আসছে বালুচরি নিয়ে মেতে ওঠার উৎসব

2

বাংলায় নেই নেই বলার অভ্যাস যাদের, তাদের জন্যে বলে রাখি, বাংলার গর্ব করার মতো অনেক জিনিসের মধ্যে একটি এই রাজ্যের বালুচরি। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে আপনার গায়েও কাঁটা দেবে। এই শাড়ির উত্থান পতন এবং রূপবদলের ইতিহাসে পাবেন ভারতের ইতিহাসের চিহ্ন, হারানো নানান কিস্‌সা। মুছে যাওয়া এবং মুছে দেওয়া সময়ের সেই সব দাগ, যেগুলি এখনও লেগে আছে এই শাড়ির জমিনে। স্কিল বা দক্ষতার স্থানান্তরের লক্ষণ যেমন স্পষ্ট তেমনি আছে দুর্দমনীয় একটি লড়াইয়ের ঝলমলে উপাখ্যানও।

সম্প্রতি উইভারস স্টুডিও রিসোর্স সেন্টার এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বস্ত্র ও বয়ন দফতরের প্রধান ব্র্যান্ড তন্তুজর সাহচর্যে বালুচরি শাড়ির একটি পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী হতে চলেছে। এই প্রদর্শনীতে শুধু যে প্রাচীন বালুচরির ঐতিহ্যের নিদর্শন থাকবে তাই নয় আধুনিক শিল্পীদের হাতে বদলে যাওয়া বালুচরিও থাকবে। থাকবে ফ্যাশন ডিজাইনারদের কল্পনা প্রতিভার আলোয় আলোকিত বালুচরির নানান অভিনব প্রয়োগ। নভেম্বরের ১৮ তারিখ থেকে ডিসেম্বরের ৪ তারিখ পর্যন্ত বিড়লা আকাদেমিতে চলবে বালুচরির পুনর্জাগরণ।

এই প্রয়াসের একটা শুরুর শুরু আছে। এবং সেই শুরুয়াতি উদ্যোগীর নাম মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ বালুচরি শাড়ি নিয়ে দুকথা বলার এবং শোনার অবকাশ তৈরি করে দিয়েছেন তিনিই। তাঁর উৎসাহেই রোমে বালুচরি শাড়ির দুর্দান্ত প্রদর্শনী হয়েছে। বাংলার এই ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বের মানুষের নজর কাড়তে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বালুচরিই উপহার দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে যেন থিতিয়ে পড়েছিল বাংলার এই পরম সম্পদ। মুখ্যমন্ত্রীর সাংস্কৃতিক কূটনীতির দৌলতে আবারও সামনে উঠে এলো ইতিহাসের বালুচরি এবং বালুচরির ইতিহাস। সরকারি সংস্থা তন্তুজর ম্যানেজিং ডিরেক্টর রবীন্দ্রনাথ রায় বললেন, বালুচরির ইতিহাস একসময় মানুষ ভুলতে বসেছিল। কত ডিজাইন যে কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে তার কোনও লেখাজোখা নেই। তবে উইভারস স্টুডিওর এই উদ্যোগ সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসেই আলো ফেলতে চলেছে। উইভারস স্টুডিওর কর্ণধার দর্শন শাহ জানালেন, তিনি নিজে বালুচরি শাড়ি নিয়ে ভীষণই উৎসাহী। এই শাড়ির নানান ডিজাইন নিয়ে রীতিমত গবেষণা করেছেন তিনি এবং তাঁর টিম। বিষ্ণুপুরে ঘুরেছেন। দিনের পর দিন বিভিন্ন মানুষের কাছে থাকা পুরনো বালুচরি ঘেঁটে দেখেছেন। এবং যে সময় এই শাড়ি বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে মিশে যাচ্ছিল সেই সময়ের ইতিহাসে ডুব দিয়েছেন। এবং তুলে এনেছেন সেই বিষ্ণুপুরী বালুচরির ঘরানা। মুর্শিদাবাদী নবাবী বালুচরির জেল্লা আর মেজাজ। তাঁর আর্কাইভে সযত্নে রয়েছে ইতিহাসের জৌলুস। এখন নিজেই তাঁত বসিয়ে তাঁতি নিয়োগ করে তৈরি করাচ্ছেন সেই সব হারিয়ে যাওয়া ডিজাইনের শাড়ি। একটু একটু করে ডানা মেলছে এই রাজ্যের গর্বের বালুচরির সম্ভাবনা।

বালুচরি শাড়ি জিওগ্রাফিকাল আইডেন্টিফিকেশন অনুযায়ী বাংলার সম্পদ। আরও নির্দিষ্ট করে বলা যেতে পারে বিষ্ণুপুরের সম্পদ। কিন্তু জেনে রাখা ভালো এই শাড়ির জন্ম বাংলায় নয়। আজ থেকে শ'পাঁচেক বছর কিংবা তারও আগে বেনারসের তাঁতিদের হাতে বোনা হত আজকের বালুচরি। কিন্তু এই শাড়ির কদর দিতেন মুসলিম রইসরা। বেনারসি ঘরানা থেকে একটু আলাদা অথচ রেশমের তন্তুর ঘন বুনটে, ব্লক ব্লক নকশায় বালুচরি নজর কাড়ে মুসলিম রইস এবং নবাবদের। লখ্‌ণৌয়ের দিকে নয়, বাংলার দিকে চলে আসার মধ্যে তাঁতিরা বেশি রোজগারের সম্ভাবনা দেখতে পান। বাংলায় তখন মসলিনের কদর ছিল। তাঁতের শাড়ির দারুণ বাজার তৈরি হয়েছিল। তাঁতে বোনা শাড়ির সমঝদাররা বেনারসের পাশাপাশি বাংলাতেও ঢুঁ মারতেন। সমুদ্রপথে বাংলা ছিল দুনিয়ার সঙ্গে যুক্ত। আর সেই পথ ধরেই বাংলায় তখন ঢুকছে ডাচ, ওলন্দাজ, মগ এবং ইংরেজ। বাংলা তখন শিক্ষা সংস্কৃতি এবং ধনী বণিকদের একটি নিরাপদ ঠিকানাও ছিল। তার ওপর মুসলিম শাসকরাও বাংলায় শাসন কায়েম করতে শুরু করেছেন। বাংলায় ততদিনে নবাবী আমল শুরু হচ্ছে। আর সেই অনুযায়ী একটি নতুন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেও বাংলায় সম্ভাবনা দেখতে পান বেনারসের তাঁতিরা। একদল ঐতিহাসিকের মতে মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের কাছে বালুচর নামে একটি গ্রামেই এই তাঁত শিল্পীরা আস্তানা গড়েন। খোদ মুর্শিদকুলি খাঁ মুর্শিদাবাদকে তাঁর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে তৈরি করেন। ঠাটে বাটে দিল্লি লখ্‌ণৌ কিংবা আগ্রার থেকে কোনও অংশে কম যায় না মুর্শিদাবাদ। একের পর এক স্থাপত্যই তার নিদর্শন। নবাবী মহলের অন্তঃপুরবাসিনী বেগমদের জন্যে নতুন ধরণের শাড়ি তৈরির ফরমান জারি করেছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ। তখনই বালুচরের ওই তাঁতিদের আনা হয়। 

সেদিনকার বালুচরিতে ছিল ধর্ম নিরপেক্ষ নকশা। অহিন্দু এবং অমুসলিম কারুকার্য। ফুটে উঠত সময়ের প্রতিচ্ছবি। জীবন যাত্রার ইতিবৃত্ত আঁকা হত ওই সব শাড়ির পাড়ে, আঁচলে। 

তখন নবাবী আমলের মুর্শিদাবাদ জেগে উঠছে বাংলার সাংস্কৃতিক প্রাণ কেন্দ্র হিসেবে। তার প্রতিবিম্বিত নকশায় তাই আকছার পাবেন নবাবিয়ানা। হুঁকা, ঘর্ঘরায় টান দেওয়া মিঞা সাহেব। মসনদে উপবিষ্ট জাঁহাপনা। আসনাই করে এক খিলি পান মুখে পোরা নবাবের গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হারেমের সুন্দরী। ছবির মত স্পষ্ট, কালো কোট মাথায় ঢাউস টুপি পরা গোরা সাহেব। ঘোড়া। কামান। গাদা বন্দুক। আর পাবেন হাতে বল্লম ধরা অনেক জীর্ণ শীর্ণ পেয়াদার নকশা। এখন প্রশ্ন হল এরকম ধর্মীয় অনুষঙ্গ নিরপেক্ষ শাড়ি কীভাবে ভরে উঠল রামায়ণের উপাখ্যানে, মহাভারতের রূপকথায়! এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আপনি যদি মল্লরাজার দেশে যান পাবেন সেই হদিসও। শোনা যায় বালুচর গ্রাম নাকি ভাগীরথীর গ্রাসে গঙ্গায় ডুবে গিয়েছিল। তখন নাকি তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাঁকুড়া বিষ্ণুপুর পাড়ি দেন এই সব তাঁতিরা। তখনও সমৃদ্ধ ছিল মল্লরাজাদের ডেরা।কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সূত্র ধরেই বিষ্ণুপুরের শক্তি ক্রমশ কমতে থাকে। সমৃদ্ধি ম্লান হতে শুরু করে। আদিমল্লের তৈরি করা মন্দির নগরীর গৌরব তারই বংশের দামোদর সিংহের ষড়যন্ত্রে ধূলায় লুণ্ঠিত হয়। মল্লরাজ পরিবারের শেষ রাজা চৈতন্য সিংহ ছিলেন অতি ধার্মিক। তিনি ধর্মকর্ম নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকতেন যে, প্রশাসনিক কাজকর্ম কিছুই দেখতেন না। এরই সুযোগ নিয়ে দামোদর সিংহ নামে তাঁর এক জ্ঞাতিভাই ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। তিনি মুর্শিদাবাদের দরবারে নিজের যোগ্যতা প্রমাণে সমর্থ হন। প্রথমে সিরাজদ্দৌলা তাঁকে নিজ বাহিনী ধার দেন। কিন্তু তিনি বিষ্ণুপুর দখলে অসমর্থ হন। ইংরেজদের হাতে সিরাজের পরাজয়ের পর মীর জাফর দামোদর সিংহকে আরও শক্তিশালী বাহিনী ধার দেন। এইবার তিনি বিষ্ণুপুর দখল করতে সমর্থ হন। চৈতন্য সিংহ মদন গোপালের বিগ্রহ নিয়ে কলকাতায় পালিয়ে আসেন। এরপর রাজ্যের মালিকানা নিয়ে বহুদিন মামলা মোকদ্দমা চলে। এই মামলা চালাতে গিয়ে বিষ্ণুপুর রাজ পরিবারের পতন সম্পূর্ণ হয়। শেষে ১৮০৬ সালে রাজস্ব বাকি রাখার দায়ে রাজ্য বিক্রি হয়ে যায় এবং বর্ধমানের রাজা সমগ্র এস্টেটটি কিনে নেন। এই ম্লানতার ছায়া পড়ে বালুচরির গায়েও। তবুও বালুচরি শাড়ির শিল্পীরা ততদিনে পেয়ে গিয়েছেন শাড়ির নতুন ডিজাইন। ধর্মীয় অনুষঙ্গ। রামায়ণের কাহিনি, মহাভারতের উপকথায় ততদিনে ভরে গিয়েছে বালুচরির চর।

উবে গিয়েছে নবাবিয়ানার চিহ্ন। পাশাপাশি ইংরেজদের দমননীতিরও শিকার হতে হয়েছে বালুচরির তাঁতিদের। শোনা যায় ম্যাঞ্চেস্টারের কাপড় বিক্রির তাগিদে বাংলার তাঁতিদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করেছে তদানীন্তন ইংরেজ প্রভুরা। কেটে দেওয়া হয়েছিল মসলিন বয়নকারদের আঙুল। সেসময় বালুচরির তাঁতিদেরও বুড়ো আঙুল কেটে দেওয়া হয়েছিল। ফলে দক্ষতার অপমৃত্যু হয়েছিল ইংরেজের প্রভুত্বের সামনে। ইতিহাসের এরকমই ছোট ছোট অসংখ্য কাহিনি, কাহিনির সম্ভাবনা দিয়ে বোনা অনন্য উপাখ্যান গেঁথে আছে বালুচরির শরীরে।

নভেম্বরে ১৮ থেকে ডিসেম্বরের ৪ উইভারস স্টুডিও রিসোর্স সেন্টার এবং তন্তুজর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত Baluchari, Bengal and Beyond এ আপনি পাবেন সেই ইতিহাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের নিখুঁত বুনন।