণ আধুনিক জামানায় মানুষ সবই সঙ্গে সঙ্গে পেতে চান। অনেকটা ইন্সটান্ট কফি, ওয়াইফাই, ভিডিও কনফারেন্সের মত। সেই মানসিকতা থেকে রোগীরা মুহুর্তে ম্যাজিকের মত সুস্থ হতে চাইছেন। ফলে তাঁদের অ্যালোপাথিক চিকিৎসা থেকে সরিয়ে এনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন আকুপাংচার থেরাপিতে নিয়ে আসা রীতিমত কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে যেসব রোগী তাঁর কাছে আসছেন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন, তাঁরা উদাত্তকণ্ঠে রিতিকার প্রশংসা করছেন। ফলে অন্যরাও রোগ সারাতে তাঁর কাছে আসার ভরসা পাচ্ছেন।

রিতিকাকে কিন্তু দ্রুত জয়প্রিয়তা দেয় একটি শিশুর চিকিৎসা। রিতিকার চিকিৎসায় জন্মান্ধ ওই শিশু এক চোখে দেখতে পাচ্ছে। অন্য চোখটিও দ্রুত সেরে উঠছে। এই ঘটনা তাঁকে ‌যথেষ্ট সুনাম দিয়েছে। ‌যাঁরা আকুপাংচারে বিশ্বাসী নন তাঁদের জন্য রিতিকার পরামর্শ এ নিয়ে বিবিসির তথ্যচিত্রটি দেখুন। ওয়েবে এ বিষয়ে পড়াশোনা করুন। জানতে পারবেন আকুপাংচার আসলে কতটা বিজ্ঞানসম্মত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। রিতিকার কাছে তাঁর রোগীদের মুখের হাসিই তাঁর সবচেয়ে বড় পাওনা। কারণ সুস্থ হওয়ার পর আত্মতুষ্টির যে হাসি রোগীদের মুখে ঝিলিক দেয় তা ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না।