কৌশিকদের MezzoPress কলকাতার একটি ছাপাখানা বিপ্লব

5
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। অমলকান্তি ছাপাখানার কর্মী। কিন্তু অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি। কলকাতার ছাপাখানার অন্ধকারে সিসার অক্ষর, কাঠের ব্লক, লেটার প্রেসের মতই হারিয়ে গিয়েছে।
সুমিত জয়সওয়াল, কৌশিক চক্রবর্তি
সুমিত জয়সওয়াল, কৌশিক চক্রবর্তি

আলোর তলায় চলে এসেছে, স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের প্লেট। পেল্লায় অফসেট মেশিন। কম্পিউটার প্রিন্টিং আর ডিজাইনিংয়ের হাজার হাজার কর্মী। CMYK স্ক্যান করা ফিল্ম রোল। এক সঙ্গে হাজার হাজার কপির প্রিন্ট অর্ডার। লাট কে লাট প্রিন্টিং চলছে হু হু করে। শুধু রিম কে রিম কাগজ নয়। ব্যাগ, ব্যানার, ফ্লেক্স, জামা, কাপড় যে কোনও সারফেসে যে কোনও ধরণের প্রিন্টিং আজ সম্ভব। আজকাল থ্রি ডি প্রিন্টিংও হচ্ছে খুব। এই শহরের আনাচে কানাচে গিজগিজ করছে এরকম ছাপাখানা। গোটা কাজটা অগুনতি টুকরোয় ভাগ হয়ে রীতিমত চলছে দক্ষ যজ্ঞ। এই কলকাতায়, অমলকান্তিদের শহরে।

আপনি জানেন কিনা জানি না। কলকাতা কিন্তু ছাপা খানার কাজে গোটা দেশের মধ্যে সব থেকে ইজ্জতদার শহর। এখানে কারিগরের হাতের কাজ মাখনের মত মসৃণ। নির্ভুল করার রেকর্ড আছে। আড়ে বহরে বিশাল এই দেশের পছন্দের ছাপাখানা অমলকান্তিদের কলকাতা। কবি সাহিত্যিক লিটল ম্যাগাজিনের উৎসাহী যুবাদের দৌলতে বৈঠকখানা রোডের দুপাড়ে থিক থিক করছে কাগজ কাটার ঘর। কম্পোজ করার গুমটি। আর্ট আর ডিজাইন করার ছোটো ছোটো অফিস। সকাল থেকে সন্ধে সারাদিন সকলের হাতই ব্যস্ত। ছাপার জগতে কলকাতা তাই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই কিংবা তামিলনাড়ুর শিবাকাশির থেকে কোনও কোনও ক্ষেত্রে কলকাতা একটু হলেও এগিয়ে রয়েছে। কাজের পারফেকশনের দিক থেকে তো বটেই, সস্তাতেও ছাপার কাজ এখানে সম্ভব। আর গোটা দেশ সেটা খুব ভালোভাবেই জানে।

কিন্তু কলকাতায় ছবিটা কিছুদিন আগেও ছিল ভীষণ অগোছালো। ধরুন আপনার এক ফর্মার একটা বুকলেট ছাপতে হবে। কার কার কাছে যাবেন? কনটেন্ট তৈরি করতে হবে। ডিজাইন করতে হবে। প্রিন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কাগজ কিনতে হবে। ছাপা হয়ে গেলে সেগুলো কোথাও বাঁধাই করাতে হবে। গোটা প্রক্রিয়াটা একটা উইন্ডো থেকে হওয়ার জো নেই। ফলে অনেকটা শ্রম এখানে দিতে হবে। এমনিতে সস্তা হতেই পারে কিন্তু বারবার যাতায়াত, সারাদিন পথে পথে ঘুরলে খরচ তো বাড়বেই। অন্য উপায় বলতে, মিডলম্যান খুঁজতে হবে। যিনি আপনার হয়ে কাজটা করে দেবেন। কলকাতার বাজারে অনেক ধরণের মিডলম্যান ঘুরছে। কিন্তু সেরা কাজটা যে তাদের কাছ থেকে পাবেনই এমন কোনও গ্যারান্টি নেই।

সেই সমস্যার সমাধান করতেই কলকাতায় গজিয়ে উঠেছে একটি স্টার্টআপ। ভারতের প্ৰথম অনলাইন প্রিন্টিং মার্কেট প্লেস। সংস্থার নাম MezzoPress.com, যার মৌলিক কাজ হল আপনার অর্থ এবং পরিশ্রম বাঁচানো।

যারা ছাপাখানার ইতিহাস জানেন তাঁরা Mezzotint শব্দটির সঙ্গে সম্যকভাবে পরিচিত। এক জার্মান শিল্পী লুডউইগ ফন শিইগেন ১৬৪০ এর দশকে প্রথম এই প্রিন্ট করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। সাদায় কালোয় কোনও ছবি কিভাবে টোনের তারতম্যে রীতিমত প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে সেই পদ্ধতিই আবিষ্কার করেন তিনি। সে ছিল জোহানেস গুটেনবার্গের পর জার্মান সাহেব শিইগেনের মেজোটিন্ট ছিল যুগান্তকারী আবিষ্কার।

গুয়াহাটির ছেলে কৌশিক চক্রবর্তী সেরকমই একটি কাজ করে ফেলতে চাইলেন অন্যভাবে অন্য আঙ্গিকে। কী রকম! ধরুন, বাজারে যে সব সার্ভিসগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেগুলোকেই এক-সূত্রে বেঁধে দিয়েছেন তিনি। গোটাটাই অনলাইন মারফত। আপনার যদি কিছু প্রিন্টিংয়ের প্রয়োজন পড়ে তবে আর কোথাও যেতে হবে না। শুধু যাবেন মেজোপ্রেসের সাইটে। আপনি ই-কমার্স প্লাটফর্মের এক্সপেরিয়েন্স পাবেন। এটা এমন একটি মার্কেট প্লেস যেখানে আপনি অর্ডার দেবেন, আর মেজোপ্রেসের দক্ষ টিম আপনার অর্ডার অনুযায়ী প্রোডাক্ট ডেলিভারি করবে। প্রিন্টিংয়ের অর্ডার দেওয়া আর দ্রুততার সঙ্গে সেই প্রোডাক্ট হাতে পাওয়ার একটি ম্যাজিকাল এক্সপেরিয়েন্স দেবে মেজোপ্রেস। আপনার জন্যে সমস্ত হ্যাপা নিতে তৈরি ওর টিম।

কেমন সাড়া পাচ্ছেন, জানতে চেয়েছিলাম আমি, কৌশিক যা বললেন তাতে তো চোখ ছানা বড়া হওয়ার উপক্রম। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন শহর থেকে আসছে অর্ডার। ন্যায্যমূল্যে দুর্দান্ত কোয়ালিটির ছাপার কাজ করছে মেজোপ্রেস।

আর কোয়ালিটির টানেই একের পর এক অর্ডার পাচ্ছেন ওরা। কলকাতার প্রায় সমস্ত প্রিন্টিং প্রেসের সঙ্গে এবং প্রিন্টিং ইকোসিস্টেমের সমস্ত নাট-বল্টুর সঙ্গে দুর্দান্ত সম্পর্ক মেজেপ্রেসের। কারণটা খুব পরিষ্কার। কৌশিক এর পিছনে জীবনের মূল্যবান সময়টা দিয়েছেন। কলকাতার ছেলে নন। বড় হয়েছেন গুয়াহাটিতে। লেখাপড়া, প্রথমদিককার স্ট্রাগল, কোনও ক্রমে চাকরি জোটানো সবই গুয়াহাটিতে। কিন্তু ২০০২-এ সিদ্ধান্ত নেন বেঙ্গালুরু চলে যাবেন। কোডিংয়ে দক্ষ। কম্পিউটারে দক্ষ। ফলে তথ্য প্রযুক্তি শিল্পে কাজ পেতে সমস্যা হয়নি। ২০০২ থেকে ২০০৯ টানা সাত বছর তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে কাজ করেছেন। এখনও তথ্য প্রযুক্তির কাজই করেন। কিন্তু চাকরি নয়। নিজের মর্জির নিজেই মালিক। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি স্টার্টআপ খোলার কথাও সিরিয়াসলি ভেবেছেন। শেষমেশ ২০১৫ মার্চ মাসে শুরু করেছেন এই নতুন উদ্যোগ। ২০১৬ মে মাস থেকে পুরোদমে শুরু হয়েছে কাজ। তার আগে টানা দু'বছর শুধু প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রির নাড়ি নক্ষত্র ঘেঁটে দেখেছেন। কোথায় কিভাবে কাজ হয় কোথায় কী রেট সব যাচাই করে দেখেছেন। এবং সম্পর্ক তৈরি করেছেন। তারপর হাত দিয়েছেন প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রির এই মার্কেট প্লেস তৈরির কাজে।

গ্রাউন্ড ওয়ার্কটা গুছিয়ে করেছেন বলেই শুরু থেকে সাফল্যও পেতে শুরু করেছে কৌশিকের টিম। টিমের অপর সদস্য কলকাতার ছেলে সুমিত জয়সওয়াল। সঙ্গে আছেন প্ৰথম থেকেই। সুমিত দেশের মধ্যে ব়্যাঙ্ক করা চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। ইনফোসিসে কাজ করেছেন। মেজোপ্রেসের তিনি কো ফাউন্ডার। মেজোপ্রেসের সাফল্যে তার অবদানও কম নয়।

কৌশিক বলছিলেন, এই কাজটা তাদের আরেকটি কারণেও প্রিয়, কারণ এই কাজের ভিতর দিয়ে তারা কলকাতার ছাপার কাজের সঙ্গে যুক্ত খেটে খাওয়া অনেক শ্রমিককে কাজ দিতে পারছেন। ভালো কাজ যারা করেন তাদের কাজের অভাব হয়ত সত্যিই হয় না। কিন্তু বেশি ভলিউমে কাজ পাওয়াটা সকলেরই খু্ব জরুরি। মেজোপ্রেসে যখনই অর্ডার আসে দ্রুত সেই কাজ করে দিতে পারবেন এমন প্রতিশ্রুতি দিতে প্রিন্টিং প্রেসগুলির লম্বা লাইন দিতে শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যেই। ফলে মেজোপ্রেস ক্লিক করে গিয়েছে কলকাতায়।

ফলে বিয়ের কার্ডই হোক কিংবা ভিজিটিং কার্ড, বই ছাপানোর অর্ডারই হোক কিংবা ব্যানার, ফ্লেক্স, ভিনাইল প্রমোশনাল লিফলেট অথবা জামায় কিংবা ব্যাগে প্রিন্ট সবই ঝামেলা ছাড়াই আপনি করাতে পারবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিন চারদিনের মধ্যেই হাতে পেয়ে যাবেন আপনার প্রোডাক্ট। একদম হ্যাসেল ফ্রি প্রিন্টিং সলিউশন দিচ্ছে এই সংস্থা।

Related Stories