সস্তায় পুষ্টিকর, অভিনবর ‘পাজলড স্ন্যাকস’

0

সত্যি, শুরুয়াতির আইডিয়াগুলি আসে অদ্ভুত সব পরিস্থিতি থেকে। ‘এক্সপেডাইট ফুড’এর জন্মও অনেকটা সেরকমই। কর্নধার অভিনব গুপ্তা তখন ইউরোপীয় একটি সংস্থায় ভারতের সেলস অপারেশনটা দেখতেন। একবার অফিসেরই কাজে মুম্বই থেকে বরোদা যেতে সকালের ফ্লাইট ধরতে হত। সকাল সকাল এয়ারপোর্টে পৌঁছে পেপারে ভারতের গ্রমীণ অর্থনীতির ওপর একটা লেখা পড়ছিলেন। অভিনবের জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার জন্য সেটাই যথেষ্ট ছিল।

অভিনব বুঝতে পারে ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি তার একশো কোটির উপর জনশক্তি। দিনের পর দিন ভাবনাচিন্তা, পরিকল্পনা এবং গবেষণার পর অভিনব ঠিক করলেন স্ন্যাকস তৈরি করবেন। এভাবেই ‘এক্সপেডাইট ফুড’ এবং তার ব্র্যন্ড ‘পাজল স্ন্যক্স’এর জন্ম। গুজরাতি স্ন্যকস থেকে ভারত বিখ্যাত নমকিন, প্রায় ২৪ ধরনের স্ন্যাকস রয়েছে এই ব্র্যান্ডের।

কর্নধার, অভিনব গুপ্তা
কর্নধার, অভিনব গুপ্তা

‘আইডিয়াটা নিয়ে আমি যখন আত্মবিশ্বাসি, কেউ তখন সমর্থন করেনি। মেনুফ্যাকচারিংয়ের ব্যবসার বিপদ নিয়ে অনেকে সাবধানও করেন, সমানে বলা হত যেন এসবের দিকে পা না বাড়াই’, বলেন অভিনব। যদিও অভিনব তাঁর সমস্ত সঞ্চয় ততদিনে এই ভেঞ্চারে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, তারপরও আরও পুঁজির দরকার ছিল। কিন্তু সাহায্যের জন্য হাত বাড়বেন তেমন কাউকে পাচ্ছিলেন না। যখন সবাই মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল, এক খুড়তুতো ভাই পুঁজির যোগান দিয়ে সাহায্য করলেন। ‘একটা ফোনেই রাজি হয়ে যাওয়াটা আমার কাছে দারুণ আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল। আমার সঙ্গে বেশি দিন ব্যবসা চালাতে পারবেন কিনা তা নিয়ে তাঁর মনেও সন্দেহ ছিল, কিন্তু সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন, উৎসাহ দিয়েছিলেন বাকি পথটা এগিয়ে চলার’, বলেন অভিনব।

ফান্ডিংয়ের জোগাড় তো হল। তাতে ঝামেলা কিন্তু শেষ হল না। আরও বড় চ্যালেঞ্জ তখনও বাকি। প্রথম বছর থেকে ‘এক্সপেডাইট ফুড’এর প্রথম লক্ষ্য ছিল পণ্যের মান বজায় রাখা। যে স্ন্যাক তৈরি করেছেন তার গুন ও মান নিয়ে অভিনব যথেষ্ট খুঁতখুঁতে ছিলেন। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন না কীভাবে সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হবেন। এবার বাজার নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। ‘সকাল ৬টায় বেরিয়ে পড়তাম। আশপাশের শহরের বাজার থেকে অর্ডার তুলতাম আর ডিস্ট্রিবিউটর ঠিক করতাম। আমার দিন শেষ হত রাত ১১ টায়’, অভিনব জানান, এত কিছুর পরও কোথাও যেন খামতি থেকে যাচ্ছিল। প্রথম ডেলিভারির পর আর কেউ নিতে চাইছিল না তাঁর প্রডাক্ট। সমস্যা বাড়ছিলই। অভিনব ঠিক করলেন নিজেই এর কারণ খুঁজবেন। ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, প্রডাক্ট ভালো লাগছে না। কেন ভালো হচ্ছে না তার খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন, যখন তিনি নিজে থাকছেন না, কারখানায় লোকজন ঠিকমতো কাজ করছে না। তিনি বলেন, ‘এটা অনেকটা ষড়যন্ত্র চক্রের মতো। একদিকে খদ্দের ধরতে আমি যখন চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছি, তখন আমার অনুপস্থিতিতে কারখানায় যা তৈরি হচ্ছে তা ঠিক মানের হচ্ছে না। ফলে সব শহরে আমাকে ডিস্ট্রিবিউটর রাখতে হল’। কিছুদিনের মধ্যে বদল বুঝতে পারলেন অভিনব। প্রোডাকশন এবার নিয়মে ফিরল। 

অভিনব বলেন, এই ঘটনা বিরাট শিক্ষা দিয়েছিল। কোনও কিছু শুরু করতে গেলে তার সমস্ত দায় নিজের ওপর। উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত মালিকেরই দায়িত্ব সব কাজ যাতে ঠিক মতো হয় সেদিকে নজর রাখা এবং প্রথম দিকে কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না।

অন্যান্য সব শুরুয়াতির মতো অভিনব বলেন, একটা টিম তৈরি করা বিশেষ করে উৎপাদনের ক্ষেত্রে খুব জটিল। তার মূল কারণ ছিল, কার মধ্যে কী গুন দেখবেন সেই ব্যাপারে তাঁর কোনও সম্যক ধারণা ছিল না। তাই প্রথম দিকে লোক নিয়োগে কিছু ভুল করেছিলেন। ভুল থেকে শিক্ষাও নিয়েছেন। সেলসের লোক নেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা ছিল। ছোট্ট ব্যবসা, অনামি ব্র্যান্ড বাজারে যার কোনও পরিচিতি নেই তার জন্য কাজের লোক পাওয়া বেশ মুশকিল হয়ে যায়। ‘এতসব কিছুর পর পুঁজির অভাবও আরেকটা সমস্যা ছিল। টু টিয়ার, থ্রি টিয়ার শহরে ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক সাজানো হয়। ডিস্ট্রিবিউশনের ভালো ব্যবস্থা ছাড়াও, প্রডাক্ট যাতে ক্রেতার নাগালে থাকে সেটাও নিশ্চিত করতে হয়েছিল। দামের শুরু পাঁচ টাকা থেকে, উপরি পাওনা ভালো মান’, বলেন অভিনব। অভিনব জানান, এখনও ব্র্যান্ড তৈরি করে যাচ্ছেন এবং আগামী কয়েক বছর সেটাই চলবে। ‘ব্র্যান্ড তৈরির জন্য চেষ্টায় কোনও ফাঁক রাখছি না। আগামী ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যে আমার পণ্যের ভালো ব্র্যান্ড তৈরি হয়ে যাবে’, আশাবাদী অভিনব। ‘এক্সপেডাইট ফুড’ যবে থেকে শুরু হয়ছে সেই ২০১২ থেকে প্রতিবছর ব্যবসা ১০০ শতাংশ করে বেড়েছে এবং প্রথম বছর থেকেই লাভজনক ছিল। এই বৃদ্ধি ধরে রাখার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী টিম ‘এক্সপেডাইট ফুড’ এবং কয়েক বছরের মধ্যে শীর্ষে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। নতুন সেলস টিম পেয়ে নেটওয়ার্কে আরও ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেলার বাড়ানো হচ্ছে। তার ফলে ব্যবসাও আরও বাড়বে।

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুযায়ী, স্ন্যাক্স ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে এই মুহূর্তে বিনিয়োগ ১০০ বিলিয়ন টাকা। এক হাজারের ওপর স্ন্যাক্সস আইটেম বিক্রি হয় ভারতে। গত তিন বছরে স্ন্যাক্স ইন্ডাস্ট্রি ১০ শতাংশ বেড়েছে। হলদিরামস এবং আনন্দ ছাড়াও এখন বাজার দাপাচ্ছে নমকিন, পাকুমানিয়া এবং ইন্দুবেন খাকরওয়ালে। ‘পাজেল স্ন্যকস’ নিয়েও বড় পরিকল্পনা রয়েছে ‘এক্সপেডাইট ফুড’এর। নতুন ব্যবসার জন্য জমির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। ‘সেলসের দিক থেকে বলতে পারি আমাদের একটা টার্গেট আছে। টার্গেটে পৌঁছাতে দিন-রাত কাজ করছি আমরা। ভারতের শহরতলিগুলিতে কীভাবে ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা যায় তার জন্য বাজার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিচ্ছি। তারপর ধীরে ধীরে বড় বড় শহরগুলির দিকে পা বাড়াবো’, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানালেন অভিনব।